‘এটা ১০০% পেতে পারি আমি’: এক মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান, ৮২ শতাংশ কাজ


চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ওষুধ কেনার দরপত্রে দর দিয়েছিল সাতটি প্রতিষ্ঠান। সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির দরপত্রে চারটি। কেমিক্যাল ও রি-এজেন্টের দরপত্রেও একাধিক।

বছর শেষে হাসপাতালটির বার্ষিক ক্রয়ের ৮২ শতাংশ- ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার ছয়টি চুক্তি জমা হলো দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে।

ই-জিপির প্রকাশিত পাতায় দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকের ঘরে একটিই নাম: রুম্মান সুলতানা।

তথ্যটি তাঁকে জানানো হলে তিনি বিব্রত হননি। ৮২ শতাংশের কথা তুলতেই তাঁর জবাব:

“এটা ১০০% পেতে পারি আমি।”

[সরকারি কেনাকাটার ডিজিটাল ব্যবস্থা ই-জিপি বানানো হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসের (২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে) ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির প্রতিটি নথি এক এক করে পড়ে দেখেছেন এ প্রতিবেদক; মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ১৪ ধরনের যাচাই মিলিয়ে ১ হাজার ৬৪৯টি চুক্তিতেই অন্তত একটি “খটকা” বা “সতর্ক সংকেত” মিলেছে- খটকা মানে প্রমাণিত দুর্নীতি নয়, প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ তৃতীয় পর্ব।]

ছয়টি চুক্তি, দুটি নাম

চুক্তিগুলো হাসপাতালের সবচেয়ে মৌলিক কেনাকাটার- ওষুধ, র‍্যাবিস ভ্যাকসিন, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি, এক্স-রে ফিল্মসহ কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট, আর কম্পিউটার।

তিনটি গেছে এমএসএম বাংলাদেশের কাছে: ওষুধ ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, ওষুধ ও র‍্যাবিস ভ্যাকসিন ১ কোটি ৩৯ লাখ, কম্পিউটার ৮ লাখ ৮৬ হাজার।

তিনটি গেছে এমএসএম হেলথ কেয়ারের কাছে: সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ২ কোটি ৫ লাখ টাকা, এক্স-রে ফিল্মসহ কেমিক্যাল ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার, কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট ৪১ লাখ ৭ হাজার।

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-১: “ছয় চুক্তি, দুই প্রতিষ্ঠান, এক মালিক”]

তারিখগুলোও পাশাপাশি চলে। ছয়টির চারটির বিজ্ঞাপন একই দিনে, ২৫ জানুয়ারি। ১৫ এপ্রিল একই দিনে সই হলো তিনটি চুক্তি- দুটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে। ১৯ মে আবার একই দিনে দুটি।

জনস্বার্থের প্রশ্নটি এখানে সবচেয়ে সরাসরি। যে ওষুধ, যে ভ্যাকসিন, যে সার্জিক্যাল যন্ত্র নিয়ে একটি সরকারি হাসপাতাল সারা বছর চলে- তার প্রতিটির দাম নির্ধারিত হয়েছে এমন এক “প্রতিযোগিতা”য়, যেখানে মূল সরবরাহকারীদের মালিকানার ঘরে একটিই নাম।

যা নথিতে নেই

এই জায়গায় সবচেয়ে সহজ ছিল যোগসাজশের অভিযোগ তোলা। এই প্রতিবেদন তা তোলে না। কারণ নথি তা সমর্থন করে না।

এই প্রতিবেদকের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয়টি দরপত্রের উন্মুক্তকরণ শিট সরবরাহ করে। শিটগুলো মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: রুম্মান সুলতানার দুই প্রতিষ্ঠান কখনো একই দরপত্রে মুখোমুখি হয়নি। প্রতিটি প্যাকেজে ছিল তাঁর একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান, আর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তিন থেকে আটটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

অর্থাৎ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬-এর ধারা ৬৪ যে যোগসাজশের কথা বলে, তার প্রমাণ নথিতে নেই।

তাহলে প্রশ্নটি আইনে ওঠে কোথায়?

ক্রয়-আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরীর উত্তর সংক্ষিপ্ত: “না, ঠেকানোর কোনো বিধান নেই।”

তাঁর ব্যাখ্যা, বিধিমালায় “স্বার্থের দ্বন্দ্ব” নামে একটি তফসিল আছে বটে, কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে- কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে কোনো দরদাতার সঙ্গে সম্পর্কিত (আত্মীয়, বন্ধু বা ব্যবসায়িক অংশীদার) হলে তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা। “এটা কর্মকর্তা-দরদাতার সম্পর্ক নিয়ে, দুই দরদাতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নয়।”

“সহযোগী প্রতিষ্ঠান” শব্দটিও বিধিমালায় একবারই আছে, এবং তা-ও কেবল পরামর্শক সেবার ক্ষেত্রে- যে প্রতিষ্ঠান একটি প্রকল্পের নকশা করেছে, সে যেন একই প্রকল্পের তদারকির কাজ না পায়। ওষুধ বা সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির মতো পণ্য কেনায় বিধানটি প্রযোজ্যই নয়।

অর্থাৎ একটি ক্রয়কারী সংস্থার বার্ষিক কেনাকাটার কত শতাংশ এক ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানের হাতে যেতে পারে- এ বিষয়ে কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই, স্বয়ংক্রিয় যাচাই নেই, বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার নিয়মও নেই।

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-২: “যোগসাজশ প্রমাণ হয় না কেন”]

তবু প্রশ্নটি মেলায় না। সাতজন দর দিয়েও, চারজন দর দিয়েও- বছর শেষে একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে জমা হয়েছে ৮২ শতাংশ।

প্রশ্নটি তাই যোগসাজশের নয়। প্রশ্নটি হলো, যোগসাজশ ছাড়াই এটা কীভাবে সম্ভব- এবং ব্যবস্থাটি একবারও থামল না কেন?

“জিনিসটা দেখতে একটু অড লুকিং হচ্ছে”

উত্তর খুঁজতে ২৫ জুলাই সকালে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকরাম হোসেনের কার্যালয়ে যাওয়া হয়। তিনি রেখেঢেকে কিছু বলেননি:

“আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেছি না। জিনিসটা দেখতে একটু অড লুকিং হচ্ছে।”

তবে যোগ করেন, এতে তাঁর হাত নেই। কে “রেসপনসিভ” হবেন, সেই সিদ্ধান্ত কার? “রেসপনসিভ তো আমি করব না, ওনারা অফলাইনে মিটিং করে করবে।”

অথচ তিনিই সেই কমিটির প্রধান ও অনুমোদনকারী।

উত্তরটির ভেতরেই ব্যবস্থাটির একটি বড় ফাঁক ধরা পড়ে যায়। ই-জিপি দাম তুলনার কাজটি স্বয়ংক্রিয় করেছে ঠিকই- কিন্তু কে যোগ্য আর কে অযোগ্য, সেই সিদ্ধান্তটি হয় পর্দার বাইরে, কমিটির বৈঠকে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের জায়গাটি ডিজিটাল নয়, অফলাইন।

যেভাবে বৈধভাবেই ৮২ শতাংশ জমে

কীভাবে একজনের হাতে এত বড় অংশ জমতে পারে কোনো নিয়ম না ভেঙেই- তার ব্যাখ্যা মিলল অন্য এক হাসপাতালে, যাঁরা এই মূল্যায়ন কমিটিরও সদস্য।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরীর ভাষায়, বাদ পড়ার প্রধান কারণ অভিজ্ঞতার শর্ত- “নতুন যারা, ওরা তো সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারে না।”

কিন্তু এই ব্যাখ্যা এখানে পুরোপুরি খাটে না। রুম্মান সুলতানার প্রতিষ্ঠান এমএসএম বাংলাদেশ নিজেই নতুন- কোম্পানি প্রোফাইল অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত ২০২০ সালে, অর্থাৎ ছয় বছরের। তবু সেই প্রতিষ্ঠানই একটি হাসপাতালের বার্ষিক ক্রয়ের বড় অংশ পেয়েছে।

অর্থাৎ বাধাটি বয়সের নয়।

আর সহকারী পরিচালক ডা. দেব প্রসাদ চক্রবর্তীর ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে দ্বিতীয় স্তরটি। ই-জিপি নিছক সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেয় না- কেউ ৮০, কেউ ৬০, কেউ ৪০ টাকা দিলে “ইজিপিতে কাজ পেয়ে যাচ্ছে ৬০ টাকা। কারণ সিস্টেম নিজে থেকে ঠিক করে দিচ্ছে- এই কাজ ৪০ টাকায় সম্ভব না।”

অর্থাৎ যাঁরা জানেন সিস্টেম কোন অঙ্কটিকে “যৌক্তিক” ধরবে, তাঁরাই এগিয়ে থাকেন। তাঁর নিজের উপসংহার: “চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৮২ শতাংশ কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এটাই মেকানিজম হতে পারে।”

এই ব্যাখ্যার অন্য প্রান্তে কী দাঁড়ায়, তা জানা যায় একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে।

প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার তৌহিদুল আলম গত দুই বছরে ই-জিপিতে দুই শতাধিক দরপত্রে অংশ নিয়েছেন। কাজ পেয়েছেন একটি।

“প্রতিটি দরপত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচসহ সবকিছু হিসাব করে খুব কম লাভ ধরে দর দিয়েছি,” বলেন তিনি। “তারপরও কাজ পেয়েছি মাত্র একটি।”

অংশ নেওয়ার খরচটাও কম নয়- “আমরা দরপত্রে অংশ নিতে টাকা খরচ করি, কাগজপত্র প্রস্তুত করি, ব্যাংক গ্যারান্টি দিই, লোকবল ও সময় ব্যয় করি। কিন্তু দিনের পর দিন অংশ নিয়ে যদি কাজ না পাই, তাহলে একজন ঠিকাদারের পক্ষে এই প্রক্রিয়ায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে।”

তাঁর আশঙ্কাটি ঠিক এই পর্বের বিষয়ের সঙ্গে মিলে যায়: “এতে শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে হাতে গোনা কিছু ঠিকাদারের মধ্যেই সরকারি কাজ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।”

দুই শতাধিক দরপত্রে একটি কাজ- এটি নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে বেশির ভাগ দরদাতারই হারার কথা, আর তাঁর দর প্রতিবার যৌক্তিক ছিল কি না তা এই প্রতিবেদন যাচাই করেনি।

কিন্তু তাঁর প্রস্তাবটি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শুধু অনলাইনে দরপত্র নেওয়া ও ফল প্রকাশ যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন- “কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে বারবার কাজ পাচ্ছে, কারা নিয়মিত সর্বনিম্ন দরদাতা হচ্ছে, একই ধরনের প্রতিষ্ঠান বা মালিকানার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না- এসব বিষয়ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।”

একজন ঠিকাদারের এই প্রস্তাব আর এই প্রতিবেদনের আবিষ্কার একই জায়গায় এসে মেলে: মালিকানার নামটি রাষ্ট্র প্রকাশ করে, কিন্তু মেলায় না।

স্বয়ংক্রিয়তা তাহলে পুরোনো খেলোয়াড়দের পক্ষেই কাজ করে।

আর প্রশ্নটি ফিরিয়ে দিলেন মূল্যায়ন কমিটিরই সদস্য ইলিয়াছ চৌধুরী, নিজের সহকর্মীর ব্যাখ্যার দিকেই:

“তাহলে আজকে যিনি ইজিপিতে আসছেন, তাকে কেন বঞ্চিত করা হবে? তার অপরাধ কী?”

ঠিকাদারের ভাষ্য

রুম্মান সুলতানা চট্টগ্রামের অন্যতম সক্রিয় নারী ঠিকাদার। উল্লেখ্য, নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিধিতে রাখা সংরক্ষিত কোটা তিনি ব্যবহার করেন না; তাঁর প্রতিষ্ঠান দুটি উন্মুক্ত দরপত্রেই অংশ নেয়।

৮২ শতাংশ কেন- তাঁর যুক্তি প্রস্তুতির। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ই-জিপি সদ্য চালু হয়েছে, স্থানীয় ঠিকাদাররা ব্যবস্থাটি এখনো রপ্ত করতে পারেননি, আর তিনি অভ্যস্ত অনেক আগে থেকেই, “আমার আলাদা দুইটা ইঞ্জিনিয়ার আছে, আমরা সারাদিনই এটা নিয়ে ওয়ার্ক করি।”

দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান কেন? তাঁর ব্যাখ্যা কারিগরি- আমদানি-অনুমতির সীমার কারণে; প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা আইনি সত্তা।

ব্যাখ্যা দুটি যুক্তিসংগত, এবং এর কোনোটির সঙ্গেই এই প্রতিবেদন দ্বিমত করছে না। বরং তাঁর জবাব দুটি মিলিয়ে দেব প্রসাদ চক্রবর্তীর ব্যাখ্যাটিই আরও পোক্ত হয়: ব্যবস্থাটি তাঁদের পুরস্কৃত করে, যাঁরা ব্যবস্থাটি ভালো বোঝেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরটি এসেছে অন্য একটি প্রশ্নে। মূল্যায়ন কমিটি কি জানত, দুই দরদাতার মালিক একই ব্যক্তি?

“কমিটি তো এখানে কিছু না।”

রুম্মানের ব্যাখ্যায়, কমিটি কেবল প্রতিবেদন পাঠায়; দুই কোটি টাকার ওপরের প্যাকেজ অনুমোদন করেন যুগ্মসচিব থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত।

এই একটি বাক্যেই একটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে যায়- মালিকানার প্রশ্নটি অনুমোদনের কোনো স্তরেই ওঠেনি। মন্ত্রণালয় পর্যন্ত একটি ফাইল গেল, একাধিক টেবিল ঘুরল, অথচ দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক যে একজন, এই তথ্যটি কোথাও থামল না।

যেখানে ফাইলটি গিয়েছিল, সেখান থেকে কিছু এল না

প্রশ্নটি তাই মন্ত্রণালয়ের।

৬ আগস্ট ছয়টি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর কাছে; অনুলিপি যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ও মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানের কাছে। সঙ্গে ছয়টি চুক্তির পূর্ণ তালিকা- টেন্ডার আইডি, মূল্য, প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রকৃত মালিকের নাম ও ই-জিপির লিংকসহ।

জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনটি সহজ কথা: মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ক্রয়-প্রস্তাব অনুমোদনের সময় দরদাতার প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হয় কি না; এই চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি কোনো স্তরে নজরে এসেছিল কি না; আর একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দপ্তরের ক্রয়ে অংশ নিলে তা শনাক্ত করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আছে কি না।

১৯ আগস্ট পর্যন্ত তিন ঠিকানার একটি থেকেও জবাব আসেনি।

[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৩: “ছয় প্রশ্ন, শূন্য জবাব”]

মন্ত্রণালয়ের অবস্থান সম্পর্কে যেটুকু জানা যায়, তা এসেছিল আগে- জুন মাসে। জেনারেল হাসপাতালের দরপত্র প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হাসপাতাল অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান তখন জানিয়েছিলেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্টরা লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন; অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বক্তব্যটি বিধিসম্মত এবং স্বাভাবিক। কিন্তু এতে ব্যবস্থাটির একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে যায়: কেউ অভিযোগ না করলে কিছুই হয় না।

অভিযোগ ছিল, তবু ফাইল নড়েনি

তাহলে অভিযোগ করলে?

এই ছয়টি চুক্তি নিয়ে অন্তত চারজন ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

তাঁদের একজন, মেসার্স জম জম এন্টারপ্রাইজের মো. দিদারুল আলম অভিযোগ করেন, তাঁকে “নন-রেসপনসিভ” ঘোষণা করার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চেয়েও হাসপাতাল থেকে লিখিত জবাব পাননি।

অর্থাৎ অভিযোগ ছিল, লিখিতভাবেই ছিল, আর তা পৌঁছেছিল রাষ্ট্রেরই দুটি সংস্থার কাছে।

আর মালিকানার তথ্যটি গোপনও ছিল না। ই-জিপির প্রকাশিত পাতাতেই দুই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক হিসেবে একই নাম লেখা- যে কেউ খুলে দেখতে পারতেন। তথ্যটি রাষ্ট্রের হাতেই ছিল, প্রকাশ্যেই ছিল, আর অভিযোগও দাখিল হয়েছিল রাষ্ট্রেরই কাছে।

তবু ফাইলটি নড়েনি।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম বলেন, “কমিশন না থাকায় নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।”

বিদ্যুতেও একই ছবি- এবং এবার এক দিনে, এক দপ্তরে

ঘটনাটি একটি হাসপাতালের একক ব্যতিক্রম কি না, তা যাচাই করতে একই পরীক্ষা চালানো হয় গোটা তথ্যভান্ডারে। ফল মিলল বিদ্যুৎ খাতে।

এম/এস মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ তিন মাসে পেয়েছে ২২টি চুক্তি। ই-জিপির রেকর্ড অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের মালিক আরেকটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক- এম/এস ইশরাক মোটর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, যার চুক্তি পাঁচটি।

দুটি মিলিয়ে ২৭টি চুক্তি, প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ১০টি দপ্তরজুড়ে।

২৪ মে: এক দিনে চার চুক্তি, তিনটিই ২ লাখের ঠিক নিচে

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি ২৪ মে।

সেদিন বিউবোর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর নিজের দপ্তরে সই হয় তিনটি চুক্তি। প্রধান প্রকৌশলীর দাপ্তরিক গাড়ি মেরামতের কাজ পেল ইশরাক মোটর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস- ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা। একই দপ্তরের প্রিন্টার-ফটোকপিয়ারের টোনার ও কার্তুজ সরবরাহের কাজ পেল মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ- ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা। আর “জরুরি প্রয়োজন মেটাতে” ছাপা ও স্টেশনারি সরবরাহের কাজও পেল মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ- ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা।

তিনটিই ২ লাখের ঠিক নিচে। তিনটিরই কার্যাদেশ ও চুক্তি সই একই দিনে, ২৪ মে।

একই দিনে চতুর্থ আরেকটি চুক্তিও সই হয়- পাহাড়তলী বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে, ১১ কেভি লাইন মেরামতের কাজ, ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪০ টাকা। সেটিও গেল মাহমুদ এন্টারপ্রাইজে।

এক দিনে চার চুক্তি, দুই দপ্তর, দুটি প্রতিষ্ঠান- আর ই-জিপির প্রকাশিত পাতায় দুই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক একজনই।

‘পাঁচজনের উপরে জানানোর কোনো ইয়া নাই’- বিধিতে যা লেখা নেই

দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক ইসমাইল মাহমুদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোটেশন পদ্ধতিতে দপ্তরই ঠিকাদার বেছে নেয়- “পাঁচজনকে আমন্ত্রণ জানায়। বিড করলে যে রেসপন্সিভ হয় তাকে কার্যাদেশ দেয়।”

মাত্র পাঁচজনকে কেন, বেশি নয় কেন- এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল নিশ্চিত: “আরএফকিউতে পাঁচজনের উপরে জানানোর কোনো ইয়া নাই।” বিষয়টি তিনি একাধিকবার বলেন- এটি “শর্ট কোটেশন”, “ইমার্জেন্সি ওয়ার্ক”, তাই পাঁচজনেই সীমাবদ্ধ।

বিধিমালা অবশ্য এমন কোনো সর্বোচ্চ সীমার কথা বলেনি।

পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ৯২(৬)-এ লেখা আছে, ক্রয়কারী “যথাসম্ভব সর্বোচ্চসংখ্যক দরদাতার নিকট হইতে কোটেশন আহ্বান করিবে”, আর দরের প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তি নিশ্চিত করতে “কমপক্ষে ৩(তিন)টি রেসপনসিভ কোটেশন আবশ্যক হইবে”। অর্থাৎ তিনটি সর্বনিম্ন শর্ত- পাঁচটি কোনো ঊর্ধ্বসীমা নয়। বিধি বেশি ডাকতে নিষেধ করেনি, বরং যত বেশি সম্ভব ডাকতে বলেছে।

একই বিধির উপবিধি (৮) আরও স্পষ্ট: “সরবরাহের উৎস সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ক্রয়কারী ইহা নিশ্চিত করিবে যে, একই দরপত্রদাতার নিকট হইতে সর্বদা কোটেশন আহ্বান করা হইবে না।”

তিন মাসে ২৭টি চুক্তি- ২৪টি কোটেশন, ৩টি সীমিত পদ্ধতির।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। প্রতিষ্ঠান দুটির কাজের ধরন আলাদা- ইশরাক মোটর করে যানবাহন মেরামত, আর মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ সরবরাহ করে কাগজ, টোনার ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী। ফলে একই দরপত্রে দুজনের মুখোমুখি হওয়ার কথাও নয়। যোগসাজশের প্রশ্নটি তাই এখানে ওঠে না।

এবার ঠিকাদারের মুখে: ‘এটা অস্বাভাবিক কিছু না’

তবে সেই আলাপেই আরও একটি কথা বলেন ইসমাইল মাহমুদ, যা এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্বের সঙ্গে মিলে যায়।

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, দপ্তর কি আগেভাগে কাজ করিয়ে নিয়ে পরে কোটেশনে বিল পরিশোধ করে- কিছু দপ্তরে এমন চর্চা দেখা যায়।

তাঁর উত্তর: “এরকম তো ইমার্জেন্সি ফ্যাক্টর তো এটা হয়ই, এটা অস্বাভাবিক কিছু না।”

তার মানে আগে কাজ করিয়ে নেওয়া হয়- এ কথা আবার নিশ্চিত করতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা ওরকম আরকি, জি। ওরকম।”

গত পর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন দপ্তরের দিক থেকে- “সারা বছর টুকটাক টুকটাক যাদেরকে দিয়ে কাজ করাইছি, এদেরকে পেমেন্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেক্ট করে দিব।”

দুই ভিন্ন সংস্থা, ভিন্ন খাত, ভিন্ন মানুষ- একই বর্ণনা। একজন কর্মকর্তার দিক থেকে, একজন ঠিকাদারের দিক থেকে।

নিজের প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পাচ্ছে কি না- এই প্রশ্নে অবশ্য তিনি কোনো বিশেষ সুবিধার কথা মানেননি: “আমি পাচ্ছি যে এরকম কোনো বিষয় না। এটা প্রপার ওয়েতে টেন্ডার আহ্বান করে, যে পার্টিসিপেন্ট করে, যে লোয়েস্ট হয় তাকে কাজ দেয়। এখানে ইনটেনশনালি কিছু হয় না।”

প্রশ্নটি ওঠে অন্য জায়গায়- ঘনত্বে।

প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের ওই তিনটি চুক্তির দুটি ছিল কোটেশন পদ্ধতির, একটি সীমিত কোটেশনের। অর্থাৎ সেই পদ্ধতি, যেখানে গত পর্বে দেখা গেছে- কারা দর দিতে পারবেন, সেই তিন থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা বানায় দপ্তর নিজেই। বেছে নেওয়া সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় যদি একই মালিকের দুটি প্রতিষ্ঠানই থাকে, তবে দপ্তরের দুই ধরনের প্রয়োজনই মেটে একই ব্যক্তির হাত ধরে।

আর সেটি এক দিনের ঘটনা নয়। তিন মাসে ওই দুই প্রতিষ্ঠান মিলে বিউবোর ১০টি দপ্তর থেকে পেয়েছে ২৭টি চুক্তি- গাড়ি মেরামত থেকে স্টেশনারি, লাইন মেরামত থেকে ট্রান্সফরমার স্থাপন।

নাম নেই, সই নেই: এক পাতার জবাব

২২ জুলাই বিউবো চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলীকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। আট দিন ও দুই দফা তাগাদার পর ৩০ জুলাই জনসংযোগ বিভাগের ই-মেইল থেকে জবাব এল একটি স্ক্যান করা পাতায়- কোনো প্যাডে নয়, কারও নাম নেই, সই নেই, পদবি নেই।

জবাবে বলা হয়, কোটেশনে “৫টি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানানো হয় এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোটেশন জমা পড়ে”- যা বিধিসম্মত। মালিকানা প্রসঙ্গে জবাব: “মালিকানা যাচাইয়ের জন্য টিন ও বিন এর তথ্যাদির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়… এবং এই ভাবেই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়।”

কোথাও বলা হয়নি দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক আলাদা। তথ্যটি অস্বীকার করা হয়নি; বলা হয়েছে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

আর তাতেই প্রশ্নটি ধারালো হয়। যাচাই সত্যিই হয়ে থাকলে নামটি চোখে পড়ারই কথা- ই-জিপির প্রকাশিত পাতাতেই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে একই নাম লেখা। তাহলে হয় যাচাইটি হয়নি, নয় হয়েছে এবং তবু পাশাপাশি চুক্তি দেওয়া হয়েছে।

জবাবে কোনোটিই স্পষ্ট হয়নি। আর জবাবটি কার, তা-ও জানা যায়নি। জবাবদিহি চাইতে গিয়ে যা মিলল, তা জবাব- জবাবদিহি নয়।

কোটেশন পদ্ধতির অপপ্রয়োগ ঠেকানোর দায়িত্ব বিধিতে সুনির্দিষ্টভাবে একজনের ওপর দেওয়া আছে। বিধি ৯০(২) বলছে, “অপপ্রয়োগ রোধ নিশ্চিতকল্পে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান কোটেশন প্রদানের অনুরোধ জ্ঞাপন পদ্ধতি প্রয়োগ যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করিবেন।”

বিউবোর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদকে আজ ১৯ আগস্ট দুপুরে একাধিকবার ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি; একবার সংযোগ কেটে দেন।

এর আগে ১২ আগস্ট বিউবোর প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ২৭টি দরপত্রের উন্মুক্তকরণ শিট, দরদাতাদের তালিকা এবং দুই প্রতিষ্ঠান কখনো একই দরপত্রে অংশ নিয়েছিল কি না- এই তথ্যগুলো চেয়ে লিখিত আবেদন পাঠানো হয়; জবাব চাওয়া হয় ১৬ আগস্টের মধ্যে।

১৯ আগস্ট পর্যন্ত এই প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব আসেনি।

যে ঘরটি রাষ্ট্র নিজে লিখেছে, নিজেই পড়ে না

দুটি ঘটনার মধ্যে মিল কেবল ধরনে নয়, ফাঁকটিতেও।

নতুন ক্রয়বিধিমালা ঠিক এই সমস্যাটি ঠেকাতেই প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার ঘরটি যুক্ত করেছে- যাতে কাগজে ভিন্ন নাম থাকলেও পেছনের মানুষটি চেনা যায়। ঘরটি পূরণও হয়েছে; চট্টগ্রামে ১০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বের ৯৫৯টি চুক্তির ৯৫৭টিতেই তথ্যটি আছে।

কিন্তু তথ্যটি কেবল লেখা হয়- মেলানো হয় না।

ই-জিপি একই ঠিকাদারের পরপর চুক্তি গোনে না; একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান একই দপ্তরের ক্রয়ে এলে সতর্কঘণ্টা বাজায় না; মূল্যায়ন কমিটির সামনে “এই দুই দরদাতার প্রকৃত মালিক একজন” এমন কোনো বার্তা ভেসে ওঠে না। মালিকানার ঘরটি একটি সংরক্ষণাগার, যাচাইয়ের যন্ত্র নয়।

এই ফাঁকটির একটি নাম আছে অন্য দেশের ক্রয়ব্যবস্থায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রয়-নির্দেশিকা ও বিশ্বব্যাংকের ক্রয়-কাঠামোয় “ইকোনমিক অপারেটর গ্রুপ” ধারণাটি আছে- প্রতিযোগিতা যাচাইয়ের সময় একই মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠানকে একটিই সত্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।

আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশ ২০২৫ সালের সংস্কারে সেদিকে প্রথম পদক্ষেপটি নিয়েছে- মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু সেই তথ্য দিয়ে কী করতে হবে, সেই নিয়মটি এখনো লেখা হয়নি।

তাঁর ভাষায়, এটি “অর্ধেক সংস্কার”।

ফলে দায়িত্বটি ছড়িয়ে পড়ে- এবং কারও কাঁধেই বসে না। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলছেন সিদ্ধান্ত কমিটির; ঠিকাদার বলছেন “কমিটি তো এখানে কিছু না”, সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের; মন্ত্রণালয় বলছে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; আর বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে যাচাই হয়েছে, তবে বলছে নাম-সইবিহীন এক পাতায়।

প্রত্যেকেই নিজের সীমানার ভেতরে সঠিক। আর সীমানাগুলোর মাঝখানে যে ফাঁকটি পড়ে থাকে, সেখান দিয়েই বেরিয়ে যায় ৭ কোটি ৬০ লাখ।

রুম্মান সুলতানার বাক্যটি আরেকবার পড়া যাক: “এটা ১০০% পেতে পারি আমি।”

কথাটি অহংকারের নয়, পর্যবেক্ষণের। তিনি ব্যবস্থাটি ঠিকই পড়তে পেরেছেন এবং তাঁর পড়াটি নির্ভুল। কোনো নিয়ম না ভেঙে, কোনো যোগসাজশ ছাড়াই, একজনের হাতে একটি সরকারি হাসপাতালের প্রায় গোটা বার্ষিক ক্রয় চলে আসা সম্ভব।

কিন্তু ব্যবস্থার এই ব্যর্থতার দাম কে মেটায়, তা বোঝা যায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দাঁড়ালে।

৩০ মে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে এসেছিলেন পোশাক কারখানার কর্মী রাবেয়া বেগম, সঙ্গে আট বছরের ছেলে সিয়াম। ২৩ মে সকালে রাস্তার একটি বেওয়ারিশ কুকুর সিয়ামের পায়ে কামড় বসিয়েছিল। প্রথম দুটি ডোজ তিনি নিয়েছিলেন হাজারী গলির এক ফার্মেসি থেকে, প্রতিটির দাম ৫০০ টাকা। তৃতীয় ডোজের সময় খবর পান, সরকারি হাসপাতালে এটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

জরুরি বিভাগ থেকে তাঁকে বলা হয়, বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে।

“আমার সারা দিনের রোজগার তিনশ টাকা,” বলছিলেন রাবেয়া বেগম। “আর উনারা আমাকে ৫০০ টাকার ভ্যাকসিন বাইরে থেকে কিনে আনতে বললেন। আমি এত টাকা পাব কোথায়? আন্দরকিল্লা হাসপাতালে যদি আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য কুকুর কামড়ানো ইনজেকশন না থাকে, তাহলে এত বড় হাসপাতাল দিয়ে কী লাভ?”

সেদিন টাকা ধার করে ছেলের ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল তাঁকে।

এবার তারিখগুলো পাশাপাশি রাখা যাক।

ওষুধ ও র‍্যাবিস ভ্যাকসিনের ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার চুক্তিটি সই হয়েছিল ৬ মে। রাবেয়া বেগম খালি হাতে ফিরেছেন ৩০ মে- চুক্তির ২৪ দিন পর। আর স্টোর রেজিস্টার অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন হাসপাতালে পৌঁছে দেয় ২৩ জুন- আরও ২৪ দিন পরে।

সরকারের খাতায় ভ্যাকসিন “কেনা” হয়ে গিয়েছিল ৬ মে। হাসপাতালের তাকে তা এসেছে ৪৮ দিন পরে। মাঝখানের ওই সময়টাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রাবেয়া বেগম।

চুক্তিতে কাজ শেষের প্রস্তাবিত তারিখ ছিল ১০ জুন; স্টোর রেজিস্টার বলছে ভ্যাকসিন এসেছে ২৩ জুন- ১৩ দিন পরে। এ বিষয়ে হাসপাতাল বা সরবরাহকারীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে জরুরি বিভাগে দাঁড়ানো একজন মায়ের কাছে কাগজের তারিখটি কোনো অর্থ বহন করে না। তাঁর কাছে সত্য একটাই- সেদিন ইনজেকশনটি ছিল না।

সংকটটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অস্বীকার করেনি। ২৫ জুলাই নিজের কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, “হ্যাঁ, ভ্যাকসিন কেনার আগে সংকট ছিল, ভাগ করে দিতে হয়েছিল। ওষুধ বলেন, ভ্যাকসিন বলেন, যার যতটুকু প্রয়োজন তা দেওয়া যায়নি। এখন সেই সমস্যা নাই।”

এই পর্বের গোটা হিসাবটি- ছয় চুক্তি, ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, দুই প্রতিষ্ঠান, এক মালিক- শেষ পর্যন্ত এই একটি প্রশ্নেই এসে দাঁড়ায়: কে সরবরাহ করবেন, কত দামে, কতজনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, আর কত দ্রুত।

রাবেয়া বেগম এসবের কিছুই জানেন না। তাঁর জানার কথাও নয়। জানার কথা ছিল রাষ্ট্রের- যে নিজেই নামটি লিখে রেখেছিল।

আগামীকাল পড়ুন:চুক্তির আগেই ১৪৪ প্রকল্পের কাজ শেষ!’

প্রথম পর্ব পড়ুন: ২৪৮ জন বনাম ২ জন: যে তুলনাটা আর কেউ করতে পারবেন না

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: ‘তিন থেকে পাঁচটা লাইসেন্স আমরাই বেছে দিই, অন্য কেউ দেখবেও না’


সরকারি কেনাকাটার ছয় ধাপ

সরকারি কেনাকাটার ছয়টি ধাপ পরপর ঘটার কথা: প্রথমে দরপত্র আহ্বান, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন প্রকাশ। এরপর দাখিল ও মূল্যায়ন- কে যোগ্য, কার দর কত। তারপর চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ বা কার্যাদেশ (এনওএ; কথ্য ভাষায় বলা হয় “নোয়া”)- কাকে কাজ দেওয়া হলো, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর পরের ধাপ কার্যসম্পাদন জামানত (পিজি)- ঠিকাদারের জমা দেওয়া টাকা, যা কাজ না করলে বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত ব্যাংকে যাচাই হওয়ার পরই হয় চুক্তি স্বাক্ষর। আর সবশেষে শুরু হয় কাজ।

সহজ কথায়: আগে কাগজ, পরে কাজ। এই ক্রম উল্টে গেলে কী দাঁড়ায়- সেটিই এই সিরিজের বিষয়।

[এই অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া প্রতিটি চুক্তির টেন্ডার আইডি, সংকেতের (খটকা) হিসাব ও আর্কাইভ লিংকসহ পূর্ণ তথ্যভান্ডার প্রকাশিত হবে সিরিজের শেষ (পঞ্চম) পর্বের সঙ্গে, একসঙ্গে- যাতে পাঠক পুরো সিরিজের প্রতিটি দাবি নিজে মিলিয়ে দেখতে পারেন।]