– ২০১৬ থেকে ২০২৪, আট বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ১২৫ শতাংশ। চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। আজ অব্যবহৃত সক্ষমতা ৬১.৩ শতাংশ; ডিসেম্বরে যা পৌঁছেছে ৬৬.১ শতাংশে।
– বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ তিন বছরে বেড়েছে ৭২ শতাংশ। ৬ টাকা ৬১ পয়সা থেকে লাফিয়ে ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।
– বিপিডিবি’র মোট দেনা ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে ভর্তুকি ১ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। তবু নিট লোকসান ২৩,৬৪২ কোটি।
– দেশের গড় বিদ্যুৎ-উৎপাদন খরচ যেখানে ৮ টাকা, সেখানে প্যারামাউন্ট বি-ট্র্যাক বিপিডিবিকে প্রতি ইউনিট বিক্রি করেছে ১৮০ টাকা ৬৭ পয়সায়; বানকো ১০৫.৭২; অ্যাগ্রিকো ৮৮.৯০; সামিট বরিশাল ৩৬.৮৫।
– ২০১০ সালের ‘বিশেষ বিধান আইন’, যা পাঁচ বছরের জন্য সংসদে দরপত্রহীন চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা দিয়েছিল, পাঁচ-পাঁচবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ১৪ বছর ধরে দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ-গ্যাসের ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ চুক্তি।
– পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদনে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ভাড়াকে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ না লিখে ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ নামে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। দু’বছরে যার অঙ্ক ২,৮১০ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালীর পাথরঘাটায় ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ভোর ছ’টা। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল। শাহনাজ বেগম (৪৫) রান্নাঘরে চুলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। ডান হাতে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি, বাঁ হাতে রেগুলেটর। মোমের শিখা ধীরে ধীরে বার্নারের ছিদ্রগুলোর কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। যদি একটু গ্যাসও বের হয়, শিখা ধরবে। কিন্তু বার্নারের ওপর মোমবাতির শিখা স্থির থেকে যায়। একটুও কাঁপে না। শাহনাজ বেগম মোমবাতিটা সরিয়ে নেন। মাথা নত করে বসে থাকেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর উঠে দাঁড়ান- এই শীতের সকালে, এই বাড়িতে, আর কোনো উপায় নেই।
“এই বছরের শীত পুরোটাই এভাবে গেল,” বললেন তিনি। “ভোরে উঠে দেখি গ্যাস নেই। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন, স্বামীর সকালের নাশতা- সব আটকে থাকে। শেষে সিলিন্ডারে রান্না, না হয় বাইরে থেকে পরোটা-ডিম কিনে আনা। মাসে ঘরের গ্যাসের বিল দিই সাড়ে নয়শ টাকা, আবার সিলিন্ডার কিনতে যায় আরও প্রায় ১৭০০। মাঝখানে শাকপাতার দামে আগুন, চালের দাম বাড়ছেই। কোথায় থামব বুঝি না।”
শাহনাজ বেগমের পাথরঘাটার রান্নাঘর থেকে দক্ষিণে মাত্র ১২০ কিলোমিটার দূরে, মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে নোঙর-করা দু’টি বিশাল ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। প্রতিদিন প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট আমদানিকৃত গ্যাস এ-দু’টি টার্মিনাল হয়ে দেশের গ্রিডে ঢুকছে। গত আট বছরে এই দু’টি টার্মিনালের পেছনে পেট্রোবাংলা পরিশোধ করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। তবু শাহনাজ বেগমের চুলায় ঠিকমতো গ্যাস আসছে না।
কেন? উত্তরটি একটি বাক্যে: এই গ্যাস শাহনাজ বেগমের রান্নাঘরের জন্য নয়। গৃহস্থ গ্রাহক পান মাত্র ১০.৮৬ শতাংশ; বাকি সিংহভাগ যায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় কারখানার ক্যাপটিভ পাওয়ারে। আবার সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকেরও বেশি অলস বসে থাকে, কেবল ভাড়া আদায়ের জন্য।
এ-ই হলো ১৫ বছরের জ্বালানি-নীতির সারমর্ম। সেই নীতির পেছনে আছে একটি ‘বিশেষ আইন’, কয়েকটি দ্রুত-অনুমোদন, একগুচ্ছ চুক্তি যা প্রতিযোগিতা ছাড়াই স্বাক্ষরিত, এবং এমন একটি অর্থনৈতিক স্থাপত্য যেখানে সেবা না দেওয়াই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়িক কৌশল।
সংখ্যার সরল ব্যাখ্যা
২০১৬ সালের জুনে দেশের গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ-উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১২,৩৬৫ মেগাওয়াট। কিন্তু একই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ চাহিদা (পিক ডিমান্ড) ছিল প্রায় ১৭,২০০ মেগাওয়াট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইইএফএ-এর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭,০০০ মেগাওয়াট সর্বোচ্চ চাহিদা ও ২৭,৪১৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার ভিত্তিতে রিজার্ভ মার্জিন দাঁড়ায় ৬১.৩ শতাংশ; ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যা ৬৬.১ শতাংশে পৌঁছায়। অথচ চাহিদা বাড়া তো দূরের কথা, ২০২৫ সালে পিক চাহিদা উল্টো প্রায় ১.১ শতাংশ কমে ১৬,৯৯৯ মেগাওয়াটে নেমেছে- তবু নতুন বেসলোড কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা অব্যাহত।
একটি ‘হেলথি’ বা সুস্থ বিদ্যুৎ-গ্রিডের জন্য ২০ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিনকে সাধারণত আদর্শ ধরা হয়। তুলনামূলক চিত্রে তাকালে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাদ দিলে ভারতের রিজার্ভ মার্জিন ২৬ শতাংশ, ভিয়েতনামের ২৮.৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশের এই বিপুল ও ব্যয়বহুল অলস সক্ষমতা, টেকসই অর্থনীতির মানদণ্ডে এক অভাবনীয় নজির!
এই বাড়তি সক্ষমতা শুধু একটি অপচয়ের পরিসংখ্যান নয়। প্রতিদিন তা গৃহস্থ ও ক্ষুদ্র শিল্পের ঘাড় চেপে ধরে। কারণ চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকলেও বিপিডিবি’র পরিশোধ করতেই হবে ‘ফিক্সড কস্ট রিকভারি’ বা ক্যাপাসিটি চার্জ। আর সেই চার্জ যত বাড়ে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ততই গগনচুম্বী।
এর বাস্তব ফল: বিপিডিবি’র নিজস্ব আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ২০২০-২১-এর ৬.৬১ টাকা থেকে ২০২৩-২৪-এ এসে দাঁড়িয়েছে ১১.৩৫ টাকায়; তিন বছরে ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। এ বছর পিডিবির বিদ্যুৎ সরবরাহ মাত্র ৫.৮৫ শতাংশ বাড়লেও, বেসরকারি আইপিপিগুলোর পেছনে তাদের ব্যয় এক বছরেই ২৫.৬১ শতাংশ লাফিয়ে ৫৭ হাজার কোটি থেকে ৭২,০৭১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সক্ষমতা অলস পড়ে থাকার এই বিপুল বিল মেটাতে গিয়ে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা পিডিবির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকছে।
বিপিডিবি’র দেনার পাহাড়ই এই গণিতের নিদর্শন। বিপিডিবি’র ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদার ও আইপিপি সাপ্লায়ারদের কাছে তাদের মোট প্রদেয় বিল মাত্র এক বছরে ৮৪,১০০ কোটি টাকা থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকায়। দেশের পুরো বার্ষিক স্বাস্থ্য-বাজেটের প্রায় তিনগুণ। সরকার এই দেনা মেটাতে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিপিডিবিকে ভর্তুকি বরাদ্দ করেছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। তবু এই পাঁচ বছরে বিপিডিবি নিট লোকসান গুনেছে ২৩,৬৪২ কোটি টাকা।
বিপিডিবি’র ২০২৪-২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, মাত্র এক বছরে পিডিবির প্রদেয় বিল ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৯,১৬৮ কোটি টাকায় নেমেছে। কিন্তু এই কমার পেছনে লুকিয়ে আছে আরেক ভয়াবহ কারসাজি। পিডিবি তাদের আয় দিয়ে এই দেনা শোধ করেনি, বরং সরকার আইপিপি ও রেন্টাল কোম্পানিগুলোকে খুশি রাখতে সরাসরি বিশেষ বন্ড ইস্যু করেছে। অর্থাৎ, পিডিবির খাতা থেকে দেনা মুছে দিয়ে সেই অলিগার্কদের ক্যাপাসিটি চার্জের দায়ভার এখন জাতীয় ঋণ হিসেবে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর এই ক্যাপাসিটি চার্জের সিংহভাগ যাচ্ছে গুটিকয়েক বেসরকারি কোম্পানির কোষাগারে; সেই কোষাগার থেকে লভ্যাংশ সিঙ্গাপুর কিংবা অন্য অফশোর হোল্ডিং কোম্পানির হিসাবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ড. জাহিদ হোসেন পনেরো বছরের গণিতকে একটি বাক্যে দাঁড় করিয়েছেন: “দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৪.৪ গুণ, কিন্তু বিল পরিশোধ বেড়েছে ১১ গুণেরও বেশি। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৬৩৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩-২৪-এ ৭.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রকৃত গাণিতিক হার ১২.২ গুণ; জাতীয় কমিটির প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘১১ গুণেরও বেশি’ বলা হয়েছিল)।”
প্রতি ইউনিট ২৩০ টাকা ৮৫ পয়সা
বাংলাদেশের জ্বালানি-গণিতের সবচেয়ে চমকপ্রদ পরিসংখ্যানটি লুকিয়ে আছে বিপিডিবি’র বার্ষিক প্রতিবেদনের একটি প্রায়-অপ্রকাশিত টেবিলে: “Comparison of Electricity Purchase from IPP and SIPP” বা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের তুলনামূলক চিত্র। বিপিডিবি প্রকাশ করে প্রতি বছর, গণমাধ্যমে খুব কমই আলোচিত। এই অনুসন্ধানে বিপিডিবি’র ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্ত বলছে, কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ের ব্যবসায় সামিট কেবল মাঝারি খেলোয়াড়। বড় খেলোয়াড় অন্যরা।
প্যারামাউন্ট বি-ট্র্যাক এনার্জি (সিরাজগঞ্জ) ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিডিবি’র কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে গড়ে ১৮০ টাকা ৬৭ পয়সায়। দেশের সাধারণ গ্রাহক প্রতি ইউনিট কেনে গড়ে ৭ টাকায়। অর্থাৎ ২৬ গুণ। এম/এস বানকো এনার্জি জেনারেশন একই বছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে ১০৫ টাকা ৭২ পয়সায়। বিদেশি কোম্পানি অ্যাগ্রিকো এনার্জি সলিউশনের (ব্রাহ্মণগাঁও, ১০০ মেগাওয়াট) দাম ৮৮ টাকা ৯০ পয়সা; অ্যাগ্রিকোর আওরাহাটি কেন্দ্র ৭৬ টাকা ০১ পয়সা। বাংলা ট্র্যাক পাওয়ার (ইউনিট-২) ৬৪ টাকা ১৩ পয়সা। এপিআর এনার্জি (৩০০ মেগাওয়াট) ৪১ টাকা ৭৬ পয়সা।
সামিটের কেন্দ্রগুলোর গড় দাম এই হিসেবে অনেক ‘সহনীয়’, কিন্তু সংখ্যা-বহরের ওজনে ভয়াবহ। সামিট বরিশাল (১২০ মেগাওয়াট), ২০২১-২২-এ প্রতি ইউনিট ৩৬ টাকা ৮৫ পয়সা। এস অ্যালায়েন্স (সামিট গাজীপুর, ১৪৯ মেগাওয়াট), ২০২০-২১-এ ২২ টাকা ০২ পয়সা; ২০২১-২২-এ ১৬ টাকা ৪৯ পয়সা। সামিট গাজীপুর-২ (৩০০ মেগাওয়াট) ১৭ টাকা ১৮ পয়সা। সামিট নারায়ণগঞ্জ-২ ১৭ টাকা ২৯ পয়সা। ইউনাইটেড পায়রা (১৫০ মেগাওয়াট) টানা দু’বছর ৩২ টাকার বেশি দামে বিদ্যুৎ বেচেছে।
এই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০-২১ সালে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্যারামাউন্ট বি-ট্র্যাকের সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ দিয়েছে মাত্র ২ কোটি ১৫ লাখ ইউনিট- প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ১.২৩ শতাংশ। সোজা কথায়, ৩৬৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু ছিল মাত্র সাড়ে ৪ দিন। অ্যাগ্রিকোর ব্রাহ্মণগাঁও কেন্দ্রের ফ্যাক্টর ৩.২৫ শতাংশ। এই ফ্যাক্টরে কোনো কেন্দ্র আসলে চলে না; কেন্দ্রকে কেবল ‘উপস্থিত’ রাখা হয়। আর এই উপস্থিত থাকার জন্যই বিপুল বিল দেওয়া হয়।
এই ‘হরিলুট’ এখানেই থামেনি। বিপিডিবি’র সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, এই বছর ‘সিনহা পিপল এনার্জি’ নামের একটি কেন্দ্রকে অলস বসিয়ে রেখে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দেওয়া হয়েছে অবিশ্বাস্য ২৩০ টাকা ৮৫ পয়সা!
ফলাফল: বিপিডিবি’র নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি আইপিপিগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে তাদের ৫৭,৩৭৭ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালের অডিটেড প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যয় এক বছরেই ২৫ শতাংশের বেশি লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭২,০৭১ কোটি টাকায়! যার বড় একটি অংশই দেওয়া হয়েছে কোনো বিদ্যুৎ না কিনে, কেবল কেন্দ্র বসিয়ে রাখার ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ।
২০১০ সালের ‘বিশেষ আইন’- দুর্নীতির আইনি ব্যাকরণ
২০১০ সালে সরকার সংসদে পাস করিয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’। আইনটির মূল কথা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই যে কোনো বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে। আইনের ৯ ধারায় বলা ছিল, এই চুক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে রিট করা যাবে না। দরপত্র মুক্ত, রিট মুক্ত, পাঁচ বছরের জন্য।
পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা ২০১৫ সালেই। শেষ হয়নি। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে পাঁচবার। সবশেষ ২০২১ সালে এক সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ পর্যন্ত। অবশেষে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘২০২৪ সালের ১৫ নং অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে এই দায়মুক্তি আইনটি চূড়ান্তভাবে বাতিল করে। কিন্তু তার আগেই, গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুটপাটের যত চুক্তি হয়েছে, তার সবই হয়েছে এই আইনের ছায়ায়- দরপত্র ছাড়াই, মূল্যায়ন ছাড়াই এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা ছাড়াই।
সামিটের একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদনের (যেমন ২০২২-২৩ ও ২০২৪-২৫) Note 1.3 অনুযায়ী, ১১ মেগাওয়াট করে তিনটি কেন্দ্র- আশুলিয়া, মাধবদী ও চান্দিনা ইউনিট ১, যেগুলোর মূল চুক্তি ২০০০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৫ বছরের জন্য। মেয়াদ শেষে ২০১৮ সালে এই বিশেষ আইনের আওতায় আরও পাঁচ বছরের জন্য তা নবায়ন হয়। এরপর ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর পুনরায় ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ শর্তে আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন হয়। একই কেন্দ্র দু’বার নবায়িত, কখনো কোনো প্রতিযোগী দরদাতাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মদনগঞ্জের ইউনিট-১ এর ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১০ সালের ২৩ জুনে। ঠিক বিশেষ আইন পাসের সঙ্গে সঙ্গে। পাঁচ বছরের মূল মেয়াদ। এরপর ২০১৬ সালে আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন। এরপর ২০২২-এর ২৩ মার্চ আরও দু’বছরের জন্য ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ শর্তে নবায়ন। ১৪ বছরে একটি ফার্নেস অয়েল কেন্দ্রের তিন দফার চুক্তি; দরপত্র ছাড়াই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সামিটের ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এটিকে চুপিসারে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত (চতুর্থ দফায়) নবায়ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পটপরিবর্তন ও বিশেষ আইন বাতিলের পর, তাদের সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, কেন্দ্রটির মেয়াদ আসলে ২২ মার্চ ২০২৪-এই শেষ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে দ্রুতগামী উদাহরণ গাজীপুর-২ পাওয়ার লিমিটেডের ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র এবং মদনগঞ্জের এই ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি। মদনগঞ্জ কেন্দ্রটি মাত্র ২৭০ দিনে (৯ মাসে) নির্মাণের জন্য ২০১১ সালে ‘এশিয়ান পাওয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিল। অন্যদিকে গাজীপুর-২ কেন্দ্রটিও ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ প্রকল্প হিসেবে মাত্র ৯ মাসে দাঁড়িয়ে যায় ২০১৮ সালে। দেশের প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট হয়, একটি গ্যাস বা ফার্নেস-বিদ্যুৎকেন্দ্র দরপত্র, পরিবেশ ছাড়পত্র, ভূমি অধিগ্রহণ, যন্ত্রপাতি আমদানি, পরীক্ষা ও কমিশনিং মিলিয়ে গড়ে ২৮ থেকে ৩৬ মাস লাগে। ৯ মাসে দাঁড় করানো একমাত্র সম্ভব যখন আইনগত-প্রক্রিয়াগত সব বাধা ‘বিশেষ আইন’-এর জোরে অপসারিত।
একই ‘বিশেষ আইন’-এর ছায়ায় ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় (সামিটের দ্বিতীয়) ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের প্রক্রিয়াকরণও; এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালতে এখনো বিচারাধীন মামলা- যার বিস্তারিত আসছে পরবর্তী অংশে।
‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’- পেট্রোবাংলার শব্দ-চাতুর্য
বিপিডিবি’র ক্যাপাসিটি চার্জের বহুলপ্রচারিত সমালোচনার বিপরীতে পেট্রোবাংলার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চার্জ সম্পর্কে গণমাধ্যমে সামান্যই আলোচনা হয়েছে। কারণ পেট্রোবাংলা শব্দ বেছে নিতে জানে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে বিপিডিবি তাদের আর্থিক বিবরণীতে ‘Capacity Payment’ বা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট শব্দটি পরিষ্কার লেখে। কিন্তু সামিট ও এক্সিলারেট-এর দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য পেট্রোবাংলা তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যবহার করেছে একটি অস্পষ্ট সংকেতবাচক শব্দ: ‘Compensation for services’ বা ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’।
পেট্রোবাংলার অডিটেড লাভ-ক্ষতির বিবরণীতে “Cost of LNG Cargo and Re-gasification” শিরোনামের আওতায় এই ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ বা কেন্দ্রভাড়া দেখানো হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১,৪৮৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ছিল ১,৩২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ এ তা লাফিয়ে দাঁড়ায় ১,৮২৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়।
আর পেট্রোবাংলার সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালের অডিটেড প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে আরও ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। এই বছরে “Cost of LNG cargo and re-gasification” খাতের মোট ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ৪২,৬৪০ কোটি ৪৬ লাখ টাকায়! এই বিশাল ব্যয়ের পাহাড়ের ভেতর ঠিক কত হাজার কোটি টাকা এখন ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ বা ভাসমান টার্মিনালের বসে থাকার ভাড়া হিসেবে সামিট ও এক্সিলারেটের পকেটে গেছে, তা মূল লাভ-ক্ষতির বিবরণীতে সযত্নে আড়াল করা হয়েছে।
এই অর্থ আসলে কী? অনুসন্ধানে এই প্রতিবেদক তিনজন সাবেক পেট্রোবাংলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের সম্মিলিত বিশ্লেষণ: এই ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ মূলত টার্মিনাল ইউজ এগ্রিমেন্টের (টিইউএ) আওতায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দু’টির অপারেটরদের (সামিট ও এক্সিলারেট) দেওয়া ফিক্সড চার্জ বা রি-গ্যাসিফিকেশন ফি, যা প্রকৃত অর্থে এক ধরনের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। চার্জটি দেওয়া হয় ব্যবহার নির্বিশেষে। টার্মিনাল কতটুকু এলএনজি প্রক্রিয়াজাত করল, তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। মার্কিন গবেষণা সংস্থা আইইইএফএ-র তথ্য অনুযায়ী, উভয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল প্রতিদিন ৫ লাখ মার্কিন ডলার করে রি-গ্যাসিফিকেশন চার্জ পায়- গ্যাস সরবরাহ হোক বা না হোক।
কেন এই শব্দ-চাতুর্য? কেন বিদ্যুৎখাতের ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’-এর মতো এখানে স্বচ্ছ পরিভাষা নেই?
উত্তরটি সহজ। যেকোনো ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ প্রকাশ্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে: যত কম গ্যাস পেলাম, তত বেশি কেন দিলাম? টার্মিনাল কত শতাংশ সময় চালু ছিল? কী কারণে অচল? অচলাবস্থার জন্য কে দায়ী? এই প্রশ্নের একটিও পেট্রোবাংলার আর্থিক বিবরণীতে উত্তরযোগ্য নয়। শব্দ পাল্টে ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ করে দিলে এই প্রশ্নগুলোর প্রবেশাধিকারই বন্ধ।
চমকপ্রদ আরেকটি দিক: পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল বা বিপিডিবি- কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনেই টার্মিনাল-অচলতার কারণে আদায় হওয়া কোনো পেনাল্টির হিসাব নেই। সামিট ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রিমালের পর দীর্ঘ চার মাসের অচলতার জন্য ২৬৮ কোটি টাকা চাইতে পেরেছে; কিন্তু সেই অচলতার জন্য সামিট পেট্রোবাংলাকে কিছু দিয়েছে- এমন কোনো লাইন কোথাও নেই। চুক্তির ভাষায় ক্ষতিপূরণের চাকা ঘোরে একদিকেই।
এই নথিটি হাতে পেয়ে এই প্রতিবেদক পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের কাছে সরাসরি জানতে চান, লাভ-ক্ষতির বিবরণীতে দেখানো এই হাজার হাজার কোটি টাকা কি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ফিক্সড চার্জ? তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না।’ চুক্তিতে কোন শর্তে কত টাকা দেওয়া হয়, সেই প্রশ্নের জবাব দিতেও অস্বীকার করেন।
বারো দিন বনাম এগারো বছর
জ্বালানি-নীতির এই সম্পূর্ণ স্থাপত্য যখন এলএনজি ও ফসিল-ভিত্তিক বিদ্যুতের চারপাশে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ফাইলগুলো রাজনৈতিক উদাসীনতার ধুলো জমিয়েছে। সংখ্যাটি ভয়াবহ। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে- দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন। তুলনায়, ইনস্টলড ক্যাপাসিটিতে নবায়নযোগ্যের (জলবিদ্যুৎসহ) হিস্যা ভারতে প্রায় ৪৪ শতাংশ, পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি; আর শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে তা আরও বেশি (বছর ও উৎস-পদ্ধতিভেদে পরিবর্তনশীল)।
বাংলাদেশ রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মুস্তফা আল মাহমুদ একটি সংখ্যায় পনেরো বছরের পার্থক্য বুঝিয়ে দিলেন।
তাঁর সংগঠনের সদস্যরা ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌর প্রকল্পের ভূমি-অনাপত্তি, বিনিয়োগ-অনাপত্তি, পরিবেশ ছাড়পত্র, পিজিসিবি-সংযোগ চুক্তি পেতে গড়ে আট থেকে এগারো বছর ধরনা দেন। অনুমোদন মেলে না।
একই সময়ে সামিটের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষর থেকে ক্যাবিনেট অনুমোদন পর্যন্ত সময় লেগেছিল ১০-১২ দিন।
“বুঝে নিন,” বললেন মুস্তফা আল মাহমুদ, “কোনটিতে দেশের আগ্রহ, কোনটিতে নেই।”
এই আগ্রহের প্রমাণ মেলে পেট্রোবাংলার নিজের আমদানি-পরিসংখ্যানে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৯৪টি এলএনজি কার্গো আমদানির মধ্যে স্পট মার্কেট থেকেই কেনা হয়েছে ৪০টি কার্গো (২.৪৯ মিলিয়ন টন)- পেট্রোবাংলার ইতিহাসে স্পট মার্কেট থেকে সর্বোচ্চ এলএনজি কেনার রেকর্ড। স্পট মার্কেটের দাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চেয়ে প্রায়ই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ গেলে ক্যাপাসিটি চার্জ থাকে না; স্পট মার্কেটের দামি এলএনজিতে সেই অর্থ ঢাললে থাকে। এই পার্থক্যটুকুই বারো দিন আর এগারো বছরের ব্যবধান ব্যাখ্যা করে।
এই বারো দিন এবং এগারো বছরের ব্যবধানটিই বাংলাদেশের জ্বালানি-প্রশাসনের কাঠামোগত বাস্তবতা।
এই ‘আগ্রহ-অনাগ্রহের’ পেছনে কেবল ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয়, পদ্ধতিগত কাঠামো। ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি’ পনেরো বছরেও কাগজ পেরোয়নি। স্রেডা জনবল ও বাজেট সংকটে কার্যত নিষ্ক্রিয়; গ্রিন ফাইন্যান্স ফান্ড নেই; ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদী সৌর ঋণে আগ্রহী নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পিপিএর কাঠামো নবায়নযোগ্য খাতে নেই। এলএনজি বা ফসিল-বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যে ‘টেক-অর-পে’ সিকিউরিটি দিয়ে বিনিয়োগকারী আশ্বস্ত হয়, নবায়নযোগ্য খাতে তা প্রায় অজ্ঞাত। যে বিনিয়োগকারী জানে সামিট দীর্ঘমেয়াদী ক্যাপাসিটি চার্জের সিকিউরিটি পাবে, সে নিজেও সৌরে ৭ বছরের সাধারণ অনিশ্চিত মার্জিনের জন্য পুঁজি ঢালতে যায় না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ২০২২ সালের বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট চরমে ওঠার পর ৩,৪০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই অনুসন্ধানের সময় বাংলাদেশ রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মুস্তফা আল মাহমুদ জানান, প্রতিশ্রুত প্রকল্পের মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে চালু হয়েছে মাত্র ৫২০ মেগাওয়াট। বাকি ২,৮৮০ মেগাওয়াটের অধিকাংশই ‘এমওইউ’ পর্যায়ে আটকে।
একটি প্রায়-চাপা পড়া অধ্যায়
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে কারিগরি দিকটি লুকিয়ে আছে নবায়নযোগ্য আর এলএনজি অনুমোদনের যৌথ ইতিহাসে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে- যখন বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ব্যয়বহুল ফসিল-নির্ভর বিদ্যুৎ-সংকট নিয়ে চাপে- সরকার ৩১টি ‘আনসলিসিটেড’ (দরপত্রবিহীন) নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘Letter of Intent’ (এলওআই) দিয়েছিল। মোট সক্ষমতা ৩,২৮৭ মেগাওয়াট; বিদেশি বিনিয়োগ আনুমানিক ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। অধিকাংশই সৌর; এর সঙ্গে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বায়ু এবং একটি ছোট ২৫ মেগাওয়াট ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ প্রকল্প। এই ৩১টি এলওআই দেওয়া হয়েছিল একই ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায়- যে আইনের আশ্রয়ে সামিটের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিও স্বাক্ষরিত। আইন একই, প্রক্রিয়া একই; ফলাফল ভিন্ন।
এই এলওআইগুলোর প্রস্তাবিত ট্যারিফ ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯.৭ থেকে ১০.৬ সেন্ট। সমকালীন এলএনজি-বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম। চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য খাতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের বেশি ধরে আছেন; পাবলিক রিভিউ ফোরামে সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ এই ৩১টি প্রকল্প সফল হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য খাতে অর্ধেকেরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ চীনা উৎস থেকে আসত।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, পট-পরিবর্তনের ঠিক এক মাস পর অন্তর্বর্তী সরকার পুরো ৩১টি এলওআই বাতিল ঘোষণা করল। যুক্তি: দরপত্র ছাড়া দেওয়া; ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আশ্রয়ে দুর্নীতিজনিত। তখনকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন। সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত- যদি একই ‘বিশেষ আইনের’ আশ্রয়ে স্বাক্ষরিত সামিটের চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও একই আচরণ হতো।
হয়নি। সামিটের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-সংক্রান্ত চুক্তিটিও ৭ অক্টোবর ২০২৪-এ পেট্রোবাংলা বাতিল ঘোষণা করেছিল। সামিট তাৎক্ষণিকভাবে আদালতে যায়নি; বরং প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়, এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইন পরামর্শদাতাদের কাছ থেকে মতামত নেয়। কয়েক মাস কূটনৈতিক চাপ ব্যর্থ হওয়ার পর সামিট আদালতে যায়। ২০২৫ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ দেয়। বর্তমান অবস্থা: চুক্তি ‘আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল’, কিন্তু সামিটের মামলা বিচারাধীন; পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়া আটকা।
নবায়নযোগ্য বিনিয়োগকারীরাও আদালতে গিয়েছিলেন। হাইকোর্ট ২০১০ সালের ‘বিশেষ আইন’-এর দু’টি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই রায় উপেক্ষা করেই বিপিডিবি পুনঃদরপত্র আহ্বান করে; ১৫টি ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানি ১১টি রিট করে। জুলাই ২০২৫-এ হাইকোর্ট ১০টি প্রকল্পের পক্ষে রুল জারি করেন।
সামিটের আদালত-পথ কাজ করেছে: স্থগিতাদেশ পেয়েছে, পুনঃদরপত্র আটকেছে। নবায়নযোগ্য বিনিয়োগকারীদের আদালত-পথে সফলতা সীমিত- হাইকোর্ট তাঁদের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেই রায় উপেক্ষা করেই পুনঃদরপত্র এগিয়ে নিয়েছে; ১৫টি কোম্পানির কেনা জমি, প্রদত্ত কর, প্রস্তুতিমূলক বিনিয়োগ সব সংকটে। একই বিচারব্যবস্থা, একই অন্তর্বর্তী সরকার, একই ‘বিশেষ আইন’-এর ছায়া; কিন্তু পরিণতি দু’রকম- কর্পোরেট আইনজীবীর শক্তি ও সম্পদের গভীরতা থাকলে আদালতে রক্ষাকবচ মেলে, না থাকলে মেলে না।
পরিণতি কী দাঁড়াল? সরকার পরে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য ৫৫টি নতুন দরপত্র আহ্বান করে। সাড়া মিলল একেবারেই কম। মোট ৫৫টি প্যাকেজের মধ্যে ২২টি পেল একটিমাত্র দরদাতা; ১৩টি প্যাকেজে কেউই দরপত্র জমা দেয়নি। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের দরপত্র জমা পড়েছে এবং মূল্যায়ন চলছে- ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৭ শতাংশ। বিনিয়োগকারীরা সারা বিশ্বে শিখলেন: বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য চুক্তি ‘সদিচ্ছায়’ স্বাক্ষরিত হলেও পরবর্তী সরকার এক ধাক্কায় বাতিল করতে পারে; কিন্তু এলএনজি চুক্তি একইভাবে স্বাক্ষরিত হলেও আদালতে স্থগিতাদেশ মেলে। মেসেজটি বিদেশি বিনিয়োগ-সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শাসন-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন (২৪ ডিসেম্বর ২০২৫) এই অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করেছে। টিআইবি গবেষণায় উঠে এসেছে, নবায়নযোগ্য খাতে ১৪টি প্রকল্পে ২,৯২৬.৮৮ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। প্রতি মেগাওয়াট সৌরকেন্দ্র গড়তে বিপিডিবির অনুমান ৮ কোটি টাকা; অথচ বিশ্লেষণ করা প্রকল্পগুলোতে গড় খরচ দেখানো হয়েছে ১৩.৮০ কোটি। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যেই অনিয়মের ছাঁচ ফসিল-জ্বালানি খাতে দেখা গেছে, ক্যাপাসিটি চার্জের অপব্যবহারসহ সেই একই ছাঁচ এখন নবায়নযোগ্য খাতেও দৃশ্যমান”।
তুলনামূলক চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় একটি সংখ্যায়। ২০২৫ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশে ব্যাটারি স্টোরেজ-সহ সোলার আইপিপির রেকর্ড-সর্বনিম্ন দর উঠেছে মাত্র ২ রুপি ৭০ পয়সা প্রতি ইউনিট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার টাকার সমতুল্য। অথচ বিগত সরকার বাংলাদেশে ব্যাটারি স্টোরেজ ছাড়াই সোলার আইপিপি চুক্তি করেছিল ১৫ থেকে ২১ টাকায়- ভারতে স্টোরেজ-সহ দামের চার থেকে ছয় গুণ। এই একটি সংখ্যাই বলে দেয়, নবায়নযোগ্য খাতে যে দুর্নীতির ছাঁচ, তা ফসিল-জ্বালানি খাত থেকে আলাদা নয়।
৩১টি বাতিল হওয়া প্রকল্পের মোট সক্ষমতা ছিল ৩,২৮৭ মেগাওয়াট- দেশের বর্তমান মোট গ্রিড সক্ষমতার প্রায় ১২ শতাংশ। এগুলো চালু থাকলে এলএনজি আমদানির উপর নির্ভরতা কতটা কমত, তা যাচাইযোগ্য গবেষণার অপেক্ষা রাখে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত: প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকায় হয়, আর প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ ৫ থেকে ৬ টাকা- যেখানে এলএনজি-বিদ্যুতের খরচ ১১ টাকারও বেশি।
বিষয়টিকে কেবল কোনো একটি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি দেশের জ্বালানি-প্রশাসনে এক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ- যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাবের তুলনামূলক মূল্যায়নের কোনো স্বাধীন কাঠামো নেই; যেখানে নীতি-নির্ধারণ ও বাণিজ্যিক স্বার্থ একই হাতে; এবং যেখানে আদালতে সুরক্ষা পাওয়ার সম্পদ যাঁদের আছে, কেবল তাঁদের চুক্তিই বেঁচে যায়।
কাদের বিদ্যুৎ, কাদের গ্যাস- একটি অপ্রকাশিত হিসাব
এই অনুসন্ধানের আরেকটি কম-আলোচিত উন্মোচন: পেট্রোবাংলার আমদানিকৃত এই দামি এলএনজি শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে?
পেট্রোবাংলার ২০২২-২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৪২ শতাংশ যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে, ১৯ শতাংশ শিল্পে, ১৮ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে, ৫ শতাংশ সার-কারখানায়। সাধারণ গৃহস্থ পাচ্ছেন মাত্র ১০.৮৬ শতাংশ (৯৭.৮ বিসিএফ); বাকি অংশ বাণিজ্যিক ও অন্যান্য খাতে। অর্থাৎ ভাসমান টার্মিনাল থেকে যে আমদানিকৃত গ্যাস আসছে, তার সিংহভাগ যাচ্ছে অনিবার্যভাবেই বড় বড় কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পের ক্যাপটিভ পাওয়ারে। আইইইএফএ-র বিশ্লেষণ বলছে, অনির্ভরযোগ্য গ্রিড-বিদ্যুতের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ক্যাপটিভ জেনারেশনে ঝুঁকছে- কারণ এতে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫৩ পয়সা পর্যন্ত সাশ্রয় হয়। ফলে দামি আমদানিকৃত এলএনজির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে বড় শিল্পগুলোর এই ক্যাপটিভ খাতে।
এই বড় শিল্পগুলো কারা- সেই তালিকা পেট্রোবাংলা প্রকাশ্যে দেয় না। তবে বিইআরসি’র ২০২৪ সালের ট্যারিফ-অর্ডার অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের জন্য দেয় মাত্র ১৪.৭৫ টাকা, যেখানে সাধারণ আবাসিক (মিটারড) গ্রাহককে দিতে হয় ১৮.০০ টাকা। ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই বৈষম্য ছিল আরও ভয়াবহ; আবাসিক গ্রাহককে দিতে হতো ১৮ টাকা, আর হাজার কোটি টাকা মুনাফা করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিত মাত্র ৫.০২ টাকা।
সংক্ষেপে, শাহনাজ বেগমের মতো চট্টগ্রামের গৃহস্থ যখন প্রতি মাসে ১,৭০০ টাকার সিলিন্ডার কিনে রান্না চালান- অথচ তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র ১২০ কিলোমিটার দূরের মহেশখালী টার্মিনালে দিনে ১,১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট এলএনজি প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে- ঠিক সেই গ্যাস ভাসমান টার্মিনাল হয়ে ভর্তুকি মূল্যে যায় বড় কোম্পানির শিল্প ও বিদ্যুৎ-চাহিদা মেটাতে। ভর্তুকির সরাসরি গন্তব্য, কর্পোরেট। ভর্তুকির উৎস, করদাতা।
বিশেষজ্ঞদের সাবধানবাণী
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই কাঠামোকে চিহ্নিত করেছেন ‘পরিকল্পিত আত্মঘাত’ হিসেবে। সৌর-বিদ্যুৎ যেখানে ৫-৬ টাকায় সম্ভব, সেখানে ১১ টাকার বিদ্যুতে ভর্তুকি দিচ্ছেন গৃহস্থ গ্রাহক; পরে আবার সেই গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। ‘এই বৃত্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা,’ বলেন তিনি।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেছেন: “বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম প্রতিযোগীদের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। এর প্রধান কারণ দুর্নীতি। ভর্তুকি সরিয়ে দিলে এটা হয়তো ৪০ শতাংশ হয়ে যাবে।” তাঁর সতর্কীকরণ: “এ-রকম চলতে থাকলে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকতে পারবে না এই বিদ্যুতের দামে।”
অধ্যাপক ড. ম. তামিম প্রকৌশল-পরিকল্পনার দিক থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন। “একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মাসিক ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ লাখ ডলার। যদি আমরা সারা বছর ৭০ শতাংশের কম ব্যবহার করি, তবে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম পড়ে যায় বিশ্ব-বাজারের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা এখন এমন পর্যায়ে যে দু’টি টার্মিনালই অর্ধেকের কম ব্যবহৃত। তৃতীয়টির কোনো প্রকৌশলগত ভিত্তি নেই। চতুর্থটির আলোচনা পুরোপুরি বাণিজ্যিক, প্রকৌশলগত নয়।”
অর্থনীতিবিদ মল্লিকা রায় বলেছেন, “ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা শেষ পর্যন্ত শোধ করেন গৃহিণী- ছেলেমেয়ের বেতন, ওষুধ, পুষ্টি থেকে কাটছাঁট হয়।”
বিইআরসি-র একজন নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যোগ করেন, ‘বাংলাদেশের আইপিপি-কাঠামো মূলত নব্বইয়ের দশকের; ভারত-ভিয়েতনাম-ইন্দোনেশিয়া অনেক আগে অ্যাভেইলেবিলিটি-বেসড ট্যারিফে চলে গেছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে এই ত্রুটিযুক্ত মডেলটি অপরিবর্তিত, এফএসআরইউ-গ্যাসেও প্রসারিত।’ (সংস্কার-প্রস্তাবের পূর্ণ ব্যাখ্যা তৃতীয় পর্বে।)
অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, “২০১৪ সাল থেকে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ কমেছে ৭৫ শতাংশ। বাপেক্স গত দশকে পেয়েছে বাজেটের মাত্র ১৭ শতাংশ। অথচ ভাসমান টার্মিনাল চুক্তির অনুমোদনে ক্যাবিনেট বসে খুব দ্রুত।”
দু’টি পথের পার্থক্য, দু’টি অর্থনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য।
জবাবদিহিতার চেষ্টা, পেট্রোবাংলার নীরবতা
দেশের জ্বালানি-নীতির এই কাঠামোগত প্রশ্নগুলোয় সরকার, প্রস্তাবিত পাঁচটি দপ্তর, এবং সংশ্লিষ্ট দুই বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (সামিট গ্রুপ, এবং তাদের জাপানি অংশীদার জেরা ও মিতসুবিশি)- সবার আনুষ্ঠানিক অবস্থান যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন এই প্রতিবেদক।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান গত এক বছরে একাধিক ঘোষণা দিয়েছেন- ভবিষ্যতে ক্যাপাসিটি-চার্জ-নির্ভর আইপিপি নয়, চলমান পিপিএ ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে পুনঃআলোচনা এবং ৯১৮ মেগাওয়াট সৌর-প্রকল্পের অনুমোদন।
কিন্তু এই অনুসন্ধানে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোতে জ্বালানি উপদেষ্টার সাড়া পাওয়া যায়নি। ১৫ ডিসেম্বর উপদেষ্টার কার্যালয়ে তিনটি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়: এক, ৩১টি নবায়নযোগ্য এলওআই যে ‘বিশেষ আইন’-এর আওতায় বাতিল হয়েছে, সেই একই আইনে সামিটের চুক্তি কেন আদালতে সুরক্ষিত? দুই, ক্যাপাসিটি চার্জ-নির্ভর পিপিএ থেকে ‘অ্যাভেইলেবিলিটি-বেসড ট্যারিফ’-এ রূপান্তরের রোডম্যাপ কী? তিন, নবায়নযোগ্য খাতে প্রতিশ্রুত ৩,৪০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৫২০ মেগাওয়াট চালু হওয়ার দায় কার? একাধিক ফলো-আপের পরও ১৩ দিন পরে ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা হয়। উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমি ইন্টারভিউ দেব না।’ লিখিত প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত আসেনি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, “তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য আমরা একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ পেয়েছি। চুক্তি হতে পারে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে, অথবা সরকার-থেকে-সরকার সমঝোতার ভিত্তিতে। আগের চুক্তিগুলোর চেয়ে কম খরচে চুক্তি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে”। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত গ্যাসকূপ-প্রকল্পগুলো লক্ষ্যপূরণ করলে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি অনেক কমাতে পারবে; কারণ “এলএনজি প্রতি ইউনিট ৭০ থেকে ৭১ টাকা, দেশীয় গ্যাস প্রতি ইউনিট মাত্র ৪ টাকা”।
আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলামকে দুটি প্রশ্ন করা হয়: এক, দুটি টার্মিনাল ৭০ শতাংশের কম সক্ষমতায় চললে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি পড়ে- এটা কি সরকার জানে? দুই, টার্মিনালের অচলাবস্থার জন্য সামিট পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ২৬৮ কোটি টাকা চেয়েছে, কিন্তু পেট্রোবাংলা সামিটের কাছ থেকে কোনো পেনাল্টি আদায় করেনি- কেন? ১৪ ডিসেম্বর লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পর দু’দফা ফলো-আপে তিনি ফোনে সংক্ষিপ্তভাবে জানান, নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার নির্ধারিত। প্রশ্ন দুটির সরাসরি জবাব আসেনি। প্রসঙ্গত, এই অনুসন্ধানে সরকারি প্রতিটি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের তারিখ, মাধ্যম ও ফলোআপের বিস্তারিত রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে; কোন প্রশ্ন কবে, কোন মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে এবং কতবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে- তার দালিলিক প্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
এই নীরবতার পেছনে কেবল প্রভাবশালী কোম্পানির ভয় নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক স্বার্থও আছে। পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি আরপিজিসিএলের নিজস্ব প্রতিবেদন বলছে, সামিটের টার্মিনাল চার মাস অচল থাকার সেই বছরেও (২০২৪-২৫) এলএনজি অপারেশনাল চার্জ তদারকি বাবদ আরপিজিসিএলের আয় ছিল ৮২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা- আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১০ কোটি বেশি। টার্মিনাল বসে থাকলেও তদারকি সংস্থার কমিশন কমেনি। এই কাঠামোয় পেনাল্টি চাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক উৎসাহ থাকার কথা নয়।
স্রেডার চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ স্বীকার করেন, “নবায়নযোগ্য খাতে অগ্রগতি কম। আমাদের জনবল মাত্র ৫২ জন; বাজেটও কম। সক্ষমতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠে ভালো কাজ করার চেষ্টা করছি আমরা।”
সামিট গ্রুপ গত এক বছরে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা একাধিক অভিযোগের জবাবে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছে- শ্বেতপত্র-কমিটি, এনবিআর কর-ফাঁকির অভিযোগ, এবং প্রধান উপদেষ্টা বরাবর লেখা চিঠিতে। এসব বিবৃতির বিস্তারিত পাঠ ও কাঠামোগত প্রশ্নের সঙ্গে তুলনা আসছে তৃতীয় পর্বে।
একটি জ্বালানি-নীতির প্রকৃত শোধকর্তা
চট্টগ্রামের পাথরঘাটার শাহনাজ বেগমের রান্নাঘরে ফিরে যাই। ২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়, দ্বিতীয় দফায় সরেজমিন সফরে, এই প্রতিবেদক তাঁকে কয়েকটি সংখ্যা ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকে দক্ষিণে ১২০ কিলোমিটার দূরে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এদের ভাড়া বাবদ পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদনে ১,৮২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা কাগজে ‘সেবার জন্য ক্ষতিপূরণ’ নামে লুকানো। সেই টার্মিনালে আসা গ্যাসের সিংহভাগ যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও বড় শিল্পের ক্যাপটিভ পাওয়ারে। সাধারণ গৃহস্থ পান মোট গ্যাসের মাত্র ১০.৮৬ শতাংশ।
সংখ্যাগুলো বলার পর শাহনাজ বেগম মোমবাতিটা রান্নাঘরের তাকে রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, ‘মানে এই হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস আমার চুলায় আসে না? আমার বাড়ির পাশ দিয়েই পাইপ গেছে।’ তিনি আর কিছু বললেন না। বাচ্চার কান্নার শব্দে উঠে গেলেন পাশের ঘরে। ওই নীরবতাই দেড় দশকের জ্বালানি-নীতির সবচেয়ে সৎ মূল্যায়ন।
আজ ২৯ ডিসেম্বর। শাহনাজ বেগমের সংসারের মাসিক গ্যাস-খরচ হিসাবে দাঁড়াচ্ছে সরকারি ডাবল-বার্নারের বিল ১,০৮০ টাকা, সঙ্গে একটি সিলিন্ডারে আরও ১,৭০০ টাকা। স্বামীর স্কুল-শিক্ষকের বেতন থেকে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহনের জায়গা নেই। বাচ্চাদের প্রাইভেট-টিউশন কমানো হয়েছে, দু’বেলা মাছের জায়গায় এক বেলা ডাল।
দেশের পনেরো বছরের জ্বালানি-নীতি এই সংখ্যার ব্যাকরণে গড়া। আজ যখন সরকারের কোষাগারে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ-দেনা; ২৩,৬৪২ কোটি টাকার পাঁচ-বছরের ক্যুমুলেটিভ লোকসান; প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ মাত্র তিন বছরে প্রায় ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি- তখন বিপিডিবি ও পেট্রোবাংলার কাগজের হিসাবের প্রকৃত শোধকর্তা শাহনাজ বেগম। তাঁর রান্নাঘরের মোমবাতি। বাচ্চাদের প্রাইভেট-টিউশন। মাসের শেষ এক বেলার ডাল।
কেন ব্যয়বহুল এলএনজি, কেন নয় সৌর? কারণ নবায়নযোগ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ নেই। যাঁরা নীতি ঠিক করেন, তাঁদের স্বার্থ-চক্রে এলএনজি লাভজনক, সৌর নয়।
শাহনাজ বেগমের রান্নাঘরে মোমবাতি জ্বলছে। মহেশখালীতে ১,১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। দূরত্ব মাত্র ১২০ কিলোমিটার। কিন্তু দূরত্ব আসলে পনেরো বছর- পনেরো বছরের ‘বিশেষ আইন’, পনেরো বছরের দরপত্রহীন চুক্তি, পনেরো বছরের ক্যাপাসিটি চার্জ। এই তিনটি দেওয়াল শাহনাজ বেগমের চুলা আর মহেশখালীর টার্মিনালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
এই দেওয়াল কে তুলেছে, কার লাভে- তা আসছে পরের পর্বে।
তৃতীয় পর্ব: জ্বালানি অলিগার্কদের ‘১০ দিনের ভেলকি’, সমাধান কোন পথে?