শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পাশ কাটিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজিতে ঝোঁকার কারণ কী?

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অলিগার্কদের দৌরাত্ম্য, ভুল নীতি এবং হাজার কোটি টাকার অপচয় নিয়ে একুশে পত্রিকার তিন পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্ব।
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৩১ পূর্বাহ্ন

  • কাগজে-কলমে বিপুল সক্ষমতা, অথচ গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকছে বিদ্যুৎকেন্দ্র।

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অবহেলা করে জীবাশ্ম খাতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ; নতুন মহাপরিকল্পনায়ও আমদানিনির্ভরতার ছক।

  • সাশ্রয়ী গ্যাসের অভাবে ৫ গুণ বেশি দামি তেলে চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্র; পিডিবির বার্ষিক লোকসান ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

  • ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়ার নামেই গচ্চা গেছে সোয়া লাখ কোটি টাকা।

  • চীন-জাপান যে প্রযুক্তি বর্জন করেছে, বাংলাদেশ সেই ব্যয়বহুল ভাসমান টার্মিনালের ফাঁদে পা দিয়ে লুটপাট নিশ্চিত করছে: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

২০ ডিসেম্বর, ২০২৫। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর ৬টা। চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারের বাদুরতলা এলাকা। হাড়কাঁপানো শীতে জুবুথুবু হয়ে ঘুম থেকে উঠেছেন গৃহিণী উম্মে কুলসুম। উদ্দেশ্য একটাই—বাচ্চাদের স্কুল আর স্বামীর অফিসের জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করা। রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলা চালু করলেন, কিন্তু নীল আগুনের বদলে বের হলো কেবলই হিসহিস শব্দ। গ্যাসের চাপ শূন্য।

উম্মে কুলসুম বলছিলেন, ‘শীতের দিনে লেপ মুড়ি দিয়ে যে একটু আরাম করব, সেই উপায় নেই। ভোরে উঠেও গ্যাস পাই না। মাস শেষে গ্যাসের বিল দিই, আবার সিলিন্ডারও কিনতে হয়। একে তো জিনিসের দামে আগুন, তার ওপর এই সংকট।’

এই চিত্র শুধু উম্মে কুলসুমদের রান্নাঘরের নয়, এটি এখন কম-বেশি অনেক এলাকার চিত্র। একদিকে কনকনে শীতে গ্যাসের অভাবে ঠিকমতো জ্বলছে না চুলা, অন্যদিকে গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকছে কলকারখানা। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেল, গ্যাস বা এলএনজির অভাবে বন্ধ পড়ে আছে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র—এ বৈপরীত্য কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি এক দশক ধরে চলা ভুল পরিকল্পনা, আমদানি-নির্ভরতা এবং ‘নীতি পক্ষাঘাতের’ এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৩৬২ মেগাওয়াটে। অথচ এই বিপুল সক্ষমতার বিপরীতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড মাত্র ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট, যা গত ২৩ জুলাই অর্জিত হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক সক্ষমতাই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব বলছে, দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬৬১ কিলোওয়াট ঘণ্টায়। সক্ষমতার এই বিশাল ফারাক এবং অলস পড়ে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে দিনের পর দিন অলস বসে থাকছে। কিন্তু গ্রিডে বিদ্যুৎ জোগাতে চালানো হচ্ছে পাঁচগুণ বেশি দামি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। কাগুজে পরিকল্পনা আর কঠিন বাস্তবতার এই যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ খাত, যার আর্থিক দায় কখনো ভর্তুকির নামে, কখনোবা বাড়তি দামের মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন সময়ের মহাপরিকল্পনা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ পাশাপাশি রেখে এই প্রতিবেদক বের করার চেষ্টা করেছেন, এই সংকটের শেকড় ঠিক কতটা গভীরে।

নতুন পরিকল্পনা, পুরোনো সংকট

বিদ্যুৎ খাতের নীতি নির্ধারকরা প্রায়শই মহাপরিকল্পনার স্বপ্ন দেখিয়ে এসেছেন। ২০১০ সালের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি) থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনা—সবগুলোই জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর এবং অতি-উৎপাদন সক্ষমতাকে উৎসাহিত করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গত ২৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত গবেষণা বলছে, ২০১০-২০২৩ সময়কালে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এলেও এর ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশই গেছে জীবাশ্ম জ্বালানি বা এলএনজি খাতে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য খাতে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এই সংকট যখন ঘনীভূত, তখন সরকার নতুন করে ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি) ২০২৩ প্রণয়ন করে। এই নতুন পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি (ক্লিন এনার্জি) থেকে উৎপাদনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই মহাপরিকল্পনাতেও রয়ে গেছে গুরুতর অসংগতি।

অনুসন্ধান করে দেখা যায়, আইইপিএমপি ২০২৩ অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন—সৌর এবং বায়ু, ২০৫০ সালেও দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ পূরণ করবে। অথচ একই পরিকল্পনায় কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস) এবং অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিংয়ের মতো অপ্রমাণিত ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ হলো, আইইপিএমপিতে ‘নবায়নযোগ্য’ জ্বালানির বদলে ‘ক্লিন এনার্জি’ (যেমন হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া, কার্বন ক্যাপচার) বা অপরীক্ষিত প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা মূলত বিদেশি কোম্পানির স্বার্থরক্ষা ও আমদানিনির্ভরতা ধরে রাখার কৌশল। সংস্থাটির মতে, এতে ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১০ শতাংশে সীমিত রাখা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় সরকার সম্প্রতি ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫’ অনুমোদন করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মহাপরিকল্পনায় যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎকে এতটা সীমিত করে দেখা হয়েছে, সেখানে নতুন নীতিমালার এই আকাশছোঁয়া লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে?

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘কারেন্টস অব চেঞ্জ’ শীর্ষক এপ্রিল-জুন ২০২৫-এর এক প্রতিবেদনে এই অসংগতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায় পুনরায় চালু করার মতো সিদ্ধান্ত দেশের কার্বনমুক্ত জ্বালানির লক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

আইইপিএমপি ২০২৩-এর লক্ষ্যমাত্রা এবং নতুন নীতিমালার এই স্ববিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম-সচিব মোছা. লায়লাতুন ফেরদৌস বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘এসব বিষয় আমার জানা নেই। বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে কথা বলুন।’

বিদ্যুৎ বিভাগের মুখপাত্র ও উপসচিব ফারজানা খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।

প্রতিদিনের আর্থিক রক্তক্ষরণ

পরিকল্পনার এই ভুলের মাশুল কীভাবে গুনতে হচ্ছে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ মেলে পিজিসিবির দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে। দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পিজিসিবির অভ্যন্তরীণ এই নথিগুলো হাতে নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। ১৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন বলছে, সেদিন সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৪৭৮ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বিপুল উদ্বৃত্ত সক্ষমতা থাকলেও ২২১ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন বলছে, সেদিন সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ১১ হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। ‘শীতের কারণে চাহিদা কমে’ আসায় কাগজে-কলমে লোডশেডিং শূন্য দেখালেও, সংকটের প্রকৃত রূপটি ভিন্ন।

এর কারণ কী? পিজিসিবির নথি বলছে, শুধু গ্যাস সংকটের কারণে সেদিনও দেশের বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহৃত ছিল। এর মধ্যে ঘোড়াশালের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট, ৩৬৫ মেগাওয়াটের বৃহৎ কেন্দ্র এবং রিজেন্ট ১০৮ মেগাওয়াটের মতো ইউনিটগুলোও ছিল।

অথচ সরকারের নিজস্ব ‘প্রাকৃতিক গ্যাস বরাদ্দ নীতিমালা ২০১৯’ অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। তবুও বাস্তব চিত্র হলো, এই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোই গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকছে। এর বড় কারণ হলো, মূল্যবান গ্যাস বিদ্যুৎ খাতের বদলে অন্য খাতেও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএলের অভ্যন্তরীণ হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, শুধু গত সেপ্টেম্বর মাসেই দেশের সিএনজি স্টেশনগুলো প্রায় ৩৬৮ হাজার ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেছে।

অন্যদিকে, সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকলেও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় মাত্র ৭ টাকা। অথচ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রে সেই খরচ ২২ টাকা এবং ডিজেল চালিত কেন্দ্রে তা ৪০ টাকারও বেশি। অথচ সাশ্রয়ী গ্যাস বা নবায়নযোগ্য শক্তির অভাবে পিডিবিকে বাধ্য হয়ে ২২ টাকা দরের ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

প্রতিদিনের এই ভুল নীতির কারণেই বছর শেষে লোকসানের পাহাড় জমছে। গত ১০ ডিসেম্বর পিডিবির বোর্ড সভায় বিদ্যুৎ খাতের যে আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুমোদন করা হয়েছে, সেখানে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকার মোট ৫৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ১৭ হাজার কোটি টাকার বোঝা চেপেছে পিডিবির ঘাড়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, গত বছর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ১০ টাকা ৮০ পয়সা। আর বিতরণ কোম্পানির কাছে সেই বিদ্যুৎ পৌঁছাতে ব্যয় হয়েছে ১২ টাকা ৫০ পয়সা। অথচ গ্রাহক পর্যায়ে বা বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রিমূল্য ছিল মাত্র ৬ টাকা ৯৯ পয়সা। উৎপাদন ও বিক্রিমূল্যের এই বিশাল ফারাকের কারণেই ৫৫ হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির মতে, মূলত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) অলস বসিয়ে রাখা বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতেই হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, যা বিগত ১৫ বছরে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ‘লুটপাট’-এর সমতুল্য।

এদিকে অলস বসে থাকা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। সিপিডির ‘লাইটস আউট, স্ট্রেস ইন’ শীর্ষক এপ্রিল ২০২৫-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই বিপুল আর্থিক চাপের কারণে পিডিবি সময়মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না, যে কারণে জ্বালানি আমদানিতে সংকট তৈরি হচ্ছে এবং পুনরায় লোডশেডিং বাড়ছে—এ এক ভয়াবহ দুষ্ট চক্র।

সংকট কতটা গভীর

সরকারের আমদানি-নির্ভর নীতির ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)। দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সালে সরকার ‘বেসরকারি খাতে এলএনজি স্থাপনা নির্মাণ, আমদানি ও সরবরাহ নীতিমালা’ এবং ‘বেসরকারি পর্যায়ে এলএনজি আমদানি নীতিমালা’র মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু এই নীতিমালার অধীনে করা চুক্তিগুলোই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইইইএফএর ডিসেম্বর ২০২৪-এর একটি ব্রিফিং নোট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে সামিট গ্রুপের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর প্রায় চার মাস এটি গ্যাস সরবরাহে অক্ষম ছিল। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী, এই সময়ে টার্মিনালটি ব্যবহার না করা হলেও এর ভাড়া বাবদ প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা দাবি করে কোম্পানিটি। একটি ঘূর্ণিঝড়ই দেখিয়ে দিয়েছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ঠুনকো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এই আমদানি নির্ভরতার আর্থিক চিত্র বছর বছর আরও ভয়াবহ হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএলের সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিসহ মোট খরচ হয়েছে ৭২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। বিপুল এই ব্যয়ের পরও ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা ব্যাহত হয়েছে, যা সরাসরি গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

আরপিজিসিএলের নথি থেকে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য কাতার এনার্জি এবং ওকিউটি থেকে মোট ৫৬টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা ছিল। আমদানির এই ব্যাপকতা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। আরপিজিসিএলের গত ৯ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এমএলএনজি ও সামিট) থেকে ২৬ হাজার ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের (এমএমসিএফ) বেশি রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি ১৭ ডিসেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৫৫ এমএমসিএফ, যা দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতার এক স্পষ্ট চিত্র।

বিষয়টিকে ‘লুটপাটের ফাস্ট-ট্র্যাক আয়োজন’ হিসেবেই দেখছেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, চীন যে প্রযুক্তি অতিরিক্ত খরচের দায়ে ২০১৬ সালেই ছুঁড়ে ফেলেছে, জাপান যা এড়িয়ে চলে—বাংলাদেশ কেন সেই ব্যয়বহুল এফএসআরইউর ফাঁদে পা দিল? এর উত্তর হতে পারে একটাই—দ্রুততম সময়ে লুটপাট নিশ্চিত করা।

শামসুল আলমের প্রশ্ন, ‘সাগরের বুকে হাজার কোটি টাকার এই ভাসা-ভাসা প্রকল্পের পেছনে না দৌঁড়ে আমরা যদি সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে তাকাতাম, তবে আজ ঋণের বোঝা বাড়ত না। সমাধান যখন সূর্যের আলো আর বাতাসে ছিল, তখন আমরা কেন অন্ধকারেই থেকে গেলাম?’

আমদানি নির্ভরতাই মূল সমস্যা

আমদানি নির্ভরতার যে ‘নীতি-পক্ষাঘাত’ দেশের রান্নাঘর থেকে শিল্পখাতকে স্থবির করে দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, ‘আমদানি নির্ভরতা কমানোটাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। আর এর জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধানও জোরদার করতে হবে। যদিও গ্যাস অনুসন্ধান সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ আছে।’

নীতিনির্ধারকরা কি সেই ‘দ্রুত ও সাশ্রয়ী’ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে হাঁটবেন, নাকি আমদানির চড়া মূল্যের বোঝা চাপিয়েই রাখবেন জনগণের কাঁধে? সমাধান যখন হাতের মুঠোয়—সূর্যের আলো আর বাতাসে, তখন আমদানির অন্ধগলিতেই দেশ ঘুরপাক খাবে কি না—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রথম পর্ব: জাপানি ‘সততার’ আড়ালে সামিটের চুক্তিফাঁদ, পেট্রোবাংলার নীরবতা

তৃতীয় পর্ব: জ্বালানি অলিগার্কদের ‘১০ দিনের ভেলকি’, সমাধান কোন পথে?