২৪৮ জন বনাম ২ জন: যে তুলনাটা আর কেউ করতে পারবেন না


চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্রীদের কমন রুমটি মেরামত করতে খরচ ধরা হয়েছিল ১৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। সেই কাজের দরপত্র কিনেছিলেন ২৪৮ জন ঠিকাদার, জমা দিয়েছিলেন ২৪৫ জন।

একই সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ডেকেছিল লোকো সাইডিং লাইন নবায়নের দরপত্র- ৩ কোটি ১২ লাখ টাকার কাজ। দরপত্র কিনেছিলেন দুজন, জমা দিয়েছিলেন দুজন, গ্রহণযোগ্য হয়েছিল একটি।

ছাত্রীদের একটি ঘরের মেরামতে আড়াই শ প্রতিযোগী। তিন কোটি টাকার সরকারি কাজে কার্যত একজন।

এই তুলনাটি আপনি করতে পারলেন, কারণ দুটি চুক্তির প্রকাশিত নথিতে তিনটি ঘর ছিল- দরপত্র দলিল কতগুলো বিক্রি হলো, কতগুলো জমা পড়ল, কতগুলো গ্রহণযোগ্য হলো।

আজ আর এই তুলনাটি কেউ করতে পারবেন না। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের পরে বিজ্ঞাপিত কোনো সরকারি চুক্তির প্রকাশিত পাতায় ঘর তিনটির একটিও নেই।

চট্টগ্রামের তিন মাসের ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ঘরগুলো টিকে আছে মাত্র ৮টিতে। বাকি ২ হাজার ১৭৭টিতে কোনো চিহ্নই নেই।

[সরকারি কেনাকাটার ডিজিটাল ব্যবস্থা ই-জিপি বানানো হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসের (২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে) ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির প্রতিটি নথি এক এক করে পড়ে দেখেছেন এ প্রতিবেদক; মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ১৪ ধরনের যাচাই মিলিয়ে ১ হাজার ৬৪৯টি চুক্তিতেই অন্তত একটি “খটকা” মিলেছে- খটকা মানে প্রমাণিত দুর্নীতি নয়, প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ প্রথম পর্ব।]

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-১: “যেভাবে ২,১৮৫টি চুক্তি এক এক করে পড়া হলো”]

কেন এই আটটি বেঁচে গেল

তারিখ সাজালে উত্তরটি নিজেই বেরিয়ে আসে।

আটটিরই দরপত্র-বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুন থেকে ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। আর ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর গেজেট।

আটটির মধ্যে সাতটির বিজ্ঞাপন গেজেটের আগে। শেষটি- চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্রীদের কমন রুম মেরামতের সেই দরপত্র, যেখানে ২৪৮ জন দলিল কিনেছিলেন- বিজ্ঞাপিত হয় গেজেটের পরদিন, ২৯ সেপ্টেম্বর। সেটিই ছিল শেষ চুক্তি, যার প্রকাশিত পাতায় ঘর তিনটি টিকে ছিল।

৩০ সেপ্টেম্বর বা তার পরে বিজ্ঞাপিত একটি চুক্তির পাতাতেও ঘর তিনটি পাওয়া যায়নি। একটিও ব্যতিক্রম নেই।

আর একই বদলে যুক্ত হয়েছে ঠিকাদারের প্রকৃত মালিকানার নতুন ঘর।

অর্থাৎ স্বচ্ছতার এক জানালা খুলেছে, আরেকটি একই সঙ্গে বন্ধ হয়েছে। এই আটটি চুক্তি তাই ব্যতিক্রম নয়- একটি সংক্রমণকালের অবশেষ, যা দেখিয়ে দেয় আগে কী ছিল আর এখন কী নেই।

ঘর তিনটি নতুন ছিল না, ১৭ বছরের পুরোনো

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই: ঘরগুলো তো কোনো নতুন পরীক্ষা ছিল না।

২০০৮ সালের ক্রয়বিধিমালার তফসিল-৬-এ চুক্তি প্রকাশের ছকে ক্রম ২১, ২২ ও ২৩ ছিল ঠিক এই তিনটি সংখ্যা। কেন্দ্রীয় ক্রয় দপ্তরের (তখন সিপিটিইউ, এখন বিপিপিএ) ওয়েবসাইটে তা প্রকাশের কথা ছিল। অর্থাৎ ঘর তিনটি বিধির ছকে ছিল ১৭ বছর ধরে।

নতুন বিধিমালাও সেগুলো বাতিল করেনি। তফসিল-৯-এ সংখ্যাগুলো অক্ষত, আর বিধি ৪৯(১) বলছে, চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ জারির “অব্যবহিত পরেই” এই তথ্য ক্রয়কারীর ও বিপিপিএর ওয়েবসাইটে “প্রকাশ করিতে হইবে”।

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-২: “যে ঘর ১৭ বছর ছিল”]

আইন এখনো প্রকাশ করতে বলছে। শুধু প্রকাশের ছকটিতে ঘরগুলো আর নেই।

ক্ষতিটা কেবল একজন নাগরিকের কৌতূহলের নয়। প্রতিযোগিতা নিয়ে দেশের স্বাধীন হিসাবগুলোও দাঁড়িয়ে ছিল এই সংখ্যাগুলোর ওপরই। টিআইবির ২০২৩ সালের বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছিল, দেশের ৪৬ শতাংশ চুক্তিতে দরদাতা ছিলেন চারজনের কম, আর প্রতি পাঁচটি চুক্তির একটিতে দরদাতা মাত্র একজন। ঘরগুলো না থাকলে এমন হিসাব আর করা যায় না।

তথ্যটি একেবারে অস্তিত্বহীন নয়। কিন্তু তা থাকে এমন জায়গায়, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রজেক্ট ম্যানেজার ও বিপিপিএর তালিকাভুক্ত জাতীয় ক্রয়-প্রশিক্ষক শাহানা ফেরদৌস সীমারেখাটি টানেন এক বাক্যে: বিস্তারিত হিসাব থাকে চুক্তির দলিলে, আর “কন্ট্রাক্ট ডকুমেন্ট দেখাটা সবার জন্য ওপেন না।”

ঠিক এ কারণেই বিধিটি তথ্যটি প্রকাশ্য পাতায় আনতে বলেছিল, যাতে দলিল না দেখেও নাগরিক জানতে পারেন।

আর ক্রম ২০, অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য দরদাতাদের নাম- সেটি ওই আটটিসহ ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির একটিতেও নেই। কতজন দর দিয়েছিলেন, তা আট ক্ষেত্রে জানা যায়; কারা দিয়েছিলেন, তা কোনো ক্ষেত্রেই জানা যায় না।

“আমরা কেন বাদ দেব, কেন?”

প্রশ্নটি পৌঁছেছে একজনের কাছে, যাঁর কাছে উত্তরটি থাকার কথা।

এস এম মঈন উদ্দীন আহমেদ বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব নেন ২০২৫ সালের ২৯ জুন। গেজেট জারি হয় তার তিন মাস পরে, ২৮ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ ছক থেকে ঘর তিনটি যেদিন মুছে যায়, সেদিন সংস্থাটির শীর্ষ চেয়ারে তিনিই ছিলেন।

ফোনে তাঁকে বিষয়টি জানানো হয়- নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার আগে প্রকাশিত প্রতিটি ই-চুক্তির পাতায় দরপত্র দলিল বিক্রি, জমা ও গ্রহণযোগ্য দরপত্রের সংখ্যা লেখা থাকত; তার পরে প্রকাশিত একটিতেও নেই। এটি সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছে?

প্রথমবারে তিনি প্রশ্নটি ধরতে পারেননি- “আমি বুঝি নাই ভালো।” ব্যাখ্যা করে আবার বলার পর জবাব ছিল স্পষ্ট: “না, এই ধরনের তো কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নিই নাই যে কোনো কিছু বাদ দেওয়া হবে। এরকম যা ছিল আগে তাই তো থাকার কথা।”

স্বচ্ছতার দিক থেকে পিছিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না- এই প্রশ্নে তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন: “না না, কোনো কিছু বাদ দেই নাই আমরা। আমরা কেন বাদ দেব, কেন?”

কেন বা কীভাবে ঘর তিনটি প্রকাশিত পাতা থেকে সরে গেল, তার কোনো বিকল্প ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

“এতদিন দিচ্ছেন, হঠাৎ বন্ধ করে দিলেন- এটা তো হইতে পারে না”

ব্যাখ্যাটি কেবল এই প্রতিবেদকের কাছেই অধরা নয়।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা রয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)। সংস্থাটির পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, ঘর তিনটি উধাও হওয়ার বিষয়টি তাঁদেরও নজরে এসেছে, এবং তাঁরাও ব্যাখ্যা পাননি- “ওদের কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত আমরা পাই নাই… আমরা নিজেরাও ঐটা খুঁজতেছি।”

কেন বন্ধ হলো, তা তিনি নিশ্চিত নন- “কেন দিচ্ছে না হঠাৎ করে, আমি এটা ঠিক জানি না।”

মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “দরদাতার সংখ্যা প্রকাশ করা স্বচ্ছতার জন্য সবার আগে জরুরি। এতদিন প্রকাশ করা হচ্ছে, হঠাৎ করে নতুন পিপিআর প্রকাশ করার পরে এটা বন্ধ করে দিলেন, এটা তো হইতে পারে না।” তথ্যটি জনগণের, তাই কারও কাছে চেয়ে নেওয়ার কথা নয়- “এটা এমনিই পাবলিশ থাকার কথা, ওয়েবসাইটে পাবলিশ থাকার কথা।”

যে যুক্তিটি দেওয়া হয়

এর একটি সোজা ব্যাখ্যা আছে: তফসিল-১০ যে ছক বেঁধে দিয়েছে, তাতে ঘরটি নেই; ছকে যা নেই, সিস্টেম তা দেখাবে কীভাবে? ব্যাখ্যাটি কারিগরিভাবে ঠিক, এবং এতে কোনো দপ্তরের গাফিলতি নেই।

কিন্তু ব্যাখ্যাটি তিনটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে দেয়।

এক, একই বিধিমালার তফসিল-৯ ও বিধি ৪৯(১) সংখ্যাগুলো চেয়েই যাচ্ছে। আইনের দুটি অংশ পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে।

দুই, ছক বদলানো কারিগরি বাধ্যবাধকতা নয়, নীতিগত সিদ্ধান্ত। মালিকানার ঘর যোগ করা গেলে দরদাতা-সংখ্যার ঘর রাখাও যেত।

তিন, সিদ্ধান্তটি কার, কবে, কোন যুক্তিতে- এই প্রশ্নের কোনো লিখিত উত্তর মেলেনি।

২ হাজার ১৭৭টি চুক্তির পাতা থেকে তথ্য তিনটি সরে গেছে- এটি নথিভুক্ত সত্য। কিন্তু যে সময়ে তা ঘটেছে, তখনকার শীর্ষ কর্মকর্তা বলছেন, বাদ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়নি। অথচ ছকটি বদলেছে, আর একই বদলে নতুন একটি ঘর যুক্ত হয়েছে। কেউ না কেউ ছকটিতে হাত দিয়েছেন।

প্রশ্নটি তাই বদলে যায়। “কেন বাদ দেওয়া হলো” নয়- কারও সিদ্ধান্ত ছাড়াই একটি জাতীয় ব্যবস্থার প্রকাশ্য ছক থেকে তিনটি তথ্য কীভাবে মুছে যেতে পারে, আর মুছে যাওয়ার দশ মাস পরেও সংশ্লিষ্টরা তা টের পান না কীভাবে?

যে জানালাটি খুলল, তার কাচও ঘোলা

পিপিআর ২০২৫ একটি বড় শর্ত এনেছে: শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, তার প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক কে- নাম, শতাংশ, দেশ- তা-ও প্রকাশ করতে হবে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার: বেনামি ঠিকাদারি ঠেকানো, কাগজে এক প্রতিষ্ঠান পেছনে অন্য কেউ- এই চর্চা বন্ধ করা।

চট্টগ্রামে ১০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বের চুক্তি ৯৫৯টি। সুখবরটা আগে: এর ৯৫৭টিতেই মালিকানার ঘর পূরণ আছে।

কিন্তু ঘর পূরণ থাকা আর প্রকৃত মালিক জানা- এক কথা নয়।

শুরুতে যে রেলের চুক্তিটির কথা বলা হয়েছে- সেখানে ৪৯ শতাংশ অংশীদারের মালিকের নাম আছে; আর ৫১ শতাংশ, অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারের মালিকের ঘরে সরকারি পোর্টালের নিজের ভাষায় লেখা: “No record found”।

একই চুক্তি, দুই ঘর। একটিতে জানা যায় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কার্যত একজন; আরেকটিতে জানা যায় না, সেই একজনের পেছনে কে।

আরেকটি চুক্তিতে একটি বেসরকারি লিমিটেড কোম্পানির মালিকের ঘরে বসানো আছে কোম্পানির নিজেরই নাম, ১০০ শতাংশ। প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্নটিই ফিরিয়ে দেওয়া- বিধিটি যে মানুষটিকে খুঁজছিল, ঠিক তাঁকেই পাওয়া যায় না।

ঝুঁকিটা কোথায়, ব্যাখ্যা করেন শাহানা ফেরদৌস। যৌথ উদ্যোগে কার কত শতাংশ, সেটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, “কারণ ওই শেয়ার অনুযায়ী তার ফিন্যান্সিয়াল ক্যাপাসিটি, প্লাস পরবর্তীতে এক্সপেরিয়েন্স- ওই শেয়ারটা ডিভাইড হবে।” অর্থাৎ শতাংশের ওই সংখ্যাটিই ঠিক করে দেয় কে কতটুকু আর্থিক দায় নিচ্ছেন, আর ভবিষ্যতে কে কতটুকু অভিজ্ঞতার দাবি করতে পারবেন। তথ্যটি না থাকলে পরের দরপত্রে সেই দাবি যাচাইয়ের উপায়ও থাকে না।

সমাধানটি জটিল নয়। যৌথ উদ্যোগের প্রতিটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি ইউনিক আইডি থাকলে, আর সেই আইডির সঙ্গে কাজের শতাংশ যুক্ত থাকলে, “৫১ শতাংশ কার” প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ওপর ছাড়তে হতো না।

ভেতরে আছে, বাইরে নেই

আর যে দুটি চুক্তিতে মালিকানার ঘরটিই অনুপস্থিত, তার একটিতে এই সিরিজের সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ মিলেছে যে সমস্যাটি মানুষের নয়, ব্যবস্থার।

চুক্তিটি পদ্মা অয়েল কোম্পানির- নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে ২ হাজার কিলোলিটার পেট্রোলিয়াম স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ, ৫ কোটি ৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ঠিকাদার দুই কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ, ৫১ ও ৪৯ শতাংশ অংশীদারত্বে। প্রকাশিত নথিতে পেছনের ব্যক্তিমালিকদের নাম-শতাংশের বাধ্যতামূলক ঘরটিই নেই।

লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর ছয় দিন পর, ২৮ জুলাই, পদ্মা অয়েলের চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। উপ মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) ফারুক হোসেন মাহমুদের কক্ষে দপ্তরের ই-জিপি-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নথিটি খুলে বসেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধির সঙ্গেও ফোনে কথা হয় প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট: মালিকানার তথ্য তিনি ই-জিপিতে আপলোড করেছেন; সাধারণ মানুষ তা দেখতে পাচ্ছে না- এটি তাঁর সমস্যা নয়, সিস্টেমের সমস্যা।

দাবিটি যাচাই করা গেছে সেই ঘরে বসেই। দপ্তরের কম্পিউটারে নিবন্ধিত আইডি দিয়ে লগ-ইন করা অবস্থায় একই চুক্তির পাতা খুললে দেখা যায়- মালিকানার তথ্য সেখানে আছে।

একই তথ্য, দুই পর্দায় দুই রকম। ভেতরে আছে, বাইরে নেই।

কারণ খুঁজতে গিয়ে আবার সেই তারিখেই চোখ আটকায়। এই দরপত্রের বিজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, সকাল ৯টা- যেদিন নতুন বিধিমালা কার্যকর হলো, মালিকানা-তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতাসহ। পুরোনো ছক আর নতুন ছকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো একটি চুক্তি।

এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়- নিশ্চিত করতে পারে কেবল বিপিপিএ, যারা সিস্টেমটি চালায়। আর বিপিপিএর ভেতর থেকে এই প্রশ্নে দুই রকম উত্তর এসেছে, পরপর দুই দিনে। ২২ জুলাই সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান নির্বাহী এস এম মঈন উদ্দীন আহমেদ ফারাকটি স্বীকার করেন: “পিপিআরে আমরা রুলে কেবল নিয়ে আসছি। ওইটা সিস্টেমে এখনো বাধ্যতামূলক করা হয় নাই।” পরদিন সংস্থাটির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. মোশাররফ হোসেন বলেন ঠিক উল্টো- “বেনিফিশিয়ারি ওনারশিপ এখন ম্যান্ডেটরি”; তথ্য না দিলে এখন আর দাখিলই গ্রহণ করা হয় না।

ব্যাখ্যা যেটাই হোক, একটি বিষয় বদলায় না: বিধিটি যা চেয়েছিল, তা জমা নয়- প্রকাশ। শর্তটি পূরণ হয় তখনই, যখন যেকোনো নাগরিক তা খুলে দেখতে পারেন। এই চুক্তিতে ঠিকাদার দায়িত্ব পালন করেছেন, দপ্তরও নথি রেখেছে- আর তবু আইনের উদ্দেশ্যটি ব্যর্থ হয়েছে, কারণ ব্যবস্থাটি তথ্যটিকে বাইরে আসতে দেয়নি।

তৃতীয় সংস্কার: যে বিধি মৌখিক নির্দেশে স্থগিত

পিপিআর ২০২৫ একটি প্রায় অনালোচিত সামাজিক শর্তও যুক্ত করেছে। ক্রয়কারীকে তার পরিচালন বাজেটের ক্রয়ের একটি অংশ “কেবল অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান, নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নূতন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত রাখিবে”- ন্যূনতম ২৫ শতাংশ। ভাষাটি “পারিবে” নয়, “রাখিবে”।

চট্টগ্রামের তিন মাসের খাতায় যেসব প্রতিষ্ঠানের একমাত্র মালিক একজন নারী, তাঁদের হাতে গেছে ৭৪টি চুক্তি, ১৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা- মোট চুক্তিমূল্যের ১.৮ শতাংশ। সংরক্ষণটি তিন শ্রেণির সম্মিলিত, তাই কেবল এই সংখ্যা দিয়ে লঙ্ঘনের সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্নটি প্রাতিষ্ঠানিক: ই-জিপি এই ২৫ শতাংশ আদৌ গোনে কি? পোর্টালের কোনো পাতায় তার চিহ্ন মেলেনি।

কেন গোনে না, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন শাহানা ফেরদৌস। বিধিটি কার্যকর করতে হলে আগে জানতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান নারী-মালিকানাধীন, কোনটি নতুন- সেই তালিকাটিই তৈরি হয়নি। দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে মৌখিকভাবে, তালিকা চূড়ান্ত হলে বিধিটি প্রযোজ্য হবে। “এটার জন্য আলাদা কোনো পরিপত্র নাই,” বলেন তিনি। “কিন্তু এটা আমাদের ডিপার্টমেন্টগুলোতে বিপিপিএ থেকে মৌখিকভাবে জানাই দেওয়া হয়েছিল।”

ফাঁকটি এখানেই: বিধির ভাষা বাধ্যতামূলক, অথচ বাধ্যবাধকতাটি স্থগিত রাখা হয়েছে মৌখিক নির্দেশে- লিখিত কোনো পরিপত্র ছাড়াই। কেউ বিধি ভাঙছে না, কেউ মানছেও না।

আর সংখ্যাটি খাতায় যা দেখায়, বাস্তব তার চেয়েও কম হতে পারে। চট্টগ্রামে অন্যতম সক্রিয় নারী ঠিকাদার রুম্মান সুলতানা নিজে এই কোটা ব্যবহার করেন না- “আমি কেন এমনি প্রিভিলেজ নিব?” কিন্তু নারী-মালিকানার অংশ দুই শতাংশেরও কম, এই তথ্য তুলতেই তিনি একটি গুরুতর দাবি করেন: “১ পার্সেন্ট নারীর ভিতরে নারীর হাজবেন্ডরাই কাজ করে।”

যে খাতা নাগরিক পড়তেই পারেন না

তিনটি ঘাটতিরই একটি সাধারণ পরিণতি: যাচাইয়ের পথ বন্ধ।

তিন মাসে কাজ পেয়েছে ১ হাজার ২০৮টি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু মোট চুক্তিমূল্যের ৭৭ শতাংশ গেছে শীর্ষ ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১২১টি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ঘনত্ব নিজে কোনো অনিয়ম নয়- বড় সড়ক-ভবনের কাজ বড় প্রতিষ্ঠানই পাবে। কিন্তু যে ব্যবস্থায় দরদাতার তালিকাই প্রকাশ্য নয়, সেখানে “কার হাতে কত” প্রশ্নের স্বাধীন যাচাইয়ের পথ খোলা থাকা দরকার।

সেই পথটিও সরু। ইউক্রেনের ক্রয়-পোর্টাল প্রোজোরো বা যুক্তরাজ্যের কন্ট্রাক্টস ফাইন্ডারে যে কেউ নিজের এলাকার সব চুক্তি এক ক্লিকে নামিয়ে নিজের কম্পিউটারে হিসাব কষতে পারেন। কারিগরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, লগইন ছাড়াই কন্ট্রাক্টস ফাইন্ডার থেকে এক ক্লিকে ৬ হাজারের বেশি রেকর্ড এক ফাইলে নেমে আসে- চুক্তির শুরু-শেষের তারিখসহ।

বাংলাদেশের ই-জিপিতে চুক্তির তথ্য প্রকাশিত আছে ঠিকই, কিন্তু প্রতি পাতায় দেখা যায় মাত্র ১০টি; পুরো তালিকা নামানোর কোনো বোতাম নেই। তাই এক জেলার তিন মাসের চুক্তি সংগ্রহ করতে হয়েছে হাতে হাতে।

বিপিপিএর একটি “সিটিজেন পোর্টাল” অবশ্য আছে; ২০২০ সালে উদ্বোধনের সময় প্রতিশ্রুতি ছিল, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ যে কেউ ক্রয়-তথ্য নামিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারবেন। ২০ জুলাই পোর্টালটি হাতে-কলমে পরীক্ষা করা হয়। চুক্তিভিত্তিক তথ্য দেখা যায়, তবে একবারে সর্বোচ্চ ৫০টি; কাজ শুরু ও সমাপ্তির তারিখ- যে ঘরগুলো নিয়ে এই সিরিজের গোটা অনুসন্ধান- সেখানে নেই। “ওসিডিএস আকারে দেখুন” লিংকে ক্লিক করলে কিছুই খোলে না। আর “এক্সেল হিসাবে এক্সপোর্ট করুন” বোতামে যে ফাইলটি নামে, তাতে চুক্তির কোনো তথ্যই নেই- আছে কেবল ১৬ সারির অর্থবছরভিত্তিক যোগফল।

ত্রুটিটি বিপিপিএও জানে। ২৩ জুলাই ফোনে মোশাররফ হোসেন নিজের পর্দায় লিংকটি খুলে বলেন, “তাই তো, আমিও দেখছি কাজ করছে না। এটা আমাদের মাইগ্রেশন হচ্ছে, ক্লাউডে পাঠাইছি।” কবে সুবিধাটি ফিরবে, জানা যায়নি। তুলনাটি নিয়ে তাঁর দ্বিমতও নেই- ইউক্রেনের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর মন্তব্য, “ইউক্রেনের প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম অনেক ভালো।”

সমস্যাটি কেবল কারিগরি নয়। প্রকাশিত তথ্যকে দপ্তর নিজে কীভাবে দেখে, সেটিও একটি প্রশ্ন।

চট্টগ্রাম গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১-এর ৩৫টি চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন পাঠানোর পর ৪ আগস্ট ফোনে দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান ইবনে কামালের প্রথম প্রতিক্রিয়াই ছিল- বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। কেন? “অফিশিয়ালি পারি না, আনঅফিশিয়ালিও পারি না। কারণ এগুলা তো ধরেন গোপন দলিল।”

যে নথিগুলোর কথা বলা হচ্ছিল, সেগুলোর একটিও গোপন নয়। প্রতিটির ই-জিপি লিংক তাঁকে পাঠানো হয়েছিল; যে কেউ ইন্টারনেটে খুলে দেখতে পারেন। রাষ্ট্র নিজেই সেগুলো প্রকাশ করেছে।

সেই একই আলাপের শেষে অবশ্য তিনি উল্টো কথাও বলেন- বিস্তারিত তথ্য চাইলে দিতে তাঁর আপত্তি নেই: “আমি আপনাকে এগুলো চাইলে দিব অসুবিধা নাই।”

দুটি বাক্যের মধ্যে দূরত্বটাই এই পর্বের বিষয়। আইনে যা প্রকাশ্য, অভ্যাসে তা এখনো গোপন; আর গোপনীয়তার তালাটি খোলে অনুরোধে, অধিকারে নয়।

দামটা এই অনুসন্ধানেই বারবার মেটাতে হয়েছে। চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বার্ষিক ক্রয়ের ৮২ শতাংশ গেছে একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠানে (বিস্তারিত তৃতীয় পর্বে)। সেটি যোগসাজশ নাকি ঘটনাচক্র- এই প্রশ্নের মীমাংসা হতো একটিমাত্র তালিকায়: ছয় দরপত্রে কারা দর দিয়েছিলেন। তালিকাটি শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, তবে পোর্টাল থেকে নয়- হাসপাতালের কাছে আলাদা অনুরোধ করে।

প্রশ্নটি তাই সদিচ্ছার নয়। প্রশ্নটি হলো- যে তথ্য পেতে একজন সাংবাদিকের চিঠি ও তাগাদা লাগে, একজন সাধারণ নাগরিকের তা পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? স্বচ্ছতা যদি অনুরোধসাপেক্ষ হয়, তবে সেটি আর স্বচ্ছতা নয়- অনুগ্রহ।

যা ঠিক করতে নতুন কোনো আইন লাগবে না

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হয়তো এটাই: এসব ঠিক করতে নতুন কোনো আইন লাগবে না।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি আইন, ২০২৩-এর ধারা ৯-এ বিপিপিএর দায়িত্বের তালিকায় এরই মধ্যে লেখা আছে ক্রয় আইনের “প্রতিপালন নিশ্চিতকরণ, পরিবীক্ষণ”, এমনকি প্রয়োজনে ক্রয়কারীর নথি “পরিদর্শন ও পর্যালোচনাকরণ”। দায়িত্বগুলো আছে; নেই কেবল বাস্তবায়ন। কী করলে খাতাটি নিজেই প্রশ্ন করতে শিখবে- তার পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ থাকছে শেষ পর্বে।

এই প্রতিবেদনের জন্য বিপিপিএর কাছে ১২ দিনে তিন দফায় লিখিত প্রশ্ন গেছে। জবাব আসেনি একটিরও।

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৩: “১২ দিন, তিন দফা, শূন্য জবাব”]

যা গতকালই বলা হলো

এই প্রতিবেদন লেখার ঠিক আগের দিন, ১৬ আগস্ট, বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানিয়েছেন, সরকার এখন ই-জিপির নতুন সংস্করণ- ভার্সন ২.০- তৈরির রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে, লক্ষ্য “আধুনিক, নাগরিক-কেন্দ্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর” একটি ক্রয়ব্যবস্থা গড়া।

সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ২০১০ সালে চুক্তি-অ্যাওয়ার্ড নোটিশ প্রকাশের হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ; আজ তা ১০০ শতাংশ।

সংখ্যাটি নির্ভুল। এই অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির প্রতিটিরই নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্নটি তাই প্রকাশ হওয়া না-হওয়া নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, সেই প্রকাশিত পাতায় ঠিক কোন তথ্য থাকে- আর ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সেই একই পাতা থেকেই তিনটি ঘর উধাও।

ফিরি সেই দুটি সংখ্যায়। ২৪৮ আর ২।

ছাত্রীদের কমন রুম আর রেলের তিন কোটি টাকার লাইন- দুটি চুক্তি পাশাপাশি রেখে আপনি এক নজরে বুঝে ফেলেছিলেন, কোথায় সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আর কোথায় হয়নি। এই বোঝাটুকুর জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ লাগেনি, কোনো ফাঁস হওয়া নথিও লাগেনি। লেগেছিল শুধু তিনটি ঘর।

ঘর তিনটি ছিল ২০০৮ সালের বিধিমালার ছকে। ছিল ১১ মাস আগেও।

তারপর একটি সংস্কার হলো- যার নাম “স্বচ্ছতা”।

[এই অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া প্রতিটি চুক্তির টেন্ডার আইডি, সংকেতের (খটকা) হিসাব ও আর্কাইভ লিংকসহ পূর্ণ তথ্যভান্ডার প্রকাশিত হবে সিরিজের শেষ (পঞ্চম) পর্বের সঙ্গে, একসঙ্গে- যাতে পাঠক পুরো সিরিজের প্রতিটি দাবি নিজে মিলিয়ে দেখতে পারেন।]

আগামীকাল পড়ুন:তিন থেকে পাঁচটা লাইসেন্স আমরাই বেছে দিই, অন্য কেউ দেখবেও না


সরকারি কেনাকাটার ছয় ধাপ

সরকারি কেনাকাটার ছয়টি ধাপ পরপর ঘটার কথা: প্রথমে দরপত্র আহ্বান, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন প্রকাশ। এরপর দাখিল ও মূল্যায়ন- কে যোগ্য, কার দর কত। তারপর চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ বা কার্যাদেশ (এনওএ; কথ্য ভাষায় বলা হয় “নোয়া”)- কাকে কাজ দেওয়া হলো, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর পরের ধাপ কার্যসম্পাদন জামানত (পিজি)- ঠিকাদারের জমা দেওয়া টাকা, যা কাজ না করলে বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত ব্যাংকে যাচাই হওয়ার পরই হয় চুক্তি স্বাক্ষর। আর সবশেষে শুরু হয় কাজ।

সহজ কথায়: আগে কাগজ, পরে কাজ। এই ক্রম উল্টে গেলে কী দাঁড়ায়- সেটিই এই সিরিজের বিষয়।