শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২

এস আলমের লুটপাটের দায় চাপল সাধারণ আমানতকারীর কাঁধে

৫ ব্যাংকের আমানতে ‘হেয়ারকাট’, দুই বছর মুনাফা পাবেন না গ্রাহক
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ | ২:৫০ অপরাহ্ন


এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় দুঃসংবাদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা পাবেন না। শুধু তাই নয়, আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হবে।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ‘রেজোলিউশন স্কিম’ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারল্য সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। এই সময়ে আমানত হিসাব পুনর্গণনা করা হবে এবং হেয়ারকাট পদ্ধতির মাধ্যমে আমানতকারীদের চূড়ান্ত স্থিতি কমিয়ে আনা হতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ের মূল নীতি হলো—ব্যাংক লাভ করলে আমানতকারীরা মুনাফা পাবেন, আর লোকসান হলে পাবেন না। অডিটে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাপক লোকসানে পড়েছে। তাই শরিয়াহ উইংয়ের গাইডলাইন অনুযায়ী এই দুই বছর আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়ার সুযোগ নেই।”

তিনি আরও জানান, নতুন ও পুরনো সব আমানতকারী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আবার মুনাফা পেতে শুরু করবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীরা এই ব্যাংকগুলো থেকে বেনামি ঋণের মাধ্যমে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যখন চোখের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীরব ভূমিকা পালন করেছে। আর এখন সেই ব্যর্থতা ও চুরির দায় ‘হেয়ারকাট’-এর নামে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো হচ্ছে।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের টাকা রাখতে উৎসাহিত করেছিলাম। এখন তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেকেই পেনশনের টাকা রেখেছিলেন সংসার চালানোর জন্য। হঠাৎ দুই বছরের মুনাফা বন্ধের সিদ্ধান্তে তারা বিপাকে পড়েছেন।”

এদিকে বৃহস্পতিবার ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের ভিড় ও অস্থিরতা দেখা গেছে। ইউনিয়ন ব্যাংকের এক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নাকের ডগাতেই ৯৮ শতাংশ টাকা লুট হয়েছে। তখন তারা ব্যবস্থা নেয়নি। এখন আমাদের আমানত থেকে কেন টাকা কাটা হবে? চোরের বিচার না করে ভুক্তভোগীর ওপর খড়গ নামানো হচ্ছে।”

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আমানতের ওপর এমন সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে, লুটেরাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সেই অর্থ দিয়ে ব্যাংকের দায় মেটানো উচিত ছিল, সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মি করে নয়।

গভর্নর অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, “ব্যাংক সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”