
চট্টগ্রাম ইপিজেডের থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড ঘিরে দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও জালিয়াতির ঘটনায় একুশে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি (বেপজা) নিজস্ব তহবিল থেকে শ্রমিকদের এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছে এবং কারখানাটি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় শ্রমিকদের পুরো বকেয়া পাওয়া এবং রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ পাওনা আদায় এখনো অনিশ্চয়তার মুখে।
গেল বছরের ৭ জুলাই বকেয়া বেতনের দাবিতে ইপিজেড সড়ক অবরোধ করেছিলেন কারখানাটির কয়েকশ শ্রমিক। অভিযোগ ছিল, মালিক আনিসুর রহমান খান দিনের পর দিন প্রতিশ্রুতি দিয়েও বেতন পরিশোধ করছিলেন না। এ নিয়ে গত ১৫ জুলাই একুশে পত্রিকায় ‘থিয়ানিস অ্যাপারেলস: এক আনিসের চালে হেরে গেল রাষ্ট্র ও শ্রমিক!’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপরই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে শুরু করে বেপজা।
সংবাদের পর বেপজার অ্যাকশন
একুশে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেপজা কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। বেপজা সূত্র জানায়, গত ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর কারখানটিতে প্রাক-নিলাম পরিদর্শন চালানো হয় এবং ১৯ সেপ্টেম্বর নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মসিউদ্দিন বিন মেজবাহ জানান, শ্রমিকদের চরম সংকট বিবেচনায় নিয়ে বেপজা নিজস্ব ফান্ড থেকে এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছে। তিনি বলেন, “আমরা শ্রমিকদের কমিটমেন্ট দিয়েছি যে, এই ফ্যাক্টরিটা নিলামে বিক্রি করে তাদের সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করা হবে। সরকারি পাওনা যতটুকু পারি, সেটাও ওই প্রক্রিয়া থেকেই পরিশোধ করব।”
ফাইল আটকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে
বেপজা চট্টগ্রাম জোন নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ফাইল সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে। বর্তমানে ফাইলটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাহী পরিচালক মসিউদ্দিন বিন মেজবাহ বলেন, “আমাদের জোন থেকে নিলাম প্রক্রিয়া শেষ করে হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ফাইলটি এখন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ ধাপেই আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।”
আদালতের রায় ও আইনি জটিলতা
প্রশাসনিক অনুমোদনের পাশাপাশি আইনি জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানাটি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলমান। ডিসেম্বর মাসে আদালতের অবকাশকালীন ছুটির কারণে রায় পাওয়া যায়নি।
বেপজা কর্মকর্তাদের আশা, চলতি জানুয়ারি মাসে রায় পাওয়া যাবে। মসিউদ্দিন বিন মেজবাহ বলেন, “রায়টা আমরা জানুয়ারিতে পেলে এবং ফাইলটা সাইন হয়ে গেলে নতুন করে যিনি ডিড করেছেন তাকে ফ্যাক্টরি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তখন টেন্ডার থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শ্রমিকদের বকেয়া এবং সরকারি পাওনা পরিশোধ করা হবে।”
কী বিক্রি হচ্ছে নিলামে
নিলামের প্রথম ধাপে শুধুমাত্র কারখানার স্থাপনা, মেশিনারিজ ও কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা গাড়ি বা যানবাহন এই ধাপে রাখা হয়নি। নির্বাহী পরিচালক জানান, গাড়ির টেন্ডার কাস্টমসের সঙ্গে বসে পরবর্তী ধাপে আলাদাভাবে করা হবে। বর্তমানে গাড়িটি মালিকের কাছেই রয়েছে।
নেপথ্যে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস
অনুসন্ধানে জানা গেছে, থিয়ানিস অ্যাপারেলসের মালিক আনিসুর রহমান খানের কাছে রাষ্ট্রের পাওনা প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেপজার পাওনা প্রায় ৩১ কোটি টাকা এবং কাস্টমসের পাওনা ৫৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২০০৮ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো ভাড়া ও পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছিল। ২০১০, ২০১২ এবং ২০১৭ সালে বেপজা ইজারা বাতিলের উদ্যোগ নিলেও আইনি মারপ্যাঁচে তা আটকে দেন মালিক।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একুশে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বেপজার বর্তমান পদক্ষেপ প্রশাসনিক সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিলেও, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়মের দায় কার, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আপাতত শ্রমিকরা তাকিয়ে আছেন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের অনুমোদন এবং আদালতের রায়ের দিকে।