একুশে পত্রিকার খবরে নড়ল প্রশাসন: কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড় বাঁচবে তো?


চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়গুলো এই শহরের প্রাণ, তার পরিচয়। শুধু সৌন্দর্য নয়, পরিবেশের ভারসাম্য আর ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এই শহরকে বাঁচানোর জন্যও পাহাড়গুলো অপরিহার্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই রক্ষাকবচগুলোকেই প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। পাহাড় কাটার খবর এখানকার মানুষের কাছে গা সওয়া হয়ে গেছে প্রায়। তবে গত ২০ এপ্রিল একুশে পত্রিকায় দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার পাহাড় কাটা নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর কিছুটা হলেও টনক নড়েছে প্রশাসনের।

ঘটনাটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের। নন্দীরহাটের পশ্চিম অংশ এবং মাহমুদাবাদ এলাকায় রাতের অন্ধকারে চলছিল এই ধ্বংসযজ্ঞ। একুশে পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, প্রায় দুই মাস ধরে সেখানে অবাধে পাহাড় কাটা হচ্ছিল। খননযন্ত্রের গর্জন প্রতি রাতে চিরে ফেলছিল নীরবতাকে। পাহাড়ের পর পাহাড় কেটে তৈরি হচ্ছিল রাস্তা, আর সেই মাটি ড্রাম ট্রাকে করে চালান হয়ে যাচ্ছিল বিভিন্ন জায়গায়। বাড়িঘর, নিচু জমি বা এমনকি কবরস্থান ভরাটের জন্যও বিক্রি হচ্ছিল এই কাটা মাটি। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি ট্রাক ব্যবহার হতো এই কাজে, প্রতি ট্রাক মাটির দাম ২৪০০ টাকা। ভাবা যায়, দুই মাস ধরে কত হাজার ট্রাক মাটি বিক্রি হয়েছে, কত বিশাল পাহাড়ের অংশ বিলীন হয়ে গেছে!

এই ভয়াবহ খবর প্রকাশের পর টনক নড়ে প্রশাসনের। হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন বুধবার (২৩ এপ্রিল) গভীর রাতে এক অভিযান পরিচালনা করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। অভিযানে হাতেনাতে একজনকে ধরাও হয়। মো. নোমান সিদ্দিকী নামের ওই ব্যক্তি এক্সকেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটছিলেন। তিনি দোষ স্বীকার করায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দেরিতে হলেও প্রশাসনের এই পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। একেবারে কিছু না হওয়ার চেয়ে এই অভিযান এবং জরিমানা অনেক ভালো। এটা একটা বার্তা দেয় যে, অপরাধ করলে শাস্তি হতে পারে।

কিন্তু এখানেই কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে চলে আসে। যাকে ধরা হলো এবং জরিমানা করা হলো, তিনি তো এই বিশাল অপরাধযজ্ঞের একজন সামান্য কর্মী মাত্র, যন্ত্রচালক। কিন্তু যারা এই দুই মাস ধরে নির্বিচারে পাহাড় কেটে কোটি টাকার মাটির ব্যবসা করলো, সেই মূল হোতারা কোথায়? একুশে পত্রিকার প্রতিবেদনে কিন্তু স্থানীয় ১৪-১৫ জনের একটি সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়েছে। এনাম সওদাগর, নেজাম উদ্দিন, শাহনেওয়াজ, ফোরকান, কাশেম সওদাগরসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সাথে ‘মাটি মনসুর’ নামে আরও একজনের। অভিযোগ, তারাই এই পাহাড় কাটার মূল কারিগর। কিন্তু অভিযানের সময় তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। বলা হচ্ছে, অভিযানের খবর পেয়ে তারা আগেই পালিয়ে গেছে।

এই ঘটনা বেশ কয়েকটি গুরুতর বিষয় সামনে আনে। প্রথমত, অভিযানের খবর অপরাধীদের কাছে আগেই পৌঁছে গেল কীভাবে? প্রশাসনের ভেতরেই কি এদের কোনো লোক আছে? নাকি অন্য কোনো উপায়ে তারা খবর পেয়ে যায়? যদি খবর ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে এমন অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। শুধু কি লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

দ্বিতীয়ত, স্থানীয়দের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তারা বলছেন, এই প্রভাবশালী চক্রটি নাকি প্রশাসন ও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। এর পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। যদি এই অভিযোগের বিন্দুমাত্র সত্যতা থাকে, তাহলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি কতটা নাজুক। যাদের দায়িত্ব পরিবেশ রক্ষা করার, পাহাড় কাটা বন্ধ করার, তারাই যদি টাকার কাছে বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে পাহাড় বাঁচাবে কে? অভিযুক্ত এনাম সওদাগর অবশ্য পাহাড় কাটার কথা অস্বীকার করে কবরস্থান ভরাটের জন্য নিচু জমি কাটার দাবি করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা হয়তো তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।

তৃতীয়ত, যে জরিমানা করা হয়েছে, তার পরিমাণ নিয়েও ভাবতে হবে। এক লাখ টাকা। যে চক্র দুই মাস ধরে প্রতিদিন প্রায় লাখ টাকার মাটি বিক্রি করেছে, তাদের কাছে এই এক লাখ টাকা জরিমানা কি আদৌ কোনো বড় শাস্তি? এটা তো তাদের কাছে ব্যবসার সামান্য খরচ মাত্র! এই সামান্য জরিমানা মূল হোতাদের ভয় পাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বরং এটা প্রমাণ করে যে, ছোটখাটো কর্মীরাই ধরা পড়ে, মূল অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। শাস্তিটা যেন অপরাধের তুলনায় খুবই নগণ্য।

এই পুরো ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একুশে পত্রিকা যদি সাহসিকতার সাথে এই খবর প্রকাশ না করতো, তাহলে হয়তো এই রাতের আঁধারের পাহাড় কাটা চলতেই থাকতো। প্রশাসনের এই অভিযানও হয়তো হতো না। খবরটি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নজরে আসাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর নির্দেশেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের নজরদারি এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতা পরিবেশ রক্ষায় কতটা জরুরি।

প্রশাসন জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে এবং মূল হোতাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত মামলা দায়ের করবে। আরও বলা হয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই প্রতিশ্রুতিগুলো আশাব্যঞ্জক। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময়ই এসব প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই থেকে যায়। প্রভাবশালীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় বা রাজনৈতিক প্রভাবে মামলা হালকা হয়ে যায়।

আমরা আশা করতে চাই, এবার তেমনটা হবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা যেন শুধু নামকাওয়াস্তে না হয়। এর সঠিক তদন্ত হোক, অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। যারা নেপথ্যে থেকে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটায়, তাদেরও মুখোশ উন্মোচন করা দরকার। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো শুধু সৌন্দর্য বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও বটে। পাহাড় কাটা মানে শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়, এটা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করে তোলা।

তাই, শুধু এক রাতের অভিযান আর এক লাখ টাকা জরিমানা যথেষ্ট নয়। দরকার নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাহাড়খেকোদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। পরিবেশ ধ্বংসের এই ভয়ঙ্কর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। চট্টগ্রামের মানুষ চায়, তাদের প্রিয় শহরের পাহাড়গুলো বেঁচে থাকুক। আর এর জন্য প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম – সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, কাজের মাধ্যমে পাহাড় রক্ষা করার আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখতে চায় চট্টগ্রামের মানুষ।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।