সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আনোয়ারা ভূমি অফিসের পেন্সিল-কারসাজি: কে লিখল, কার স্বার্থে?

স্মারক নেই, সিল নেই, তবু পেন্সিলই আইন আনোয়ারা ভূমি অফিসে
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৬ মে ২০২৬ | ৭:৩৯ অপরাহ্ন


রোদ মাথায় নিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধা সেনোয়ারা বেগম। শরীর ভালো নেই, পা টলমল করছে, তবু চোখে একটাই প্রশ্ন— আজও কি ফেরত যেতে হবে? আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রতিদিনই এখানে ভিড় জমে অসংখ্য সাধারণ মানুষের— কেউ জমির নকল তুলতে, কেউ নামজারি করাতে, কেউ বা কাগজপত্রের জটিলতা ছাড়াতে। কিন্তু সেনোয়ারা বেগমের গল্পটা একটু আলাদা। তাঁকে আটকে রেখেছে একটি পেন্সিলের আঁচড়— কোনো সরকারি সিল নেই, স্মারক নম্বর নেই, কোনো দাপ্তরিক ভিত্তি নেই। শুধু একটি রহস্যময় হাতের লেখা, আর সেটুকুই যেন যথেষ্ট এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্তব্ধ করে দিতে।

শেষ সম্বলটুকু বেচতে চেয়েছিলেন

বয়সের ভার আর অসুস্থতার কষ্ট বুকে নিয়ে সেনোয়ারা বেগম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আড়াই গণ্ডা জমি বিক্রি করবেন। সামান্য এটুকুই তাঁর শেষ সম্বল। জমি বিক্রির জন্য দরকার বন্দর মৌজার সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের সহিমহুরি নকল, অর্থাৎ সার্টিফাইড কপি। সেটি তুলতে গেলেই শুরু হয় অদ্ভুত এক যন্ত্রণার অধ্যায়।

ভূমি অফিসের সহকারী শারমিন আক্তার জানান, ওই খতিয়ানে নাকি আপত্তি রয়েছে। সেনোয়ারা বেগম অবাক হয়ে জানতে চান— কিসের আপত্তি? আগের মিস মামলাটি তো আদালত আগেই খারিজ করে দিয়েছে! জবাবে তাঁকে দেখানো হয় একটি নথির পাশে পেন্সিল দিয়ে লেখা একটি মন্তব্য— “ডালিম কুমার দাশ বাদী হয়ে অভিযোগ দিয়েছেন।”

বৃদ্ধা থ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। এই লেখার কোনো তারিখ নেই। কোনো সিল নেই। কোনো স্মারক নম্বর নেই। কে লিখেছে, কখন লিখেছে— কিছুই জানা নেই। অথচ এই এক টুকরো পেন্সিলের দাগই হয়ে উঠেছে তাঁর পথের সবচেয়ে বড় বাধা।

যার নামে অভিযোগ, তিনিই অবাক

এই কাণ্ডের সবচেয়ে নাটকীয় দিকটি হলো— যার নামে সেই পেন্সিল-অভিযোগ লেখা, সেই ডালিম কুমার দাশ নিজেই বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানেন না।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, হ্যাঁ, আগে একটি মিস মামলা করেছিলেন। কিন্তু সেটি আদালত খারিজ করার পর তিনি আর কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো আবেদন করেননি, কোথাও কোনো কাগজপত্রও দেননি।

তাহলে প্রশ্ন হলো— কে লিখল এই নোট? কার স্বার্থে? কার ইঙ্গিতে? একটি জীবন্ত মানুষের নাম ব্যবহার করে, তাঁর অজান্তে, একটি সরকারি নথিতে পেন্সিলে লেখা এই অভিযোগ কি স্রেফ অনিচ্ছাকৃত ভুল, নাকি পেছনে আছে কোনো সুপরিকল্পিত কারসাজি?

যাচাইয়ের নামে দিনের পর দিন ঘোরানো

সেনোয়ারা বেগম তাঁর মুন্সিকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে গেছেন, জানতে চেয়েছেন এই পেন্সিল নোটের বিপরীতে কোনো দাপ্তরিক নথি আছে কিনা। জবাবে অফিস কর্তৃপক্ষ কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি। বরং বলেছে— “আরও দেখে জানাচ্ছি।” এভাবেই দুই দুইটো দিন কেটে গেছে। বৃদ্ধা মানুষ, অসুস্থ শরীরে বারবার অফিসে আসছেন, কিন্তু পাচ্ছেন শুধু ঘুরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস।

বটতলী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার শাহেদ বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নিজেই স্বীকার করেছেন— মিস মামলার আদেশ যখন আছে, তখন এমন একটি পেন্সিল-নোটের জন্য সহিমহুরি নকল আটকানো যায় না। এর পেছনে একটি আনুষ্ঠানিক নথি থাকার কথা। যেহেতু নেই, সেহেতু নকল দেওয়াই যায়। তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) অর্থাৎ এসিল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শও দিয়েছেন।

এসিল্যান্ডের জবাব: পেন্সিলকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা

আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরার কাছে যখন বিষয়টি যায়, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া আরও বিস্ময়কর। তিনি জানান, যেহেতু নথিতে মন্তব্য লেখা আছে, তাই তিনি অফিস সহকারীকে যাচাই করতে বলেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা দরকার— একজন প্রশিক্ষিত সরকারি কর্মকর্তা কি জানেন না যে পেন্সিলে লেখা, স্মারকবিহীন কোনো মন্তব্যের কোনো আইনি ভিত্তি নেই? তবু তিনি সেই মন্তব্যকেই আঁকড়ে ধরছেন কেন?

ডালিম কুমার দাশ নিজে বলছেন তিনি কোনো অভিযোগ করেননি— এই তথ্য তুলে ধরার পরও দীপক ত্রিপুরা কেবল “বিষয়টি দেখব” বলে এড়িয়ে গেছেন। এই এড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক না-বলা প্রশ্নের উত্তর।

আশার আলো দেখালেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

এই গোলকধাঁধায় কিছুটা আলোর সন্ধান দিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত। তিনি সরাসরি এবং স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন— মিস মামলার রায় বা আদেশ থাকলে সেই আদেশের ভিত্তিতে সহিমহুরি নকল দেওয়াই নিয়ম। পেন্সিলে লেখা কোনো মন্তব্যের দাপ্তরিক ভিত্তি নেই, এবং এটি আইনত গ্রহণযোগ্য কারণ হতে পারে না।

তিনি সেনোয়ারা বেগমকে পুনরায় এসিল্যান্ড দীপক ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— একজন সাধারণ বৃদ্ধা মানুষকে কেন এত পথ ঘুরতে হবে? কেন তাঁকে উপজেলা থেকে জেলায় ছুটতে হবে? যে উত্তরটি একটি ফোনকলেই মিলতে পারত, তার জন্য কেন দুইটি দিন নষ্ট হলো?

আসল প্রশ্নটি থেকেই যায়

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় যে রহস্য অমীমাংসিত থেকে গেছে, তা হলো— সেই পেন্সিলের লেখা কার হাতের? কে বা কারা ডালিম কুমার দাশের নাম ব্যবহার করে, তাঁর অজান্তে, একটি খারিজ হয়ে যাওয়া মামলার পাশে এই মন্তব্য লিখে রাখল?

জমির কাগজপত্রে পেন্সিলের এই ছোট্ট আঁচড় নিছক কর্মচারীর অবহেলা, নাকি পেছনে আছে হয়রানির সুচিন্তিত একটি কৌশল— যেখানে সেবাপ্রার্থীকে ঘুরিয়ে ক্লান্ত করে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না তিনি “সুবিধা” দিতে রাজি হন?

আনোয়ারা ভূমি অফিসের এই ঘটনা স্রেফ একজন বৃদ্ধার সমস্যা নয়। এটি সেই পুরনো ব্যাধির নতুন উপসর্গ, যেখানে রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার ভেতরে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য ক্ষমতার খেলা— কখনো রাবার স্ট্যাম্পে, কখনো ফাইলের তলায়, আর কখনো বা একটি পেন্সিলের নিরীহ আঁচড়ে।

সেনোয়ারা বেগম এখনো অপেক্ষায় আছেন। তাঁর শেষ সম্বলটুকু বিক্রির স্বপ্ন এখনো আটকে আছে সেই রহস্যময় দাগের কাছে। রাষ্ট্র কি শুনছে?