
দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৪.৪ গুণ। কিন্তু জনগণের বিল পরিশোধ বেড়েছে ১২.২ গুণ। প্রতিটি অতিরিক্ত ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গড়ে আড়াই গুণ বেশি দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
সেই বাড়তি অর্থ কোথায় গেছে? বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বললেন, ‘অতিরিক্ত-পরিশোধের সিংহভাগ গেছে একটি ছোট গোষ্ঠীর কাছে, যারা টাকা নিয়ে চলে গেছে।’
এই উত্তর এলো ২৫ জানুয়ারি- হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ১৭ মাসের তদন্ত শেষে। একই সপ্তাহে দুর্নীতি দমন কমিশন আজিজ খানসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে শুনানিতে তলব করেছে।
গত ২৯ ডিসেম্বর একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত তিন পর্বের অনুসন্ধান-সিরিজে দু’টি কেন্দ্রীয় অভিযোগ ছিল: পনেরো বছরের ‘বিশেষ আইন’-এর আওতায় সামিট পাওয়ারের কাঠামোগত দুর্নীতি; এবং সিঙ্গাপুর-চ্যানেলে লভ্যাংশ-প্রবাহ। চার সপ্তাহ পর রাষ্ট্র সাড়া দিল।
জাতীয় কমিটির রায়
হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার-গঠিত ছয়-সদস্যের জাতীয় কমিটি ১৭ মাসের তদন্ত শেষে ২৫ জানুয়ারি প্রদান করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সামিটকে “আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় আবির্ভূত ‘বিদ্যুৎ দানব'” চিহ্নিত করেছে। কমিটির হিসাবে- সামিটকে কেন্দ্র না চালালেও বিপিডিবি বছরে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করছে।
দুদকের তলব
কমিটির প্রতিবেদন জমার ঠিক পরদিন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আজিজ খানসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে ১, ২, ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠিয়েছে। দুদকের উপ-পরিচালক আখতারুল ইসলাম ২৬ জানুয়ারি সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পূর্ববর্তী আদালত-পদক্ষেপ, যার ধারাবাহিকতায়
এই তলব শূন্য থেকে আসেনি। বিএফআইইউ ৭ অক্টোবর ২০২৪-এ ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছিল; ৯ মার্চ ২০২৫-এ ঢাকা মেট্রোপলিটান সিনিয়র স্পেশাল জাজ মো. জাকির হোসেন গালিব ১৯১টি ব্যাংক হিসাব- মোট ৪১.৭৪ কোটি টাকা- জব্দের আদেশ দেন; ২৪ আগস্ট ২০২৫-এ বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ সামিটের রিট খারিজ করে জব্দাদেশ বহাল রাখে।
সিরিজের তৃতীয় পর্বে Pattern of Shareholding-এর ভিত্তিতে দেখানো হয়েছিল- আজিজ খান-পরিবারের আট সদস্যের সম্মিলিত ব্যক্তিগত শেয়ার মাত্র ২৬৫টি; সিঙ্গাপুর-নিবন্ধিত সামিট কর্পোরেশন (এসসিএল) ধারণ করছে ৬৩.১৯%; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসসিএল-এ গেছে শুধু লভ্যাংশই প্রায় ৭০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। দুদকের ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনেও আজিজ খান সম্পর্কে একই উপসংহার- “তিনি সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন।”
সামিটের ভাষ্য
২৬ জানুয়ারি সামিট গ্রুপের বিবৃতি: ‘আমরা এখনো দুদক থেকে এমন কোনো নোটিশ পাইনি। নোটিশ পেলে পর্যালোচনা করে সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করব।’
একই দিনে দুদকের উপ-পরিচালক আখতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন, ১ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ: দুদক বলছে নোটিশ গেছে। সামিট বলছে পায়নি। এই দু’টি বক্তব্যের একটি সত্য নয়।
দুদকের তদন্তে চিহ্নিত ৭১১ কোটি টাকা। ফোর্বসের ২০২৫-তালিকা অনুযায়ী আজিজ খানের মোট সম্পদ আনুমানিক ১১০ কোটি মার্কিন ডলার- বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩,৫০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ দুদক এ পর্যন্ত আজিজ খানের মোট সম্পদের আনুমানিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ চিহ্নিত করেছে। তাঁর ঘোষিত সম্পদের সিংহভাগই সিঙ্গাপুরসহ বিদেশে- যেখানে বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ার সীমিত।। ১-৪ ফেব্রুয়ারির শুনানি এই বাস্তবতার মুখেই দাঁড়িয়ে।
১ ফেব্রুয়ারি শুনানি শুরু। পনেরো বছরের ক্যাপাসিটি চার্জ, ৭০ কোটি টাকার সিঙ্গাপুর লভ্যাংশ, ১৯১টি জব্দ ব্যাংক হিসাব- সব কিছু এখন একটি প্রশ্নে এসে ঠেকেছে: রাষ্ট্র কতটুকু যেতে পারবে?
শাহনাজ বেগম এখনও ঠিকমতো গ্যাস পান না।
