তিন কাগজ, তিন উত্তর: ‘রক্ষী’র চুক্তিতে বন্দর যা পাঠাল


চট্টগ্রাম বন্দরের “রক্ষী” নামের জাহাজটির ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ সরবরাহের চুক্তিতে কার্যাদেশ, জামানত, ব্যাংক-যাচাই ও চুক্তি সই- সবই এক দিনে, ২৯ এপ্রিল ২০২৬। এক দিনে গোটা প্রক্রিয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নই ছিল।

প্রথম প্রতিক্রিয়া। ৩ আগস্ট টেলিফোনে বন্দরের ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার (মেরিন) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “না না একদিনে না, একদিনে হয় নাই, একদিনে হবে না।” সরকারি নথিতে দুটি তারিখই এক- জানানোর পর তিনি থামেন: “তাইলে তো এটা ভুল হচ্ছে কিনা।” সেদিন তিনি অসুস্থতার ছুটিতে, ফাইল হাতে ছিল না।

পরদিন সংশোধন। ৪ আগস্ট নথি হাতে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন এবং আগের দিনের বক্তব্য সংশোধন করেন- প্রক্রিয়াটি সত্যিই এক দিনে হয়েছে, কিন্তু বিধি লঙ্ঘিত হয়নি। এবং তিনি কাগজ পাঠান।

কাগজ এক: চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ। দরপত্র উন্মুক্তকরণ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫; জামানতের অঙ্ক ১৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৫০ টাকা, দাখিলের শেষ দিন ১০ মে; চুক্তি সইয়ের শেষ দিন ১৩ মে। ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের তারিখ ২৯ এপ্রিল। অর্থাৎ আইন যে সময়টুকু দিয়েছিল, তার ভেতরেই সব হয়েছে- শেষ দিনের এগারো দিন আগে।

কাগজ দুই: ই-জিপির “পেমেন্ট ডিটেইলস” পাতা। পূবালী ব্যাংক পিএলসি, পোর্ট শাখা; পে-অর্ডার নম্বর ওএফএ ৩৭৮৪৭২; ইস্যু ২৯ এপ্রিল ২০২৬, মেয়াদ ২৬ এপ্রিল ২০২৯। পরিশোধ ২৯ এপ্রিল, বিকেল ৩টা ৩ মিনিট। স্ট্যাটাস: পেইড।

কাগজ তিন: দরদাতা ছিলেন সাতজন, সাতজনই গ্রহণযোগ্য।

কেন এত দ্রুত। আগে নোটিশ পাওয়ার পর ঠিকাদারকে ব্যাংকে গিয়ে পে-অর্ডার কাটতে হতো; এখন ব্যাংক ইলেকট্রনিকভাবে জামানত পাঠায়- “নোয়া দিছি সাথে সাথে উনি ব্যাংকে বলে দিছে, ব্যাংকে এই পাঁচ মিনিটের ভিতর পিজি দিয়ে দিতে পারবে।” অনুমোদনের ধাপগুলো হয় ডি-নথিতে।

তাড়াহুড়োর কারণ। জাহাজটির ইঞ্জিন বহু পুরোনো। “ইঞ্জিনের সমস্যা দিলে কালো ধোঁয়া দিচ্ছে, এটা ইঞ্জিন আগুন ধরে যেতে পারে।” যন্ত্রাংশ বাজারে মেলে না, নতুন করে বানাতে হয়। জাহাজটি চলছে অন্য ইঞ্জিনে, “কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে একদম অচল হয়ে যেতে পারে।”

প্রাতিষ্ঠানিক জবাব। ১০ আগস্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের সইয়ে স্মারকমূলে লিখিত জবাব আসে- গ্রহণযোগ্য দরদাতা সাতজন, জামানত ২৯ এপ্রিল প্রদান ও ব্যাংক-অনুমোদিত হয়ে সেদিনই ই-জিপিতে আপলোড, পুরো প্রক্রিয়া ডি-নথিতে অনুমোদিত, “এতে কোনো নিয়ম ব্যত্যয় ঘটেনি”। শুরুর তারিখ প্রসঙ্গে চিঠিতে লেখা- “দরপত্র দলিলে কাজ শুরুর প্রস্তাবিত তারিখটি ছিল একটি সম্ভাব্য বা আনুমানিক সময়সূচি।”

যে প্রশ্নটি রয়ে গেল। ব্যাখ্যাটি দরপত্র আহ্বানের পর্যায়ে সত্য হতে পারে। কিন্তু একই পাতার, একই ব্লকের ঠিক পাশের ঘরে চুক্তি সইয়ের তারিখ লেখা আছে ২৯ এপ্রিল- নির্ভুল, সেদিনই বসানো। প্রশ্নটা তাই “শুরুর তারিখ কেন ভুল” নয়। প্রশ্নটা হলো- যে মুহূর্তে সঠিক সইয়ের তারিখ বসছে, ঠিক তার পাশের পুরোনো অনুমানটি মুছে যায় না কেন? আর নাগরিকের পাতায় “সম্ভাব্য” বা “আনুমানিক”- এই শব্দ দুটির একটিও লেখা নেই।

মূল প্রতিবেদন: সরকারি কেনাকাটা: তারিখ যা খুশি লেখা যায়, কেউ আটকায় না