
সরকারি আদেশ, মিস মামলার রায় কিংবা স্বয়ং জেলা প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা—চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিসে এসবের যেন কোনোই মূল্য নেই। সেখানে সরকারি সিলমোহর বা আইনি নথির চেয়েও বেশি শক্তিশালী এক অদ্ভুত ‘পেন্সিল জাদু’। খোদ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, নথির ওপর পেন্সিলে লেখা একটি ভুয়া অভিযোগের খোঁড়া অজুহাতে দিনের পর দিন হয়রানি করা হচ্ছে সেনোয়ারা বেগম নামের এক অসহায় সেবাপ্রার্থীকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পুরো জালিয়াতি চক্রের নেপথ্যে রয়েছেন ওই অফিসেরই একজন ক্যাজুয়াল বা অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর বিকর্ণ দাশ। অভিযোগ উঠেছে, তার খুঁটির জোরে উপজেলা ভূমি প্রশাসন এখন সাধারণ নাগরিকদের কাছে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। সেনোয়ারা বেগমের এই ঘটনা নিয়ে একুশে পত্রিকা গত ৬ মে ‘আনোয়ারা ভূমি অফিসের পেন্সিল-কারসাজি: কে লিখল, কার স্বার্থে?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পেন্সিলের ভুয়া অভিযোগ ও পেছনের কারসাজি
ভুক্তভোগী সেনোয়ারা বেগমের মিস মামলার রায় ও আদেশ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তার খতিয়ানের সহিমহুরি (নকল) পাওয়ার কথা। কিন্তু তার নথির ওপর পেন্সিল দিয়ে একটি ভুয়া অভিযোগ লিখে ফাইলটি আটকে দেওয়া হয়। সেখানে অভিযোগকারী হিসেবে স্থানীয় ডালিম কুমার দাশের নাম ও মুঠোফোন নম্বর জুড়ে দেওয়া হয়।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। ডালিম কুমার দাশ নিজেই এক ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি বা তার ছেলে কেউই ভূমি অফিসে এমন কোনো অভিযোগ জমা দেননি। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে নথিতে এই পেন্সিলের আঁচড় কাটল কে?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুন্সি জেবাউল হোসেন বদি নামের এক ব্যক্তির তদবিরেই অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর বিকর্ণ দাশ এই জালিয়াতির আশ্রয় নেন। শুধু তাই নয়, পরে নিজের কারসাজি ঢাকতে এবং পেন্সিলে লেখা ওই ভুয়া অভিযোগের একটি আইনি ভিত্তি দাঁড় করাতে ডালিম কুমারের ছেলেকে অন্তর্ভুক্ত করে তড়িঘড়ি করে নথিপত্রও তৈরি করে নেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে বিকর্ণ দাশ আমতা আমতা করে দাবি করেন, ডালিম কুমার না করলেও তার ছেলে এই অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো বৈধ প্রমাণ বা রিসিট কপি তিনি দেখাতে পারেননি। উল্টো চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তিনি বলেন, “আপনারা নিউজ করে বিষয়টিকে ঘোলাটে করেছেন। নিউজ না করে আমাকে বললে আমি ব্যবস্থা করে দিতাম।”
এ সময় নিজের দায় এড়াতে প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, “এগুলো নিয়ে ইকবাল হায়দারের লোক বদি আমার কাছে এসেছিল, এটা আমি পরে শারমিনের কাছে পাঠিয়েছি। আমাকে দোষারোপ করবেন না। আমি সব সাংবাদিকের চেয়ে আপনাকে বেশি সম্মান করি। এখন বিষয়টি আর আমার আয়ত্তে নেই।” একজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মচারীর এমন বেপরোয়া বক্তব্য আনোয়ারা এসিল্যান্ড দপ্তরের চেইন অব কমান্ড নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
অফিস সহকারীর ভিন্ন সুর ও নাজিরের অদ্ভুত শর্ত
ভূমি অফিসের এই অনিয়মের চিত্র কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিকর্ণ দাশের জালিয়াতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় সেখানে উপস্থিত হন অফিসের নাজির নূর উদ্দীন। তিনি এই হয়রানির কোনো সুরাহা তো করলেনই না, উল্টো সাংবাদিকদের দিলেন এক অদ্ভুত প্রস্তাব। তিনি বলেন, “ভাই, আপনারা আরেকটা পজেটিভ (ইতিবাচক) নিউজ করে দিন। তাহলে ফাইল ছেড়ে দেবে, দিয়ে দিবে।”
অন্যদিকে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভূমি অফিসের এক অফিস সহকারী প্রতিবেদককে বলেন, “বিষয়টি যেহেতু ঘোলাটে হয়ে গেছে, তাই আপনি আর বিকর্ণকে দোষারোপ না করে ভুক্তভোগীকে ডিসি অফিসে আবেদন করতে বলুন, তাহলে সহিমহুরিটা পেয়ে যাবেন।”
সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে রীতিমতো অনুরোধের সুরে তিনি আরও বলেন, “ভূমি অফিস নিয়ে নিউজ হলে আমরাও বিপদে পড়ে যাই, তাই।” একজন নাগরিকের আইনি অধিকার ও সরকারি সেবা পাওয়া না পাওয়া এখন সাংবাদিকদের ‘ইতিবাচক’ সংবাদ প্রকাশের ওপর নির্ভর করছে—সরকারি দপ্তরে এমন প্রকাশ্য দরকষাকষিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল।
ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ উপেক্ষিত
এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড দীপক ত্রিপুরার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। তিনি সে সময় আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, বিষয়টি তিনি নিজে দেখবেন এবং দ্রুত খতিয়ানের সহিমহুরি দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে সেই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন মেলেনি।
অন্যদিকে, পুরো বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক—এডিসি (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মিস মামলার রায় ও আদেশ হয়ে গেলে, সেই আদেশের ভিত্তিতেই খতিয়ানের সহিমহুরি নকল দিতে হবে; পেন্সিলে লেখা কোনো আদেশের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। তিনি ভুক্তভোগীকে সরাসরি এসিল্যান্ড দীপক ত্রিপুরার সঙ্গে দেখা করে সমাধানের পরামর্শও দেন।
কিন্তু এডিসি রাজস্বের সেই কঠোর নির্দেশনার পর ভুক্তভোগী সেনোয়ারা বেগম নতুন করে আশায় বুক বেঁধে আনোয়ারা ভূমি অফিসে গেলেও তাঁকে চরম হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়। অফিসের মূল কর্মকর্তারা নন, ফাইল আটকে রেখে সেই বিতর্কিত অস্থায়ী অপারেটর বিকর্ণ দাশই ভুক্তভোগীকে সাফ জানিয়ে দেন, পরে এসে দেখা করতে।
উপজেলার সর্বোচ্চ রাজস্ব কর্মকর্তা যেখানে সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন, জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা যেখানে পেন্সিলের লেখাকে অবৈধ ঘোষণা করছেন—সেখানে একজন দৈনিক ভিত্তিক অপারেটর কোন সাহসে ফাইল আটকে রাখেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভূমি অফিসে সেবা নিতে যাওয়া বৈরাগ এলাকার বাসিন্দা আবদুল জলিল বলেন, কার ইশারায় এবং কত টাকার বিনিময়ে বিকর্ণ দাশ এই সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছি। আনোয়ারার সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এই ‘পেন্সিল জিম্মিদশা’ থেকে মুক্তি চায়।
