সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

জাপানি ‘সততার’ আড়ালে সামিটের চুক্তিফাঁদ, পেট্রোবাংলার নীরবতা

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অলিগার্কদের দৌরাত্ম্য, ভুল নীতি এবং হাজার কোটি টাকার অপচয় নিয়ে একুশে পত্রিকার তিন পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব।
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:২৯ পূর্বাহ্ন


এক নজরে

দু-দশকের ৩,৩৫৭ পৃষ্ঠা অডিটেড নথিতে উন্মোচিত- ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সামিট গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কেন্দ্র বসিয়ে রেখে আয় করেছে ১৭,৬১০ কোটি টাকারও বেশি; এবং সংসদীয় তথ্যের ভিত্তি-বছর (২০২৩) পরেও এসপিএলের নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, কেবল ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই তালিকাভুক্ত পাবলিক কোম্পানিটির মোট রাজস্ব ছিল ৪,২২৪ কোটি টাকা; ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকার কর-ছাড় পেয়েছে; এবং ২,৪৮৮ কোটি টাকার নগদ লভ্যাংশের সিংহভাগ গেছে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত হোল্ডিং কোম্পানির পকেটে।

– ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় চার মাস অচল টার্মিনাল, শূন্য গ্যাস সরবরাহ- তবু সরকারের কাছে প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা ভাড়ার বিল ধরিয়েছে সামিট।

– ২০১৯-২০ অর্থবছরে সামিটের ৩০০ মেগাওয়াটের গাজীপুর-২ কেন্দ্র চালু ছিল বছরের মাত্র ৫১ দিন; বরিশাল কেন্দ্র ২০২১-২২ সালে মাত্র ২৩ দিন।

– বিআরইবি’র সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে সুপ্রিম কোর্টে হেরে যাওয়ার পরও ৬৯৫.৬৪ কোটি টাকা ‘পাওনা’ হিসেবেই দেখাচ্ছে সামিট।

– এলএনজি টার্মিনালের অনুমোদন ১০-১২ দিনে, নবায়নযোগ্যের ফাইল ১১ বছরেও শেষ হয় না— এই অসামঞ্জস্যের পেছনে কী?

– পেট্রোবাংলায় ছোটাছুটিতেও সাড়া মেলেনি; প্রশ্ন শুনেই ‘ইন্টারভিউ দিই না’ বললেন জ্বালানি উপদেষ্টা।

চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারের ভাড়াবাসায় চুলার গায়ে হাত দিয়ে বসে ছিলেন রহিমা বেগম (৪২)। পোশাক কারখানার সেলাই-অপারেটর। সকাল সাতটা বাজে। কারখানায় ঢোকার আগে দুই সন্তানের জন্য একটু ভাত-ভাজি তৈরি করার কথা। কিন্তু চুলায় আগুনই ধরছে না। লাইনের মাথায় গ্যাসের চাপ এতটাই দুর্বল যে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বললেও বার্নারের নীল শিখা নিভু নিভু। “প্রায় চার মাস ধরে এই অবস্থা,” বললেন তিনি। “সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে গেলে মাসে দেড় হাজার টাকা বাড়তি যায়। মেয়ের স্কুলের বেতন আটকে দিয়েছি দু’মাস।”

রহিমা বেগমের রান্নাঘরের সেই ‘চার মাস’ আকস্মিক কোনো দুর্ভাগ্য নয়। ২০২৪ সালের ২৭ মে ঘূর্ণিঝড় রিমালের সর্বোচ্চ তীব্রতার সময় মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে নোঙর-করা সামিট এলএনজি টার্মিনালের গায়ে এসে আছড়ে পড়ে একটি ভাসমান ভাঙা পন্টুন। ভাসমান টার্মিনালটির ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনাল সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় মেরামতে। সিঙ্গাপুর থেকে ১০ জুলাই ফিরে এলেও মুরিং লাইনে নতুন সমস্যায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১১ সেপ্টেম্বর সামিট টার্মিনাল পুনরায় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়।

প্রায় চার মাস। এই সময়ে রহিমা বেগমের মতো অনেক গৃহস্থ গ্যাসের অভাবে দিন কাটিয়েছেন। চট্টগ্রামের অর্ধেক টেক্সটাইল কারখানার বয়লার বন্ধ ছিল দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা। সারকারখানাগুলোতে উৎপাদন থেমে ছিল পুরো মৌসুম।

ঠিক এই প্রায় চার মাসের ‘অচলতা’র জন্যই সরকারের কাছে দুই কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, চলতি বিনিময় হারে প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা ভাড়া দাবি করে বসেছে সামিট গ্রুপ। দাবির স্বপক্ষে সামিটের ‘ঢাল’ তাদের দুই জাপানি অংশীদার মিতসুবিশি কর্পোরেশন এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদক জেরা, যার বিস্তারিত আসছে পরে।

এই অনুসন্ধান-সিরিজের প্রস্তুতির সময়েই, ৩ নভেম্বর ২০২৫-এ অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ছয়-সদস্যের জাতীয় কমিটি- বিচারপতি (অব.) মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে- বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছে: ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনটি করাই হয়েছে দুর্নীতির জন্য… সংঘবদ্ধ দুর্নীতি।’। এই অনুসন্ধান কমিটির সামগ্রিক পর্যবেক্ষণের পেছনে যে একক বৃহত্তম সুবিধাভোগী, তার নাম ও তাদের অনিয়ম উন্মোচনই এই সিরিজের কাজ।

এই অনুসন্ধানের পরিধি ও পদ্ধতি

এই প্রতিবেদন তৈরিতে তিন মাস ধরে পর্যালোচনা করা হয়েছে সামিট পাওয়ারের ২০০৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৩,৩৫৭ পৃষ্ঠার বার্ষিক প্রতিবেদন, বিপিডিবি ও পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদন, আর্থিক বিবরণী এবং বিইআরসির ট্যারিফ অর্ডার। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সরেজমিন গিয়ে কথা বলা হয়েছে বাসিন্দা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।

বিশ্লেষণে যে চিত্রটি দাঁড়িয়েছে, তা এক বাক্যে এমন: বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে গত দু’দশকে ধীরে ধীরে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য তৈরি হয়েছে, যেখানে সেবা না দেওয়াই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়িক কৌশল।

কীভাবে গড়ে উঠল ‘সেবা না দিয়ে আয়ের’ স্থাপত্য

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সাধারণত দুইভাবে আয় করে। প্রথমটি কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ। অর্থাৎ, কেন্দ্র চলুক বা না চলুক, বিদ্যুৎ দিক বা না দিক, প্রস্তুত থাকার জন্য নির্দিষ্ট অংকের ভাড়া পরিশোধ করতে বাধ্য সরকার। দ্বিতীয়টি জ্বালানি বা এনার্জি চার্জ, যা শুধু প্রকৃত উৎপাদনের জন্যই দিতে হয়। চুক্তিতে এই দুই অংশের অনুপাত যত বেশি ক্যাপাসিটি-র দিকে ঝোঁকা থাকবে, ততই কোম্পানির পক্ষে কেন্দ্র না চালিয়েও আয় করা সম্ভব হবে।

সামিটের ২০০৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাভার ও নরসিংদী কেন্দ্র তখন ৮২ থেকে ৮৮ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল- আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি। তবু মোট আয় ৫২ কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, প্রায় ৬২ শতাংশ, এসেছে কেন্দ্র বসিয়ে রাখার ভাড়া থেকে। ২০০৭ সালে এই অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬.৩ শতাংশে। ২০০৮-এ তা প্রায় ৬৫.৮ শতাংশ। অর্থাৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলার পরও আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসছিল ঘুমিয়ে থাকার ভাড়া বাবদ। জাতীয় সংসদে সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামিট গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ আয় করেছে ১৭,৬১০ কোটি টাকারও বেশি- এমন রাজস্ব, যার বিনিময়ে কোনো বিদ্যুৎ গ্রিডে যায়নি।

দ্বিতীয় সংখ্যাটি লভ্যাংশ-সংক্রান্ত। সামিট পাওয়ারের ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত প্রতিটি বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) ঘোষিত নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। যোগ করলে দাঁড়ায় ২,৪৮৮ কোটি টাকা। সামিট পাওয়ারের ৬৩.১৯ শতাংশ মালিকানা সামিট কর্পোরেশন লিমিটেডের (এসসিএল) এবং ৩.৬৫ শতাংশ মালিকানা ‘ইউরো হাব ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’-এর হাতে। সামিট কর্পোরেশন আবার শতভাগ মালিকানাধীন সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের (এসপিআই)। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জোটের (আইসিআইজে) ‘অফশোর লিকস ডাটাবেস’ বলছে, ইউরো হাব ইনভেস্টমেন্টস মূলত একটি বিদেশি বা অফশোর শেল কোম্পানি, যার সরাসরি মালিক বা শেয়ারহোল্ডার হলেন খোদ আজিজ খান ও তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খান। অর্থাৎ, স্পন্সর ও ‘বিদেশি বিনিয়োগের’ এই সম্মিলিত ৬৬.৮৪ শতাংশের (৬৩.১৯% + ৩.৬৫%) বিপরীতে প্রায় ১,৬৬৩ কোটি টাকা বৈধ লভ্যাংশের পরিচ্ছন্ন মোড়কে আজিজ খান পরিবারেরই নিজস্ব সিঙ্গাপুর ও অফশোর অ্যাকাউন্টে দেশের বাইরে চলে গেছে।

তৃতীয় সংখ্যাটি কর-সংক্রান্ত। বার্ষিক প্রতিবেদনের ‘ট্যাক্স রিকনসিলিয়েশন’ নোট বলছে, বাংলাদেশের বিধিবদ্ধ কর্পোরেট করের হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ হলেও সামিট পাওয়ারের প্রকৃত কর-হার ছিল ১ শতাংশেরও নিচে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১— তিন বছরে কর-পূর্ব মুনাফা ২,৪৪০ কোটি টাকা; দেওয়া হয়েছে মাত্র ২১.২৮ কোটি টাকা। কার্যকর কর-হার ০.৭১ থেকে ১.০৭ শতাংশ। বিশ বছরে এই কর-ছাড়ের পুঞ্জীভূত পরিমাণ অনায়াসেই ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

১৭,৬১০ কোটি, ২,৪৮৮ কোটি ও ২,৫০০ কোটি- এই তিনটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখলেই সামিটের প্রায় ২৬৮ কোটি টাকার দাবিটি কেন কোনো বিচ্ছিন্ন বিল নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত মডেলের যৌক্তিক পরিণতি, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কোম্পানির নিজের কণ্ঠেই স্বীকারোক্তি

পুরো অনুসন্ধানের সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণটি সামিট পাওয়ারই নিজের অডিটেড নথিতে লিখে রেখেছে।

২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের ২৪১ নম্বর পৃষ্ঠায় ইংরেজিতে স্পষ্ট লেখা, সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট ইউনিট ১-এর পিপিএ নবায়ন হয়েছে নতুন ট্যারিফ স্ট্রাকচার ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’-এর আওতায়। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ না দিলে টাকা দেওয়া হবে না। একই শর্ত প্রযোজ্য মাধবদী পাওয়ার প্ল্যান্ট ইউনিট ২ এবং চান্দিনা পাওয়ার প্ল্যান্ট ইউনিট ২-এর ক্ষেত্রেও। একই প্রতিবেদনের ২৩৯ নম্বর পৃষ্ঠায় কোম্পানি স্বীকার করেছে, এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার কারণেই তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের মুনাফা কমেছে। ২০২৩-২৪-এর প্রতিবেদনে এ-কথা আরও স্পষ্ট। তখন ১১টি প্ল্যান্ট (১০টি গ্যাস এবং ১টি ফার্নেস অয়েল) এই ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ শর্তে চলছে; পরিচালন মুনাফা সরাসরি এর প্রভাবে কমেছে।

এই বাক্যগুলো লিখেছেন কোম্পানির নিজস্ব অডিটর। অডিটেড নথিতে, সরকারি বিধিমালা মেনে। কোনো সাংবাদিকের দাবি নয়, কোনো বিরোধী পক্ষের অভিযোগ নয়- কোম্পানির নিজের হিসাবরক্ষকের কলম থেকে বেরনো কথা।

সরল অর্থ: আগের চুক্তিগুলোতে কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও টাকা পাওয়া যেত। এখন যাচ্ছে না বলে মুনাফায় ৯২.৮ শতাংশ ধস নেমেছে। সেই হারানো মুনাফা ফিরে পেতেই ২৬৮ কোটি টাকার বিল।

কতটা ধস নেমেছে ওই এক শর্তে? ২০২০-২১-এ শেয়ারহোল্ডারদের দায়যোগ্য নিট মুনাফা ছিল ৫৬০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ইপিএস ৫ টাকা ২৫ পয়সা (একই বছরে সমন্বিত মুনাফা ছিল ৮৪২ কোটি ৯০ লাখ)। ২০২৪-২৫-এ শেয়ারহোল্ডারদের দায়যোগ্য নিট মুনাফা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ কোটি ৮২ লাখে, ইপিএস মাত্র ৩৮ পয়সা। সক্ষমতা একই, বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকেরও কম।

স্বাভাবিক ব্যবসায়িক হিসাবে এ যেন এক মৃত্যুমুখী কোম্পানির আর্তনাদ। তবু এই ৩৮ পয়সা ইপিএসের কোম্পানিই গত মে মাসে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঘোষণা করেছে ১০.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ, অর্থাৎ শেয়ার-প্রতি ১ টাকা ৫ পয়সা। কোম্পানি যা আয় করেছে, তার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি টাকা বিতরণ করছে। অতীতে যা ‘কেন্দ্র না চালিয়ে’ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে কামানো হয়েছে, এখন বৈধ লভ্যাংশের মোড়কে তাই পকেটে টানা হচ্ছে।

৮৮ শতাংশ থেকে ৬.৫ শতাংশ— সক্ষমতার পতন

কেন্দ্র বসিয়ে রেখে কতটা আয় সম্ভব, তার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয় প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর বা সক্ষমতা ব্যবহারের হারে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ। সামিটের ২০০৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সাভার ও নরসিংদী কেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৮২ ও ৮৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২০-২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের ১১২ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায়, সক্ষমতা ব্যবহারের হার ২০১৬-১৭ সালের ৬৭ শতাংশ থেকে কমতে কমতে ২০১৯-২০ সালে ৩৩ শতাংশে নেমে আসে।

কেন্দ্রগুলোর এই অলসতা হঠাৎ নয়, ধারাবাহিক। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সামিটের সক্ষমতা ব্যবহারের হার ছিল ৭০-৭১ শতাংশ। নতুন কেন্দ্র যুক্ত হওয়ার পর তা ধারাবাহিকভাবে নামতে থাকে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালে এসে ঠেকেছে মাত্র ২৪ শতাংশে। অর্থাৎ বর্তমানে সামিটের মোট সক্ষমতার ৭৬ শতাংশই অলস- তবু ক্যাপাসিটি চার্জ চলছে।

কেন্দ্র-প্রতি চিত্রটি আরও মর্মান্তিক। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে সামিট গাজীপুর-২-এর ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ৩৬৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু ছিল মাত্র ৫১ দিন। সামিট বরিশালের ১২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের হার ছিল ২০ শতাংশ এবং এস অ্যালায়েন্সের ১৪৯ মেগাওয়াট কেন্দ্রের হার ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ। অথচ এই অলস সক্ষমতার বছরেও কোম্পানির রাজস্ব ছিল ২,৪০৩ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে (২০২০-২১) সক্ষমতা ব্যবহারের হার মাত্র ৫৪ শতাংশে উঠলেও, কোম্পানির রাজস্ব লাফিয়ে দাঁড়ায় ৩,৯৬৬ কোটি টাকায় এবং সমন্বিত নিট মুনাফা হয় ৮৪২ কোটি ৯০ লাখ টাকা!

বিপিডিবি’র তথ্য যাচাই করলে এই গল্পটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। বিপিডিবির ২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামিট বরিশালের বার্ষিক প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ছিল মাত্র ৬.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটি বছরে চালু ছিল মাত্র ২৩ দিন। সেই অচল ২৩ দিনে বিপিডিবি এই কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনেছে গড়ে ৩৬ টাকা ৮৫ পয়সায়, যা সেসময় ((২০২১-২২ অর্থবছরে) দেশের গড় উৎপাদন খরচের (৮.৮৪ টাকা) চার গুণেরও বেশি!

এই অস্বাভাবিক দামের পেছনে কোনো সুপরিচিত প্রযুক্তি নেই। আছে সরল গাণিতিক সত্য। যত কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তত বেশি ভাগ পড়ে প্রতিটি ইউনিটের গায়ে। উৎপাদন তলানিতে নামা সত্ত্বেও বার্ষিক রাজস্বের পাহাড় ভাঙেনি; কারণ সামিটের চুক্তিতে এই অলস কেন্দ্রের ভাড়া আদায়ের একটি নিরবচ্ছিন্ন রাস্তা খোদাই করে রাখা ছিল।

কেন এমন চুক্তি, কী করে স্বাক্ষর হলো- পেছনের ব্যাকরণ

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এমন একটি অসম চুক্তি কীভাবে স্বাক্ষর হলো? এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, পেছনে আছে তিনটি ব্যাকরণ।

প্রথম ব্যাকরণটি আইনি। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে পাস করিয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’। আইনটির ৬(২) ধারা সরকারকে অনুমতি দেয় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার। ৯ ধারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আদালতে রিট দায়ের নিষিদ্ধ করে। পাঁচ বছর মেয়াদি আইনটি বারবার বাড়িয়ে নেওয়া হয়। সবশেষ ২০২১ সালে এক সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ পর্যন্ত। অর্থাৎ পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চুক্তি হয়েছে দরপত্র ছাড়াই, আদালতে চ্যালেঞ্জের সুযোগ ছাড়াই। সামিটের ১৫টি কেন্দ্রের অন্তত ছয়টির পিপিএ স্বাক্ষরিত বা নবায়িত হয়েছে এই আইনের আওতায়। (এই ‘বিশেষ আইন’-এর পনেরো বছরের রাজনৈতিক জীবনচক্রের বিস্তারিত আসছে দ্বিতীয় পর্বে।)

দ্বিতীয় ব্যাকরণটি কর্পোরেট। সামিট পাওয়ারের বার্ষিক প্রতিবেদনের ‘হোল্ডিং স্ট্রাকচার’ চার্ট অনুযায়ী মালিকানার স্তর তিনটি। শীর্ষে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এসপিআই), যার সিংহভাগ (প্রায় ৭৮ শতাংশ) আজিজ খান পরিবারের এবং ২২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি জেরা-র হাতে। তার নিচে এসপিআই-এর শতভাগ মালিকানাধীন বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানি সামিট কর্পোরেশন লিমিটেড (এসসিএল)। আর সবচেয়ে নিচে, যেখানে সাধারণ পাবলিকের টাকা ঢালা হয়, সেই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি সামিট পাওয়ার লিমিটেড; যার ৬৩.১৯ শতাংশ মালিকানা এসসিএল-এর হাতে। এর বাইরে স্পন্সর হিসেবে সরাসরি ৩.৬৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ‘ইউরো হাব ইনভেস্টমেন্টস’-এর হাতে, যা মূলত আজিজ খান পরিবারেরই একটি গোপন অফশোর শেল কোম্পানি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পাবলিক কোম্পানিতে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ; কিন্তু মুনাফার সিংহভাগ- ৬৩.১৯ শতাংশ সিঙ্গাপুরে এবং ৩.৬৫ শতাংশ সরাসরি আইসিআইজে-র অফশোর লিকস ডেটাবেসে নথিভুক্ত একটি অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তৃতীয় ব্যাকরণটি রাজনৈতিক। আজিজ খানের বড় ভাই মুহাম্মদ ফারুক খান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী (২০০৯-২০১১) এবং সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী (২০১১-২০১৩)। একই পরিবারের একদিকে সরকারের মন্ত্রিসভায় অবস্থান, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-চুক্তির সবচেয়ে বড় বেসরকারি লাভকারীর আসন- এই স্বার্থ-সংঘাতের বিস্তারিত আসছে তৃতীয় পর্বে।

এই তিন ব্যাকরণ যখন একসঙ্গে কাজ করেছে, তখন ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল স্বাক্ষরিত হয়েছে সামিট এলএনজি টার্মিনালের ১৫ বছর মেয়াদি ‘টার্মিনাল ইউজ এগ্রিমেন্ট’ (টিইউএ)। চুক্তির ২৪.৫ ধারায় লেখা, রাজনৈতিক কারণ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টার্মিনাল অচল থাকলেও পেট্রোবাংলাকে মাসিক ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। এই ২৪.৫ ধারাটিই এখন ২৬৮ কোটি টাকার বিলের নৈতিক ভিত্তি, সামিটের দাবি অনুযায়ী। এই তিনটি ব্যাকরণের মিলিত ফলই হলো: আইন দিয়ে দরপত্র বাতিল, কর্পোরেট কাঠামো দিয়ে মুনাফা সিঙ্গাপুরে পাচার, এবং রাজনৈতিক সংযোগ দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের উপরে রাখা। পরবর্তী দুই পর্বে এই তিন ব্যাকরণের বিস্তারিত প্রমাণ আসছে।

হেরে যাওয়া মামলা, পাওনার চেহারায়

সামিটের আর্থিক বিবরণীতে অডিটরের চোখে ধরা পড়া আরেকটি বড় গোঁজামিল, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াই।

তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুক্তির বাইরে বাড়তি দর দাবিকে কেন্দ্র করে বিআরইবি-র সঙ্গে বিরোধ গড়ায় আরবিট্রেশন থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ২০২৩ সালের ৯ মার্চ আপিল বিভাগ বিআরইবি-র পক্ষে রায় দেয়— সর্বোচ্চ আদালতে সামিট হেরেছে।

কিন্তু রায়ের পর সামিট ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকার এই বিতর্কিত অর্থকে ব্যালেন্স শিট থেকে লোকসান হিসেবে অবলোপন (Write-off) করেনি। ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এটি এখনও ‘Trade Receivables’ বা সরকারের কাছে পাওনা হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কোম্পানির ব্যাখ্যা, তারা আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট একটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে। যতদিন রিভিউ ঝুলে আছে, অন্তত ততদিন এই ৬৯৫ কোটিকে ‘পাওনা’ হিসেবে দেখিয়ে ব্যালেন্স শিট স্ফীত রাখা যাবে।

অডিটর ফার্ম এসিএনএবিআইএন ঠিক এই কারণেই কোম্পানির ২০২৪-২৫ সালের আর্থিক বিবরণীর ওপর ‘Emphasis of Matter’ বা বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ দিয়েছে। তবে সমস্যা শুধু এটুকুতেই থামেনি। এই একই ‘Emphasis of Matter’-এ এসিএনএবিআইএন আরেকটি বড় আপত্তির কথা উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে (Note 49-R), মূল স্পন্সর কোম্পানি ‘সামিট কর্পোরেশন লিমিটেড’-কে (যার মাধ্যমে মুনাফা সিঙ্গাপুরের এসপিআই-তে যায়) লভ্যাংশ দেওয়ার সময় সামিট পাওয়ার কোনো ধরনের উৎসে কর (Withholding tax) কর্তন করেনি! (অডিটরদের দুই দশকের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলার বিস্তারিত আসছে তৃতীয় পর্বে।)

পেট্রোবাংলার নীরবতা

সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিটের এই ২৬৮ কোটি টাকার ভাড়া দাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের উপব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ও আইন) হাসান আব্দুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে জানান, “এ-বিষয়ক কোনো তথ্য আমার কাছে নেই, ভালো বলতে পারবে পেট্রোবাংলা।”

আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন উল্টো প্রশ্ন করেন এই প্রতিবেদকের কাছে, “এলএনজি সরবরাহ করতে না পারলে তো সামিটকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সরকার ভাড়া দেবে কেন?” তিনিও পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

২৬৮ কোটি টাকার প্রসঙ্গ তুলতেই যেন আকাশ থেকে পড়লেন পেট্রোবাংলার মুখপাত্র, উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান। গত ৯ ডিসেম্বর প্রথম যোগাযোগ। তিনি জানালেন, এ-বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না; বিষয়টি ‘চুক্তি অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ’ হবে হয়তো।

৯ ডিসেম্বরের প্রথম কথোপকথনে তারিকুল ইসলাম খান বলেছিলেন, ‘এমন তথ্য কেউ আগে আমার কাছে জানতে চায়নি।’ কিন্তু এরপর এই প্রতিবেদক সামিট পাওয়ারের ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা, পেট্রোবাংলার অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য এবং চুক্তির ২৪.৫ ধারার ভাষা সরাসরি পাঠান। পরের ফোনে তাঁর কণ্ঠস্বর বদলে গেল। ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ শব্দটি আর উচ্চারণ করলেন না। বললেন, ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলাপ করে জানাবেন।

এরপর শুরু হয় লুকোচুরির দীর্ঘ নাটক। ১১ ডিসেম্বর: তথ্য পাননি বলে জানালেন। ১৫ ডিসেম্বর: ব্যস্ততার অজুহাত, আরও সময় চাইলেন। ১৭ ডিসেম্বর: হোয়াটসঅ্যাপে আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন পাঠানো হলো। ১৯ ডিসেম্বর: সাড়া নেই। ২২ ডিসেম্বর: সাড়া নেই।

শুধু মুখপাত্রই নন। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব মো. রেজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে ৯ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দফায় দফায় ফোন, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ। সব নিঃশব্দ। পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. আব্দুল জলিলও কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২২ ডিসেম্বর পেট্রোবাংলার একজন দায়িত্বশীল নারী কর্মকর্তা, যিনি জ্বালানি খাতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত, এই প্রতিবেদকের কাছে পেছনের ছবি ব্যাখ্যা করেছেন। “সামিট অনেক বড় ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো সত্য প্রকাশ করলে রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মূলত এই ভীতি বা শঙ্কা থেকেই পেট্রোবাংলার কেউ গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে চাইছেন না।” তিনি জানান, “চুক্তির এই অনৈতিক ধারা ব্যবহার করেই এখনো বিল চাওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি বিতর্কিত হওয়ায় আজ (২২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত পেমেন্ট স্থগিত রাখা হয়েছে। সামিট বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে, আমরাও প্রাতিষ্ঠানিক জবাব দিচ্ছি। ২০২১ সালের নভেম্বরেও বঙ্গোপসাগরে মুরিং লাইন ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে তিন মাস টার্মিনাল বন্ধ ছিল, তখনও সামিট টাকা চেয়েছিল। যদিও পেট্রোবাংলা তা দেয়নি।”

পরিচয় প্রকাশে ভীতি কেবল এই কর্মকর্তার নিজস্ব নয়। পেট্রোবাংলার আরও তিনজন মধ্য পর্যায়ের কর্মকর্তা এই অনুসন্ধানে কথা বলেছেন, কেউ সরাসরি নয়। এই ভীতি যে কেবল একটি ব্যক্তিগত পেশাগত সতর্কতা, নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ, যেখানে একটি বেসরকারি গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজের ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নেওয়া। পেট্রোবাংলার এই নীরবতার পেছনে আরও কারণ আছে, যা দ্বিতীয় পর্বে তুলে ধরা হবে।

আজিজ খানের সিঙ্গাপুর-সাম্রাজ্য, ১৯১টি জব্দ হিসাব

দেশের জ্বালানি খাত থেকে অর্জিত মুনাফা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, তার নিদর্শনও পাওয়া যায় সামিটের কর্পোরেট কাঠামোতেই।

সামিটের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত দু’দশকের বেশি সময় ছিলেন মুহাম্মদ আজিজ খান। কোম্পানির নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, তিনি বর্তমানে একজন সিঙ্গাপুরের নাগরিক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনি চেয়ারম্যান পদ ভাই লতিফ খানের কাছে হস্তান্তর করে নিজে সাধারণ পরিচালক হন। মার্কিন ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০২৫ সালের সর্বশেষ তালিকায় তিনি সিঙ্গাপুরের ৪৯তম ধনী ব্যক্তি, সম্পদমূল্য ১১০ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩,৫০০ কোটি টাকা। যে এক দশকে বাংলাদেশের গৃহস্থ রান্নাঘর গ্যাসের জন্য রেশনিং-এ যেতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে আজিজ খানের ব্যক্তিগত সম্পদ ৯১০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১ বিলিয়ন ডলারে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে আজিজ খান সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত এসপিআই-র ২২ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেছিলেন জাপানের জেরা’র কাছে ৩৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২,৮০০ কোটি টাকায়। লেনদেনটি ২০১৯-২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। কিন্তু এই বিশাল লেনদেনের একটি পয়সাও বাংলাদেশের সামিট পাওয়ার লিমিটেডে আসেনি। কারণ লেনদেনটি হয়েছে সিঙ্গাপুর-নিবন্ধিত এসপিআই-র শেয়ারের ক্ষেত্রে। এসসিএল-এর ৬৩.১৯ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকায় বাংলাদেশ সরকার কোনো ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স পায়নি।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আজিজ খান ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে ২৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রেখে আজিজ খান পরিবারের মালিকানাধীন ১৯১টি ব্যাংক হিসাব (যাতে ৪১.৭৪ কোটি টাকা রয়েছে) জব্দ রাখার নির্দেশ দেন।

ব্যাংক হিসাব জব্দ-অবস্থায় থাকা একটি গোষ্ঠী যখন একই সময়ে সরকারি কোষাগার থেকে ২৬৮ কোটি টাকা ভাড়ার বিল ধরিয়ে দেয়, আবার নিজেদের শেয়ারহোল্ডারদের ১০.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করে, তখন বিষয়টিকে আর প্রচলিত ব্যবসা বলা যায় কি না, সে-প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

টোকিওর নীরবতা

অচল প্রায় চার মাসের বিলের দাবিকে নৈতিক ভিত্তি দিতে সামিট তাদের জাপানি অংশীদারদের সামনে রাখছে। সামিটের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনাকারী কোম্পানি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কো. লি.-এর (এসএলএনজি) শেয়ারহোল্ডার বিন্যাসে সামিট কর্পোরেশনের ৭৫ শতাংশ এবং মিতসুবিশি কর্পোরেশনের ২৫ শতাংশ। টার্মিনালের অর্থায়নে জাপানের সুমিতোমো মিতসুই ব্যাংকিং কর্পোরেশন (এসএমবিসি) সম্পৃক্ত। আর জাপানের জেরা কোম্পানির ২২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সিঙ্গাপুর-নিবন্ধিত মাতৃ-কোম্পানি সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালে (এসপিআই)।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের প্রতিপ্রশ্ন, বাংলাদেশের মানুষ যখন অন্ধকারে এবং শিল্প যখন গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে, তখন আবহাওয়াগত কারণে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েও জনগণের করের টাকা দাবি করা কি সত্যিই জাপানি ‘কর্পোরেট গভর্ন্যান্স’-এর সংজ্ঞায় পড়ে?

৯ ডিসেম্বর মিতসুবিশি ও জেরার টোকিও দপ্তরে ইমেইলে তিনটি প্রশ্ন পাঠানো হয়: ২৬৮ কোটি টাকার বিল, পেট্রোবাংলার সঙ্গে বিরোধ এবং তাদের নিজস্ব কর্পোরেট সুশাসন নীতির সঙ্গে এই দাবির সামঞ্জস্য। আজ ২৯ ডিসেম্বর, ইমেইল পাঠানোর ২০ দিন। টোকিও নীরব। ঢাকা নীরব। পেট্রোবাংলা নীরব। সামিটের জনসংযোগ বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার ফয়সাল আল-আমীনের কাছ থেকে দুটি শব্দ: ‘Noted bhai।’ অথচ এই একই মিতসুবিশি ও জেরা তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ‘কর্পোরেট গভর্ন্যান্স’ ও ‘টেকসই উন্নয়ন’কে প্রতিষ্ঠানের মূল মূল্যবোধ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের একটি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে তাদের এই নীরবতা সেই ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- সেই প্রশ্নের উত্তরও অনুত্তরিতই রইল।

যদিও এই নীরবতা নিজেই একটি উত্তর।

ভোক্তা-অধিকারের জবাব, প্রকৌশল-জ্ঞানীর শঙ্কা

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম সামিটের দাবিটির যৌক্তিকতা সরাসরি খণ্ডন করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, “সেবা না পেয়ে আমি পয়সা দেব কেন? সামিট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই এমন ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। তারা চুক্তিতে এমন সব শর্ত লিখে নিয়েছে, যার মাধ্যমে সেবা না দিয়েও বছরের পর বছর টাকা দাবি করে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এসব চুক্তি অবিলম্বে পর্যালোচনা করা। সেবা দিতে না পারলে উল্টো তাদেরই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা, অথচ তারা জনগণের টাকা দাবি করছে।”

শামসুল আলমের অভিযোগ আরও তীক্ষ্ণ। “বিগত সরকার এবং বিনিয়োগকারীরা যোগসাজশ করে এমন সব আইন ও চুক্তি তৈরি করেছে, যা দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে। নাইকো চুক্তি যদি দুর্নীতির কারণে বাতিল হতে পারে, তবে সামিটের এই অনৈতিক চুক্তি কেন বাতিল হবে না? শুধু চুক্তি বাতিল নয়, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে এই বাড়তি সুবিধা নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম প্রকৌশলগত দিক থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন। “প্রাকৃতিক কারণে যদি সরকার গ্যাস নিতে না পারে, সেটার জন্য সরকার দায়ী নয়। সরকার তো নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। আবার ঘূর্ণিঝড় তো সামিটও নিয়ন্ত্রণ করে না। তাই ‘ফোর্স মেজার’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে সামিটের বাড়তি ভাড়া দাবি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

ম. তামিম একটি সূক্ষ্ম প্রশ্নও তুললেন। “ঘূর্ণিঝড় তো এক-দুই দিনের জন্য হয়। ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাতে তারা টার্মিনাল গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নিয়েছিল, এটা জানি। কিন্তু এর জন্য চার মাস তো লাগার কথা না। এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সামিট যদি গ্যাস দিতে প্রস্তুত থাকে আর পেট্রোবাংলার কারণে দেরি হয়, তবেই তারা টাকা চাইতে পারে। অন্যথায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সালিশি আদালতে গড়াতে পারে।”

বিইআরসি-র একজন নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চুক্তির ভাষা বদলেছে, স্বার্থ বদলায়নি। ফিলিপাইন বা পাকিস্তান বহু আগেই অ্যাভেইলেবিলিটি-বেসড ট্যারিফে গেছে; বাংলাদেশ এখনো ১৯৯০-এর দশকে আটকে। বিদেশি অংশীদার এনে নৈতিক সিল পাওয়া যায় না, যদি চুক্তিতে ভোক্তার স্বার্থ অনুপস্থিত থাকে।”

চার মাসের ভাড়া দাবির সবচেয়ে বড় আপত্তি এখানেই। বিলম্বের কারণ প্রকৃতি নয়, সামিটের নিজের পরিকল্পনার দুর্বলতা- এবং এই স্বীকারোক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে সামিটেরই নথিতে।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত বিবৃতিতে স্বীকার করা হয়েছে, প্রথম দফায় পাঠানো ‘অ্যাঙ্কর হ্যান্ডলিং টাগ’ (‘কোরাল’)-এর সক্ষমতা যথেষ্ট ছিল না; ভাঙা গ্র্যাভিটি অ্যাঙ্কর সরাতে পারেনি। পরে নরওয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার ডুবুরি-দলসহ অরিয়েন্টাল ড্রাগন নামের শক্তিশালী জাহাজ আনা হয়।

ঘূর্ণিঝড় এক-দুই দিনের। প্রায় চার মাসের বিলম্বের দায় কার? সামিটের নিজের নথিই বলছে: সঠিক সরঞ্জাম আনতে দেরি হয়েছিল। সেই দেরির ভাড়া এখন জনগণের কাছে চাওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর তুলনাটি আসে পেট্রোবাংলার নিজের পরিসংখ্যান থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মহেশখালীর একই সমুদ্রে নোঙর-করা এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে রি-গ্যাসিফিকেশন হয়েছে ৩.২৪ মিলিয়ন টন (১,৫৭,০৮২ মিলিয়ন ঘনফুট)। সামিটের টার্মিনাল রূপান্তর করেছে মাত্র ২.৫৬ মিলিয়ন টন (১,২৪,৭৯২ মিলিয়ন ঘনফুট)। প্রসঙ্গত, এক্সিলারেট-এর টার্মিনালের দৈনিক ক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিটের ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট- অর্থাৎ ক্ষমতার পার্থক্য স্বাভাবিক অবস্থাতেও বছরে প্রায় ৩৬,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ব্যবধান তৈরি করে। প্রায় চার মাসের অতিরিক্ত অচলতার কারণে সামিটের প্রকৃত ঘাটতি ছিল এর বাইরেও উল্লেখযোগ্য। এই সংখ্যাটি নিজেই বলে দেয়, প্রায় চার মাসের অচলতা প্রকৃতির দোষ নয়, সামিটের নিজস্ব প্রস্তুতিহীনতার ফল। এজন্য কোনো ব্যাখ্যা, পেনাল্টি পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে চাওয়া হয়নি; বরং প্রায় ২৬৮ কোটি টাকার বিল পেন্ডিং।

‘নোটেড ভাই’- এবং তারপর নীরবতা

সামিট গ্রুপের অবস্থান জানতে এই প্রতিবেদক গত ৯ ডিসেম্বর সামিট গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগ ও কোম্পানি সচিব বরাবর ইমেইল পাঠান। ২৬৮ কোটি টাকার দাবি ও সেবা না দিয়েও অর্থ চাওয়া সরকারের ‘নো সার্ভিস, নো পেমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়।

পরদিন ১০ ডিসেম্বর সামিট কর্পোরেশনের পিআর ও মিডিয়া বিভাগের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ফয়সাল আল-আমীন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে বক্তব্য তৈরি করতে কিছু সময় প্রয়োজন। ১১ ডিসেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে তাগাদা দিলে তিনি বললেন, “আমরা প্রশ্নগুলো পর্যালোচনা করছি। প্রশ্নগুলো চমৎকার ও যৌক্তিক।” কিন্তু সেদিনই উত্তর সম্ভব না।

তবে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও সামিটের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি কোনো জবাব আসেনি। অবশ্য বিল দাবির বিষয়ে সামিটের মনস্তত্ত্ব বুঝতে খুব বেশি হাতড়ানোর প্রয়োজন নেই। ২০২৪ সালে সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া বক্তব্যে সামিট কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল করিম খান নিজেদের পক্ষে জাপানি সুশাসনের ঢালটি ঠিক এভাবেই ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি (এসএলএনজি) বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক শেয়ারহোল্ডার যৌথভাবে পরিচালনা করছে- জেরা, মিতসুবিশি, এবং সামিট। জাপানের এসএমবিসি থেকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আমাদের কার্যক্রমকে আরও দৃঢ় করেছে, এবং আমরা কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করি। তাঁরা নিশ্চিত করেন যে ইনভয়েসগুলো চুক্তির শর্ত মেনেই দাখিল করা হচ্ছে। আমাদের কাস্টমাররাও এসব চুক্তি অনুসারে যেকোনো ইনভয়েস চ্যালেঞ্জ করার অধিকার রাখেন।”

বক্তব্যটি আগের হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বর্তমান সংকটের একটি বড় প্রশ্ন। চুক্তির শর্ত মেনেই যদি ইনভয়েস দেওয়া হয়ে থাকে, তবে দু’দশকে অসংখ্য ইনভয়েসের একটিও কেন পেট্রোবাংলা চুক্তি অনুযায়ী ‘চ্যালেঞ্জ’ করেনি? নাকি চ্যালেঞ্জ করার প্রাতিষ্ঠানিক সাহসই কখনো ছিল না?

ইতিমধ্যে সামিট পাওয়ারের ২০২৪-২৫ অডিটেড বিবরণী পর্যালোচনায় এই প্রতিবেদকের কাছে আরও কয়েকটি গুরুতর তথ্য উন্মোচিত হয়। ১৩ ডিসেম্বর আরও চারটি প্রশ্ন পাঠানো হয়: ৩৮ পয়সা ইপিএসের বিপরীতে ১০.৫০ শতাংশ লভ্যাংশের উৎস কী; হেরে যাওয়া মামলায় ৬৯৫ কোটি ‘পাওনা’ দেখানোর ব্যাখ্যা কী; এবং দুবাইতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিক্রি কি দেশ থেকে পুঁজি গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত।

দ্বিতীয় দফার এই চার প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল আল-আমীনের প্রতিক্রিয়া: ‘Noted bhai’ (নোটেড ভাই)।

দুটি শব্দ। ৩৮ পয়সা ইপিএসের বিপরীতে ১০.৫০ শতাংশ লভ্যাংশের প্রশ্ন। হেরে যাওয়া মামলায় ৬৯৫ কোটি ‘পাওনা’র প্রশ্ন। দুবাইতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিক্রির প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আদায়কারী এই কোম্পানির একজন সিনিয়র ম্যানেজারের কাছ থেকে পাওয়া মোট উত্তর- দুটি শব্দ।

২৩ ডিসেম্বর শেষবারের মতো তাগাদা দেওয়া হলো। কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব এল না।

“আমি কোনো ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ দিই না”

এই প্রতিবেদক ১৫ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দপ্তরে লিখিত প্রশ্নমালা পাঠান। তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন ছিল: প্রথমত, ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় সেবা না দিয়েও সামিটের ২৬৮ কোটি টাকা দাবির মুখে সরকার ‘নো সার্ভিস, নো পেমেন্ট’ নীতিতে অটল থাকবে কি না।

দ্বিতীয়ত, ইপিএস ৩৮ পয়সায় নেমে এলেও সামিট গ্রুপ কীভাবে শেয়ারহোল্ডারদের ১০.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে এবং একই সঙ্গে সরকারের কাছে ২৬৮ কোটি টাকা দাবি করে, সেই দ্বিমুখী আচরণের কারণে চুক্তি বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।

তৃতীয়ত, বিআরইবি-র সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে হেরেও সামিটের আর্থিক বিবরণীতে ৬৯৫.৬৪ কোটি টাকা ‘পাওনা’ হিসেবে দেখানোর বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কী।

প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে তিনদিনের সময় দিয়ে নিয়মিত ফলো-আপের পর ২৮ ডিসেম্বর দুপুরে ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা হয়। প্রশ্ন শুনে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কোনো ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ দিই না।’ ফোন রেখে দিলেন। লিখিত প্রশ্নের উত্তর এখন পর্যন্ত আসেনি।

রহিমার চুলায় ফেরা

তিন মাসের অনুসন্ধান শেষে এই প্রতিবেদক ২৭ ডিসেম্বর আবার ফিরেছিলেন চকবাজারে। রহিমা বেগমের চুলায় তখন গ্যাসের চাপ ফিরেছে। কিন্তু সিলিন্ডারের অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। “আবার যখন বন্ধ হবে, তখন তো কেউ এসে আমাকে আগে বলবে না।”

তাঁকে এই প্রতিবেদনের প্রধান তথ্যগুলো সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রায় চার মাস গ্যাস বন্ধ থাকার জন্য সামিট ২৬৮ কোটি টাকা চেয়েছে। সেই কোম্পানিটি ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত কেন্দ্র না চালিয়েও ১৭,৬১০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে। তাদের মুনাফা যায় সিঙ্গাপুরে। কর প্রায় দেয় না। তাদের পরিবারের ১৯১টি ব্যাংক হিসাব জব্দ। মামলায় হেরেও তারা ৬৯৫ কোটি টাকা সরকারের কাছে পাওনা বলে দাবি করছে।

রহিমা বেগম অনেকক্ষণ চুপ থেকে শুধু বললেন, “এত টাকা! আর আমার মেয়ের স্কুলের বেতন আটকে আছে দুই হাজার টাকায়।”

উপরের এই ছবির পেছনে কেবল একটি কোম্পানি নেই। আছে একটি জ্বালানি-নীতি, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তিকে বেশি লাভজনক করেছে। একটি ‘বিশেষ আইন’, যা প্রতিযোগিতা ছাড়াই পিপিএ নবায়নের রাস্তা খুলেছে। এবং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না, বিইআরসির কর্মকর্তা নাম বলতে রাজি নন, আর জ্বালানি উপদেষ্টা প্রশ্ন শুনেই ফোন কেটে দেন।

৩,৩৫৭ পৃষ্ঠার আর্থিক রেকর্ড, পেট্রোবাংলার তিনটি ঊর্ধ্বতন পদে সাত দিনের নীরবতা, টোকিও থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত উত্তর-না-পাওয়ার শৃঙ্খল, সামিটের সিনিয়র ম্যানেজারের ‘নোটেড ভাই’- এই সবকিছুর হিসাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় চকবাজারের সেই দু’হাজার টাকায় আটকে থাকা স্কুলের বেতনে।

বিশ বছরের অভিজ্ঞতা রহিমাকে এটুকু শিখিয়েছে।

*দ্বিতীয় পর্ব: নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পাশ কাটিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজিতে ঝোঁকার কারণ কী?

*তৃতীয় পর্ব: জ্বালানি অলিগার্কদের ‘১০ দিনের ভেলকি’, সমাধান কোন পথে?