সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বাতরোগে এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক, বাড়ছে অক্ষমতা ও চিকিৎসার আর্থিক চাপ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬:৫৪ অপরাহ্ন


দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো ধরনের বাতরোগে আক্রান্ত। শুধু ব্যথা বা শারীরিক অস্বস্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এসব রোগ। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন, হারাচ্ছেন কাজের সক্ষমতা। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পরিবারগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবেও।

২০১৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বাতরোগে আক্রান্ত। তাঁদের ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। আর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

অর্থাৎ, বাতরোগকে শুধু বয়স্ক মানুষের সাধারণ ব্যথা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের ক্ষেত্রেও এ রোগ দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা ও আয়হানির কারণ হয়ে উঠছে।

শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’-এ বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস।

ব্যথা থেকে কর্মক্ষমতা হারানো

বাতরোগের প্রভাব শুধু রোগীর ব্যক্তিগত শারীরিক কষ্টে সীমাবদ্ধ নয়। রোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে সমস্যা তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়।

ডা. নীরা ফেরদৌস বলেন, ‘বাতরোগের কারণে শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপেও পড়তে হচ্ছে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে বছরে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।’

তিনি জানান, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।

এই ব্যয়ের সঙ্গে যদি রোগীর কাজের সক্ষমতা কমে যায়, তাহলে পরিবারকে একদিকে চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়, অন্যদিকে কমে যায় আয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাতরোগ অনেক পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকিও তৈরি করে।

গবেষণায় উচ্চমাত্রার আক্রান্তের চিত্র

দেশে বাতরোগের বিস্তৃতি নিয়ে আগের গবেষণাতেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক কোপকর্ড জরিপে দেশের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের হাড় ও পেশির ব্যথায় ভোগার তথ্য উঠে এসেছিল।

জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের বাতরোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য এ সমস্যার ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট করে। তবে বাতরোগের ধরন, বয়স, পেশা, অঞ্চল ও আর্থসামাজিক অবস্থাভেদে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রা এবং অক্ষমতার প্রভাব কতটা ভিন্ন—তা বোঝার জন্য আরও হালনাগাদ ও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।

জাতীয় নীতিতে গুরুত্ব কতটা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য উদ্ধৃত করে সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব বা অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে এমন বাতরোগ অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাতরোগে মৃত্যু সরাসরি বেশি না হলেও এর কারণে দীর্ঘদিন কর্মক্ষমতা হারানো, চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনায় শুধু মৃত্যুহার নয়, রোগের কারণে অক্ষমতা ও কর্মঘণ্টা হারানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞের সংকট

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত বলে সম্মেলনে জানানো হয়। ফলে অনেক রোগী সময়মতো রোগ নির্ণয় ও বিশেষায়িত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অনেক বাতের রোগী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এতে কর্মক্ষম মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো বাতরোগও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সমন্বিত উদ্যোগ

বিশেষজ্ঞরা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, যথাসময়ে টিকা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের ওপর গুরুত্ব দেন।

বাতরোগীদের চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা, অক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় কমানো সম্ভব।

দিনব্যাপী রোগী শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাউন্সিলর ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হোসেন প্রমুখ।