
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ খিরাম। পাহাড়ি টিলা আর চা-বাগানের সবুজে ঘেরা এই জনপদের বড়ইতলি গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। এই পথ ধরেই শৈশবে দুরন্তপনায় মেতে থাকতেন শুভ প্রিয় চাকমা। সেই ধুলোমাখা পথের মায়া কাটিয়ে শুভ এখন হাঁটছেন এক মহৎ স্বপ্ন পূরণের পথে। অজপাড়াগাঁয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে। ২৫-২৬ সেশনের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় তার এই ঈর্ষণীয় সাফল্যে এখন আনন্দের বন্যা বইছে পাহাড়ের পাদদেশে।
জহিন চাকমা ও সুমিতা চাকমার একমাত্র সন্তান শুভ প্রিয় চাকমা। মেধা আর কঠোর পরিশ্রম যে সাফল্যের চাবিকাঠি, তা আবারও প্রমাণ করলেন তিনি। ভর্তি পরীক্ষায় শুভ ৩১৭৮ মেরিট পজিশনে থেকে ১৭৭ স্কোর অর্জন করেছেন। তবে তার এই যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না, ছিল অধ্যাবসায়ের এক দীর্ঘ গল্প। ফটিকছড়ি গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে প্রাথমিক সমাপনীতে সাধারণ বৃত্তি, এরপর ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন—এভাবেই ধাপে ধাপে নিজেকে তৈরি করেছেন শুভ।
শৈশব থেকেই পড়াশোনায় দারুণ মনোযোগী শুভ। দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা পড়ার টেবিলে কাটানো এই তরুণের অবসর কাটে গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে। সুযোগ পেলেই ছুটে যান সেই পুরনো মেঠোপথে, মিশে যান শৈশবের বন্ধুদের ভিড়ে। মা সুমিতা চাকমা একজন সুগৃহিণী, যার নিবিড় যত্নে বেড়ে উঠেছেন শুভ। অন্যদিকে বাবা জহিন চাকমা পেশায় একজন কমিউনিটি প্যারামেডিক, কর্মরত আছেন ফটিকছড়ির বৃহত্তম কর্ণফুলী চা-বাগান স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। বাবার চিকিৎসার সরঞ্জাম আর রোগীর সেবা করা দেখেই হয়তো অবচেতন মনে ডাক্তারি পড়ার বীজ রোপিত হয়েছিল শুভর মনে।
ছেলের সাফল্যে বাবা জহিন চাকমার চোখ এখন গর্বে চিকচিক করছে। তিনি বলেন, “আমি আমার একমাত্র সন্তান শুভকে কেবল একজন ডাক্তার হিসেবে নয়, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। তার মধ্যে যেন অন্যের প্রতি সহানুভূতি, সহমর্মিতা আর উদারতার মতো মহান গুণাবলি থাকে।”
বাবার সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটতে চান শুভ। গৎবাঁধা চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা নেই তার। তিনি হতে চান এমন একজন চিকিৎসক, যার কাছে রোগী কেবল ‘কেস’ নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে সেবা পাবে। শুভ প্রিয় চাকমা তার স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “মানবিকতা দিয়ে আমি সমাজের বিভিন্ন স্তরে শান্তি, সমতা ও সৌহার্দ্য বয়ে আনার চেষ্টা করব। এলাকার দুস্থ ও গরিব মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। দিন শেষে বড় ডাক্তার হওয়ার চেয়ে একজন মানবিক চিকিৎসক হওয়াটাই আমার কাছে মুখ্য। আমি সবার আশীর্বাদ নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।”
শুভর এই জয়ে উচ্ছ্বসিত তার পরিবার, শিক্ষক এবং বড়ইতলি গ্রামের বাসিন্দারা। এলাকাবাসী স্বপ্ন দেখছেন, তাদের গ্রামের ছেলে একদিন বড় ডাক্তার হয়ে ফিরবে, আলোকিত করবে অবহেলিত এই জনপদ। দেশের চিকিৎসাসেবার মানচিত্রে মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবেন শুভ প্রিয় চাকমা—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।