
২৯ জুলাই, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন আহমেদ এই দপ্তরের ই-জিপি ব্যবস্থার হাত। দপ্তর প্রধানের আইডি দিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনিই দরপত্র তোলেন, মূল্যায়নের নথি ওঠান, চুক্তির স্ট্যাম্প-কপি আপলোড করেন। কাজের চাপ কেমন? “কালকে আমি প্রায় ৩০টার মতো সাইন করছি, একদিনে।”
কথা শুরু হলো আত্মবিশ্বাস দিয়ে- “পিপিআর ভায়োলেট করলে এটা তো ফাঁসি হয়ে যাবে।”
তারপর একটি নির্দিষ্ট চুক্তির কথা উঠল। হাটহাজারীর গাউছিয়া মনিরিয়া মাদ্রাসা- কার্যাদেশ ৩ মে, চুক্তি সই ১৩ মে, আর নথিতে কাজ শুরু ও শেষ দুটোই ১ এপ্রিল।
দপ্তর প্রধানের আইডি দিয়ে খুলে তিনি দেখালেন, ‘সব ঠিক আছে’; ভেতরের নথিতে লেখা ৩ মে থেকে ২৯ অক্টোবর। সমস্যাটা কোথায়, ধরতে পারছিলেন না।
তখন অনুরোধ করা হলো- লগ-আউট করে, নাগরিক যেভাবে দেখেন সেভাবে দেখতে।
তিনি লগ-আউট করলেন। টেন্ডার আইডি বসালেন। পাতাটি খুলল।
কয়েক সেকেন্ড পর তিনি নিজেই পড়তে শুরু করলেন, প্রায় স্বগতোক্তির মতো:
“নোয়া ডেট ৩ মে। কন্ট্রাক্ট সাইনিং ১৩ মে। প্রপোজড ডেট অব কন্ট্র্যাক্ট স্টার্ট- ১ এপ্রিল। ১ এপ্রিল।”
একটি বিরতি। তারপর: “মানে এটা তো এরকম আসার কথা না। যেহেতু নোয়া এত তারিখে, সাইন এত তারিখে- কাজ শুরু হবে তো ১৩ মে-র পরে থাকার কথা।”
এই মুহূর্তটির ওজন বুঝতে একটি বাক্যই যথেষ্ট, যা তিনি তার আগেই বলেছিলেন:
“এই জিনিস আমি জীবনেও খুলে দেখি নাই। এগুলা তো আমার দেখার প্রয়োজন নাই।”
দশ বছরের বেশি সময় ধরে যিনি এই দপ্তরের প্রতিটি চুক্তি ই-জিপিতে তুলেছেন, তিনি কখনো লগ-আউট করে দেখেননি নাগরিক কী দেখছেন।
প্রয়োজনই পড়েনি।
[সরকারি কেনাকাটার ডিজিটাল ব্যবস্থা ই-জিপি বানানো হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসের (২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে) ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির প্রতিটি নথি এক এক করে পড়ে দেখেছেন এ প্রতিবেদক; মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ১৪ ধরনের যাচাই মিলিয়ে ১ হাজার ৬৪৯টি চুক্তিতেই অন্তত একটি “খটকা” বা “সতর্ক সংকেত” মিলেছে- খটকা মানে প্রমাণিত দুর্নীতি নয়, প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ শেষ পর্ব।]
ভুলটা কোথা থেকে এল
এরপর তিনি নিজেই পর্দায় খুঁজতে লাগলেন, গোলমালটা কোথায়।
“এই কাজটা আমরা ই-জিপিতে কনফিগার করে দিই নাই,” বললেন। ব্যাখ্যাটি কারিগরি, কিন্তু সহজ: চুক্তির তথ্য তোলার পর ই-জিপির ভেতরে সিএমএস নামের একটি অংশে গিয়ে কাজ শুরুর প্রকৃত তারিখ বসিয়ে দিতে হয়। কিন্তু- “এগুলো আমরা কাজ করি নাই। আমাদের এত পরিমাণ ভলিউম, আমরা এই জিনিসগুলো কনফিগার করার টাইম পাই নাই।”
তাহলে ঘরটিতে ১ এপ্রিল এল কোথা থেকে? দরপত্র পর্যায়ের আনুমানিক তারিখটিই থেকে গেছে- “এই তারিখটা বাই ডিফল্ট রয়ে গেছিল।”
ডিফল্ট মান কীভাবে কাজ করে, তার উদাহরণও দিলেন: ঘর পূরণ না থাকলে প্রকাশের সময় বসে যায় এক অদ্ভুত সাল- “ডাটা ফিলাপ না করলে ওইটাতে লেখা উঠে থাকে ১৯৭০ সাল… এটা কিন্তু রিয়েল না।”
তাঁর মতে, কম্পিউটারের হিসাবে ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি সময়ের শূন্য বিন্দু- কোনো তারিখ না পেলে যন্ত্র সেখানেই ফিরে যায়।
অর্থাৎ ঘর ফাঁকা থাকলে ব্যবস্থাটি ফাঁকা দেখায় না; নিজে থেকে একটি সংখ্যা বসিয়ে দেয়। নাগরিকের পক্ষে বোঝার উপায় থাকে না, সংখ্যাটি মানুষের বসানো নাকি যন্ত্রের।
আর সিস্টেম কোনো বাধাও দেয়নি। তিনি জানেন ব্যবস্থাটি অন্যত্র কত কড়া- নির্ধারিত সময়ের কম সময়ের জন্য দরপত্র প্রকাশ করতে গেলে ই-জিপি সাফ আটকে দেয়, “সিস্টেমে বাধা দিবে।”
কিন্তু এখানে? “এক তারিখ (এপ্রিল) কেমনে… এটা আমারে ধরে নাই। ধরে নাই।”
তাঁর উপসংহার ছিল অন-রেকর্ড: “ই-জিপি যে ১০০ পার্সেন্ট অ্যাকুরেট- তা না। এখানে বাগ আছে… লজিকটা এখানে ঠিক করে দেয় নাই।”
সংশোধনের চেষ্টা হলো, হলো না
এরপর যা হলো, তা এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মোড়।
“আপনাকে এটা আমি এখন ঠিক করে দিচ্ছি, দেখেন।”
সিএমএসে ঢুকে মাদ্রাসার চুক্তিটি খুলে তিনি হিসাব করলেন- চুক্তি ১৩ মে, মেয়াদ ছয় মাস, সমাপ্তি ১৩ নভেম্বর। তারিখ দুটি বসালেন, নথি সংযুক্ত করলেন, সংরক্ষণ করলেন। পর্দায় নিশ্চিতকরণ এল।
“হ্যাঁ, এটা ডান,” বললেন তিনি। “এখন সিস্টেম আপডেট হইছে।”
তারপর দুজনে মিলে আবার লগ-আউট করা হলো। নাগরিক যে পাতাটি দেখেন, সেটি আবার খোলা হলো।
তারিখটি বদলায়নি। প্রকাশিত পাতায় তখনো লেখা- কাজ শুরু ১ এপ্রিল ২০২৬।
দপ্তরের ভেতরের ব্যবস্থায় সংশোধন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু নাগরিকের পাতায় পুরোনো ভুলটিই রয়ে গেছে। ভেতরে এক তথ্য, বাইরে আরেক- আর বাইরেরটিই একমাত্র সংস্করণ, যা নিরীক্ষক, গবেষক বা সাধারণ মানুষ দেখতে পান।
তাঁর নিজের মূল্যায়ন: “এডিট করার ব্যবস্থা রাখা উচিত, সংশোধনের অপশনটা।”
এক ঘণ্টার এই আলোচনায় চারটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রকাশিত পাতার তারিখটি ভুল। ভুলটি হয়েছে প্রকৃত তারিখ না বসানোয়। ই-জিপির যাচাই-ব্যবস্থা তা আটকায়নি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: “ভুল ধরা পড়ার পরও, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চেষ্টা করার পরও, প্রকাশিত পাতা থেকে তা মুছল না।”
ব্যাখ্যাটি পরে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছেন ব্যবস্থাটির কারিগরি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা নিজেই। ২ আগস্ট টেলিফোনে বিপিপিএর সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, “ওইটা ওই যে নোটিশে… আগে যেটা ছিল সেই নোটিশেরটাই পাবলিশ হয়েছে আরকি।” সমাধানের কথাও বলেন: “ওটা দেখি ঠিক করে দিতে বলবো, যাতে ওইটা রাইট ডেটটা আসে।”
কবে নাগাদ, জানা যায়নি। ততক্ষণ ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের খাতায় লেখা থাকবে সেই একই তারিখ- ১ এপ্রিল ২০২৬।
টাকার তালা আছে, তারিখের তালা নেই
ব্যবস্থাটি যে কড়া হতে পারে, তার প্রমাণও এই অনুসন্ধানেই মিলেছে এবং সেটি সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।
চট্টগ্রাম বন্দরের “রক্ষী” নামের একটি জাহাজের ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশের চুক্তিতে কার্যাদেশ, জামানত, ব্যাংক-যাচাই ও চুক্তি সই- সবই হয়েছে এক দিনে, ২৯ এপ্রিল। প্রশ্ন তোলার পর বন্দরের ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার (মেরিন) মো. জসিম উদ্দিন পরদিনই কাগজ পাঠান, আর ১০ আগস্ট বন্দর সচিবের সইয়ে আসে স্মারকমূলে লিখিত জবাব।
কাগজে সব মেলে। জামানত ১৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৫০ টাকা, পূবালী ব্যাংক পোর্ট শাখা, পরিশোধ ২৯ এপ্রিল বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে। দরদাতা ছিলেন সাতজন, সাতজনই গ্রহণযোগ্য। অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ ডি-নথিতে।
কেন এত নিখুঁত? জসিম উদ্দিনের ব্যাখ্যাটি নিরঙ্কুশ: “ব্যাংক থেকে যদি পিজি না দেয় তাহলে এটা কন্টাক্ট লোড করতে পারবে না। ওই ট্যাবটা আসবে না। কারণ এটা ব্যাংক থেকে অটো সিগন্যাল। এখানে পিজি দুই নাম্বারি করার অথবা না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
অনুমোদনেও একই কড়াকড়ি- “ডি-নথি, এটা আমাদের ব্যাকডেটে করার কোনো সুযোগ নাই।”
অর্থাৎ জামানত না এলে পরের ধাপের বোতামই আসে না। ব্যাকডেট করার পথ বন্ধ। ব্যাংকের সংকেত না পেলে চুক্তি লোড হয় না।
সেই একই ব্যবস্থা চুক্তি সইয়ের পাঁচ মাস আগের তারিখে “কাজ শেষ” লেখা দেখে থামে না। একটিও প্রশ্ন করে না, কারণ দর্শাতে বলে না, ঊর্ধ্বতনের অনুমোদন চায় না।
এক জেলার তিন মাসেই তা ঘটেছে ১৪৪ বার; আর কাজ শুরুর তারিখ চুক্তির আগে পড়েছে ৯৫৪ বার।
টাকার তালা আছে। তারিখের তালা নেই।
আর ওই রক্ষীর চুক্তিতেও নাগরিকের পাতায় জামানতের তারিখ নেই, ব্যাংক-অনুমোদনের সময় নেই, সাতজন দরদাতার সংখ্যাটিও নেই। যা আছে, তা একটি বাক্য- কাজ শুরু ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, যা কখনো ঘটেনি।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-১: “তিন কাগজ, তিন উত্তর”]
দুই স্তরের যাচাই, দুই স্তরেই অন্ধ
তাহলে ভুলটি ধরা পড়ে না কেন? উত্তর খুঁজতে হয় দুই জায়গায়- টাকা ছাড়ার আগে যে যাচাই, আর ব্যয়ের পরে যে নিরীক্ষা।
প্রথমটি হয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের অধীন বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে। ৯ আগস্ট সকালে চট্টগ্রামের সেই দপ্তরে গেলে উপ-বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক জয়শ্রী মজুমদার রশ্মি দপ্তরটির সীমারেখা স্পষ্ট করে দেন।
“আমাদের কাজ হচ্ছে প্রি-অডিট করা। প্রি-অডিটের কাজ কী? ডকুমেন্টেশন ঠিক আছে কিনা।” কার্যাদেশ আছে কি না, চুক্তি আছে কি না, স্ট্যাম্প ঠিক আছে কি না, ডিডিও সই করেছেন কি না- “এগুলো দেখার পরে আমরা জাস্ট বিলটা পাশ করছি।”
আর মাঠে কাজটি সত্যিই হয়েছে কি না? “সাইট ভিজিট করে… তারা কাজ কতটুকু করেছে- সেগুলো তো আমাদের দেখার বিষয় না।”
বিল পাশের সময় পরিমাপ বহি আর ই-জিপির তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়? উত্তরটি এক বাক্যে: “না, আমাদের ওটা দেখার কোনো সুযোগ নাই।”
কেন নেই, তারও যুক্তি আছে। বিল আসে ক্রয়কারী দপ্তরের আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তার (ডিডিও) সই নিয়ে, যিনি লিখে দেন কতটুকু কাজ হয়েছে। “তিনি একজন গেজেটেড অফিসার, ফার্স্ট ক্লাস কর্মচারী। তিনি যখন একজন মেজারমেন্ট কর্মকর্তা লিখে দেন কাজ হয়েছে, আমাদের এর চাইতে বেশি ভেরিফাই করার আর সুযোগ নাই।”
অর্থাৎ টাকা ছাড়ার স্তরে ই-জিপির প্রকাশিত পাতাটি কেউ খোলেই না।
দ্বিতীয় স্তরটি নিরীক্ষার। একই দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান নিরীক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ্ জাহানকে জিজ্ঞেস করা হয়, নিরীক্ষায় ই-জিপির চুক্তি-পাতার তথ্য প্রামাণ্য ধরা হয় কি না।
তাঁর জবাব সরাসরি: “আমরা তো সাধারণত অফলাইনে যেগুলো থাকে এগুলোই নিই। আর অনলাইনে যেটা থাকে সেটা তো প্রিন্ট করে পরে অফলাইনে ফাইলে রাখে। আমরা ফাইল থেকেই অডিট করি।”
ই-জিপির তথ্য নিরীক্ষায় ওঠে- তবে পোর্টাল থেকে নয়, ফাইলে রাখা প্রিন্ট থেকে। আর ফাইলে কোন পাতাগুলো যাবে, তা বেছে দেয় নিরীক্ষিত দপ্তরই।
ফলে কাগজের ফাইল ঠিক থাকলে নাগরিকের পাতায় ভুল তারিখ বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের তিন মাসে চুক্তির আগেই কাজ “শেষ” দেখানো ১৪৪টি চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি- ৫৮টি চট্টগ্রাম বন্দরেরই। বন্দরের নিজস্ব নিরীক্ষা বিভাগ আছে, প্রতি বছর নিরীক্ষা হয়। তবু ৫৮টি উল্টো তারিখের একটিও এখনও ধরা পড়েনি।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-২: “ফাইল থেকেই অডিট করি”]
যে পাতাটি কেউ দেখেন না
এই অন্ধত্ব একটি দপ্তরের নয়।
অনুসন্ধানের শেষ দিনগুলোতে তিনটি ভিন্ন দপ্তরের তিনজন কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া পাশাপাশি রাখলে একটি ধরন দাঁড়িয়ে যায়।
শিক্ষা প্রকৌশলের জামাল উদ্দীন আহমেদ- “এই জিনিস আমি জীবনেও খুলে দেখি নাই।”
গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান ইবনে কামাল নিজের দপ্তরের নথি মিলিয়ে দেখেছেন কেবল সাংবাদিক লিংক পাঠানোর পর- “আপনি দেওয়ার পর আমি চেক করে দেখলাম।”
আর বন্দরের জসিম উদ্দিন জানতেনই না যে চুক্তি প্রকাশের সময় তারিখের ঘরটি সংশোধন করা যায়। জানার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া- “আচ্ছা, এটা কন্ট্রাক্ট লোড করার সময় চেঞ্জ করে দেওয়া যায় এটা?”
তিন দপ্তর, তিন স্তর, একই ফাঁক: যে পাতাটি নাগরিক দেখেন, সেটি দপ্তরের কেউ দেখেন না। ভুলটি তাই ধরা পড়ে না- কারণ কেউ তাকায় না।
আর ব্যবস্থাটির বাইরে, কাগজে হওয়া চুক্তিতে ছবিটা আরও অন্ধকার। সেখানে ঠিকাদারের নামের ঘরে বসে থাকে শুধু একটি সংখ্যা- “৩”। এক জায়গায় পৌরসভা কাজটি দিয়েছে পৌরসভাকেই।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৩: ঠিকাদারের নামের ঘরে ‘৩’]
যা ঠিক করতে নতুন কোনো আইন লাগবে না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হয়তো এটাই।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি আইন ২০২৩-এর ধারা ৯-এ বিপিপিএর দায়িত্বের তালিকায় এরই মধ্যে লেখা আছে- ক্রয় আইনের “প্রতিপালন নিশ্চিতকরণ, পরিবীক্ষণ”; “তথ্য, উপাত্ত ও তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ ও ব্যবহার”; এমনকি প্রয়োজনে ক্রয়কারীর নথি “পরিদর্শন ও পর্যালোচনাকরণ”।
দায়িত্বগুলো আছে। নেই কেবল বাস্তবায়নের পাঁচটি পদক্ষেপ- যেগুলোর সমর্থন এসেছে ব্যবস্থাটি যাঁরা প্রতিদিন চালান, তাঁদের কাছ থেকেই।
এক: তথ্য ঢোকার মুখে যুক্তি-বাধা। চুক্তি সইয়ের আগের “শুরু” বা “শেষ” তারিখ, ফাঁকা বা সংখ্যা-মাত্র ঠিকাদারের নাম, একক-ভুল মূল্য– এসব নিয়ে চুক্তি প্রকাশই যেন না হয়; হতে হলে কারণ লিখে ঊর্ধ্বতনের অনুমোদন লাগবে।
দুই: স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা। এক দপ্তরের এক দিনে গুচ্ছ চুক্তি, একই ঠিকাদারের পুনরাবৃত্তি, অনুমোদন-সীমার ঠিক নিচে বারবার থামা মূল্য, একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান, ৩০ জুনে গণসমাপ্তি- এই ধরনগুলো সিস্টেম নিজেই গুনে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ও মহাহিসাব-নিরীক্ষকের দপ্তরকে জানাবে। এই সিরিজ সাধারণ স্প্রেডশিটে যে হিসাব করেছে, রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের পক্ষে তা প্রতি রাতে করা সম্ভব।
তিন: উন্মুক্ত, বিশ্লেষণযোগ্য ডাটা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ওসিডিএস অনুসরণ করে ই-জিপির তথ্য এক ক্লিকে নামানোর যোগ্য ফরম্যাটে প্রকাশ- যাতে নাগরিক, গবেষক বা নিরীক্ষককে ৮৩ হাজার সারি হাতে ঘাঁটতে না হয়।
চার: অপরিবর্তনীয় রেকর্ড। প্রতিটি চুক্তি-তথ্যের সংস্করণ-ইতিহাস স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ, যাতে সংশোধন সম্ভব থাকে কিন্তু নীরব মুছে-ফেলা অসম্ভব হয়। বিআইটিআইডি হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইফতেখার আহম্মদের ভাষায়: “আপনি এডিট করতে পারবেন, কিন্তু এডিট হিস্ট্রিটা থাকবে। কোন সময় কী করছে, কে এডিট করছে, কোন আইডি থেকে- ব্যাস, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা নাই।”
পাঁচ: আইটেম-ভিত্তিক দর প্রকাশ। বহু-আইটেমের দরপত্রে সিস্টেম কেবল সমষ্টিগত প্রাক্কলন দেখায়; ফলে দরদাতা এক আইটেমে দর কমিয়ে আরেকটিতে বাড়িয়ে দিলেও সমষ্টি মিলে যায়। কৌশলটির নাম “ফ্রন্ট লোডিং”; প্রতিকার পিপিআরেই আছে। তবু তা কাজে লাগাতে আগে জানতে হবে কোন আইটেমে কত দর পড়েছে- আর সেটি জানার প্রকাশ্য পথই ই-জিপিতে নেই।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৪: “পাঁচ প্রস্তাব: কে কী বলেছেন”]
ব্যবস্থাটি যে একেবারে অচল নয়, তার প্রমাণও আছে।
বিপিপিএ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ১৩টি জাতীয় সংস্থার ক্রয়-কার্যক্রমের পুনরীক্ষণ (পোস্ট-প্রকিউরমেন্ট রিভিউ) করিয়েছিল। প্রতিবেদনগুলো সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিতও হয়েছে- একই দিনে, ৯ জুলাই ২০২৫।
তালিকাটি তাৎপর্যপূর্ণ। ওই ১৩টির মধ্যে আটটিই এই সিরিজে বারবার এসেছে- শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ রেলওয়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
অর্থাৎ যাচাইয়ের যন্ত্রটি আছে, চালানোও হয়েছে, এবং ফলাফল প্রকাশও করা হয়েছে।
কিন্তু বিপিপিএর ওই পাতায় এর আগের বা পরের কোনো অর্থবছরের প্রতিবেদন নেই। একবার হয়েছে- তারপর আর নয়।
অথচ এটি ঐচ্ছিক নয়।
পিপিআর ২০২৫-এর অংশ-৮-এ এই পুনরীক্ষণের জন্য আলাদা বিধান আছে। বিধি ৬৩(১) ও তফসিল-২ অনুযায়ী, কোনো ক্রয়কারীর এক অর্থবছরে সম্পাদিত চুক্তির মোট পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা ছাড়ালেই নিরপেক্ষ পরামর্শক দিয়ে পুনরীক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিধি ৬৩(৩) বলছে, ওই বছরের মোট চুক্তির অন্তত ১৫ শতাংশ পুনরীক্ষণের আওতায় আনতে হবে, আর তা মোট চুক্তিমূল্যের ৩০ শতাংশের কম হতে পারবে না। বিধি ৬৩(৬) অনুযায়ী কাজটি শেষ করতে হবে প্রতিটি অর্থবছর সমাপ্তির নয় মাসের মধ্যে। আর বিধি ৬৩(৯): “বিপিপিএ ক্রয় প্রক্রিয়া-উত্তর পুনরীক্ষণের ফলাফল এবং সুপারিশ উহার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করিবে।”
সীমাটি কত সহজে পেরোয়, তা এই অনুসন্ধানের সংখ্যাতেই স্পষ্ট- চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসেই সরকারি চুক্তির মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা।
আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনগুলো? বিধি অনুযায়ী সেগুলো তৈরি হওয়ার শেষ সময় ছিল ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিপিপিএর ওয়েবসাইটে সেই অর্থবছরের একটি প্রতিবেদনও নেই।
একটি শর্ত: বাস্তবায়নের সক্ষমতা
কারিগরি প্রস্তাব কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার একটি নির্দিষ্ট উত্তরও এই অনুসন্ধানে মিলেছে।
জামাল উদ্দীন আহমেদ জানালেন, তাঁর দপ্তর একবার একটি সাধারণ অনুরোধ করেছিল: লটারিতে একাধিক ঠিকাদারের পে-অর্ডার একসঙ্গে ছাড়ার জন্য একটি টিক-বাক্স। কতদিনে বাস্তবায়িত হলো? “এটা প্রায় দুই বছর পরে মনে হয় ইমপ্লিমেন্ট হইছে।”
একটি চেকবক্স যুক্ত করতে দুই বছর। সমস্যা জানানোর পথটিও মসৃণ নয়- “হেল্পলাইনে ফোন দিলে ওরা প্রপার সমাধান দিতে পারে না।”
সিদ্ধান্তটা কার হাতে
এই সীমাবদ্ধতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আছে, এবং সেটি জানা না থাকলে “ঠিক হয় না কেন” প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সারা দেশের সরকারি কেনাকাটার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিপিপিএ, তবে সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, এত বড় একটি ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ২৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দিয়ে। আর ব্যবস্থাটির কারিগরি দিক- সিস্টেম তৈরি, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ- সামলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির নাম দোহাটেক নিউ মিডিয়া। তাদের নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ই-জিপি ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ২০১০ সাল থেকে অবিচ্ছিন্ন- সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে পরপর ছয়টি চুক্তিতে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা।
দোহাটেক নিজেদের ভূমিকা বর্ণনা করে “লিড কনসালট্যান্ট” হিসেবে, আর ব্যবস্থাটির “মালিক ও পরিচালক” হিসেবে উল্লেখ করে বিপিপিএকেই। কিন্তু এই অনুসন্ধানে যে ত্রুটিগুলো ধরা পড়েছে- চুক্তির আগের তারিখে কাজ “শেষ” দেখানো, ঠিকাদারের নামের ঘরে সংখ্যা, ঘর ফাঁকা থাকলে ১৯৭০ সাল বসে যাওয়া, সংশোধনের ইতিহাস না থাকা- সবই সফটওয়্যারের নকশার ভেতরের বিষয়।
অর্থাৎ যে সংস্থার ওপর আইন প্রতিপালনের দায়িত্ব, সংশোধনের চাবিটি তার নিজের হাতে নেই।
জামাল উদ্দীন আহমেদের সেই দুই বছরের চেকবক্স, কিংবা মোশাররফ হোসেনের “ওটা দেখি ঠিক করে দিতে বলবো”- এই বাক্য দুটির অর্থ তখন পরিষ্কার হয়ে যায়। কাকে বলবেন, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন।
ব্যবস্থাটির এই দুর্বলতা কেবল এই অনুসন্ধানেই ধরা পড়েনি।
ই-জিপি উন্নয়নে অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প DIMAPPP-এর সমাপনী প্রতিবেদনে (জুন ২০২৪) দেখা যায়, চুক্তি-ব্যবস্থাপনার যে ই-সিএমএস মডিউল নিয়ে এই সিরিজে বারবার কথা এসেছে, তার ব্যবহার লক্ষ্যমাত্রার এক-চতুর্থাংশও ছোঁয়নি- ৫০ শতাংশের লক্ষ্যের বিপরীতে অর্জন ১২ শতাংশ।
কারণ হিসেবে প্রতিবেদনটি যা লিখেছে, তা লক্ষ করার মতো। সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হিসেবে সেখানে বলা হয়েছে- ব্যবহারকারীদের পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ করার প্রবণতা, অর্থাৎ এমন একটি ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া বা তাতে বাধা দেওয়া, যা তাঁদের আরও কঠোর জবাবদিহিতে বাঁধে।
আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে একই প্রতিবেদনের হিসাব আরও স্পষ্ট। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার দিন পর্যন্ত বিপিপিএর অনুমোদিত জনবল কাঠামোই চূড়ান্ত হয়নি, আর জনবল পরিকল্পনার বিপরীতে কর্মকর্তা নিয়োগের হার ছিল শূন্য শতাংশ- যেখানে লক্ষ্য ছিল ৭০ শতাংশ।
প্রতিবেদনটি ঝুঁকির তালিকাতেও বিষয়টি রেখেছে: বিপিপিএর পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করাই সংস্কারের সবচেয়ে বড় দুই ঝুঁকির একটি।
১৭ আগস্ট বিপিপিএ ও দোহাটেক- দুই পক্ষের কাছেই লিখিত প্রশ্ন যায়। জানতে চাওয়া হয়, বর্তমান চুক্তিটি কোন ক্রয়পদ্ধতিতে হয়েছে; সোর্স কোড ও ডাটাবেজের মালিকানা কার; প্রডাকশন ডাটাবেজে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রবেশাধিকার কাদের রয়েছে; আর এই সিরিজে ধরা পড়া পাঁচটি ত্রুটি সারানোর কাজ চলমান কি না।
বিপিপিএর ক্ষেত্রে এটি ছিল চতুর্থ দফা।
২১ আগস্ট এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই লিখিত জবাব আসেনি।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৫: “পনেরো বছর, এক পরামর্শক”]
তবু বিনিয়োগটি লাভজনক। ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউক্রেনের ক্রয়-পোর্টাল প্রোজোরো চালুর পর থেকে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ৮৭০ কোটি ডলারের বেশি সাশ্রয় করেছে, আর দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ বছরে ১৪ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ক্রয় বিশেষজ্ঞ ইশতিয়াক সিদ্দিকের হিসাব- ডাটা অ্যানালিটিক্স ক্রয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ ব্যয় কমাতে পারে।
সক্ষমতার পাশাপাশি আরেকটি সমস্যা আছে, এবং সেটি আরও মৌলিক: ব্যবস্থাটি ঠিক কী আটকায়, তা নিয়ে দপ্তরে দপ্তরে বোঝাপড়া আলাদা।
জামাল উদ্দীনের অভিজ্ঞতা- নির্ধারিত সময়ের কম সময়ে দরপত্র প্রকাশ করতে গেলে ই-জিপি সাফ আটকে দেয়। আর গণপূর্তের হাসান ইবনে কামালের অভিজ্ঞতা ঠিক উল্টো- “আর্জেন্ট ক্যাটাগরির টেন্ডার সাত দিনের কম করা যায়, ইজিপিতে সেটা অ্যালাউ করে।”
দুজনেই অভিজ্ঞ, দুজনেই একই ব্যবস্থা ব্যবহার করেন, দুজনের কথাই নিজ নিজ অভিজ্ঞতায় সত্য। ফারাকটা ব্যক্তির নয়- নথির। কোন ক্ষেত্রে কত সময় বাধ্যতামূলক, আর সিস্টেম ঠিক কোথায় ছাড় দেয়, তার কোনো প্রকাশ্য, দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যা কোথাও নেই।
যে ব্যবস্থার নিয়ম ব্যবহারকারীরাই দুরকম বোঝেন, নাগরিকের পক্ষে তা যাচাই করা অসম্ভব।
আর যাঁরা এই ব্যবস্থা শেখান, তাঁদের গড়নটিও একপেশে: বিপিপিএর প্রকাশিত জাতীয় ক্রয়-প্রশিক্ষক তালিকায় ৭৩ জনের মধ্যে নারী ছয়জন- ৮.২ শতাংশ।
জবাবদিহি: “ডেফিনেটলি”
প্রস্তাবগুলোর সিদ্ধান্ত একমাত্র বিপিপিএরই নেওয়ার কথা।
১ আগস্ট ফোনে সংস্থাটির নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান বলেছিলেন, “আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র, এখনও কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।” দুদিন পর, ৩ আগস্ট, ততক্ষণেও সিস্টেম অ্যানালিস্টের ব্রিফিং তাঁর কাছে পৌঁছায়নি- “আমাকে এখনও ফিডব্যাক দেয় নাই।”
এবার সংখ্যাগুলো এক এক করে তুলে ধরা হয়। প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট: “আসলে তো ফিজিক্যালি তো সম্ভব না- একটা মানুষকে কাজ দিলাম না, আপনি কীভাবে কাজ শুরু করবেন?”
তাঁর মতে এটি সম্ভবত তথ্য তোলার ত্রুটি, এবং সমাধানের প্রথম দায়িত্ব ক্রয়কারী দপ্তরের।
কিন্তু আসল প্রশ্নটি ব্যবস্থার- ইনপুটের সময় সিস্টেম নিজেই অসম্ভব তারিখ আটকালে দপ্তরের ভুল হলেও তা রেকর্ডে ঢুকত না। প্রশ্নটি তোলার পর তাঁর জবাব ছিল নিরঙ্কুশ:
“এইটাই যেন না বসানোর সুযোগ থাকে, সেটাই আমরা চেষ্টা করব- ডেফিনেটলি।”
কারিগরিভাবে সম্ভব কি না জানতে চাইলে- “এটা সম্ভব, এটা সম্ভব, এটা আমি বলছি।”
কত সময় লাগতে পারে- এই প্রশ্নে কোনো সময়সীমা মেলেনি।
আর নীরবতা কেবল বিপিপিএর নয়। এই অনুসন্ধানে সাতটি দপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ২২ জুলাই লিখিত প্রশ্ন গিয়েছিল। লিখিত জবাব এসেছে দুটি দপ্তর থেকে- একটি তারিখবিহীন, আরেকটি চট্টগ্রাম বন্দরের সচিবের সইয়ে, স্মারকমূলে, এই অনুসন্ধানে পাওয়া সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য।
যেখানে প্রশ্নটি শেষবার পৌঁছেছিল
বিপিপিএ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা। চার দফায় লিখিত জবাব না পেয়ে ১৯ আগস্ট প্রশ্নগুলো পাঠানো হয় সেই মন্ত্রণালয়েই- পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির দাপ্তরিক ই-মেইলে, আলাদা আলাদা করে। অনুলিপি যায় দুজনের একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ সাতজনের কাছে।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দুজনের হোয়াটসঅ্যাপেও একই দিন বার্তা যায়। ১৯ ও ২০ আগস্ট- দুদিনই একাধিকবার ফোন করা হয়। কেউ ধরেননি।
জবাব এসেছিল একটিই, মন্ত্রীর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিনের কাছ থেকে। ২০ আগস্ট সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে তিনি লেখেন এক লাইনে:
“Pls contact with Bangladesh Public Procurement Authority officials. Visit there website.”
অর্থাৎ প্রশ্নটি ফিরে গেল ঠিক সেই সংস্থার দিকেই, যেটি চার দফায় নীরব থেকেছে।
জানানো হয়, বিপিপিএর সঙ্গে যোগাযোগ ইতিমধ্যে হয়েছে এবং জবাব মেলেনি; আর প্রশ্নগুলো কারিগরি নয়, নীতিগত- ক্রয়বিধিমালার সংস্কার ও ই-জিপির ভবিষ্যৎ সংস্করণ নিয়ে।
বেলা ১১টা ৫৭ মিনিটে জসিম উদ্দিন নিজেই ফোনে যোগাযোগ করেন। তাঁর কথায় সহযোগিতার আগ্রহ স্পষ্ট ছিল- “বিপিপিএ’তে আমি কথা বলব যেরকম সাংবাদিক ভাই নিউজ করবে, তাকে আমরা একটু কোঅপারেট কেন করতে পারছি না।”
তবে তাঁর প্রস্তাবটি ছিল আবার সেই একই ঠিকানার: “মন্ত্রী থেকে যে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির যিনি সিইও আছেন, উনি নতুন জয়েন করছেন, উনি এটা ভালো বলতে পারবেন। আপনার কোয়েশ্চেনগুলা খুবই ডিপ।”
এরপর আরও নানা কথার পর দুপুর ২টা ৭ মিনিটে আসে দিনের শেষ বার্তা:
“Ok. I will talk to Honorable Minister”
সেদিন এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
পরদিন, ২১ আগস্ট- সিরিজের শেষ পর্ব প্রকাশের দিন- শেষবার চেষ্টা করা হয়। বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনের হোয়াটসঅ্যাপেই পাঁচটি প্রশ্ন আবার পাঠানো হয়, সঙ্গে ইতিমধ্যে প্রকাশিত চারটি পর্বের লিংক। জানানো হয়, শেষ পর্বটি আজ ২১ আগস্ট প্রকাশিত হবে, আর ছোট করে লিখে জানালেও তা প্রতিবেদনে যাবে।
বেলা ১২টার দিকে দুজনকেই আবার ফোন করা হয়। কেউ ধরেননি।
একই সময়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনকেও হোয়াটসঅ্যাপে অগ্রগতির কথা জিজ্ঞেস করা হয়।
তাঁর সহযোগিতার আগ্রহ নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তোলার কিছু নেই- তিনিই একমাত্র, যিনি প্রতিবার সাড়া দিয়েছেন এবং নিজে থেকে ফোন করেছেন।
তবে আজ দুপুরের পর একটি নড়াচড়া হলো।
দুপুর ২টা ৯ জসিম উদ্দিন হোয়াটসঅ্যাপে জানান, পাঠানো তথ্য ও প্রশ্নগুলো দেখেছেন পরিকল্পনামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ড. আসিফ ইকবাল, আর তিনি বিপিপিএকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখতে বলেছেন। পরের মিনিটে যোগ করেন, মন্ত্রী মহোদয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আর ২টা ১১ মিনিটে লেখেন, রোববার মন্ত্রী মহোদয়কে দিয়ে বিপিপিএকে সরাসরি নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
তিন দিনের চেষ্টায় এটুকুই অগ্রগতি এবং এটুকু কম নয়। মন্ত্রীর একান্ত সচিব পর্যন্ত তথ্য পৌঁছেছে, আর তিনি বিপিপিএকে বিষয়টি দেখতে বলেছেন। এতে অন্তত এটুকু নিশ্চিত হয়- প্রশ্নগুলো মন্ত্রণালয়ের টেবিলে পৌঁছেছে।
কিন্তু লক্ষ করার মতো হলো গন্তব্যটি।
মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন গিয়েছিল ঠিক এই কারণে যে বিপিপিএ চার দফায় জবাব দেয়নি। আর মন্ত্রণালয়ের প্রথম পদক্ষেপ হলো- বিপিপিএকে বিষয়টি দেখতে বলা।
বৃত্তটি সম্পূর্ণ হলো।
তিন দিনে দুই মন্ত্রীর কাছে হোয়াটসঅ্যাপ, দাপ্তরিক ই-মেইল ও একাধিক ফোন; অনুলিপি গেছে দুজনের একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ সাতজনের কাছে। ভাষা প্রতিবার ছিল ভদ্র, প্রত্যেকেই সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রতিবার সাড়া দিয়েছেন, নিজে থেকে ফোনও করেছেন।
তবু এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাঁচটি প্রশ্নের একটিরও উত্তর মেলেনি।
দপ্তর দেখিয়েছে সংস্থার দিকে, সংস্থা নীরব থেকেছে, আর মন্ত্রণালয় ফিরিয়ে দিয়েছে সেই সংস্থার দিকেই।
অন্ধকূপ, নাকি জানালা
এই অনুসন্ধান যখন চলছিল, আইন তখন উল্টো দিকে হাঁটছে না- হাঁটছে সামনের দিকেই।
চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে পাস হওয়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল ২০২৬-এ সব সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; ব্যতিক্রমে লাগবে বিপিপিএর পূর্বানুমোদন। খবরটি ভালো- অফলাইনের সেই “৩” লেখা খাতা কমে আসার কথা।
কিন্তু তাতেই প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে।
যে খাতা আজও চুক্তির আগের তারিখে কাজ “শেষ” দেখলে থামে না, ঠিকাদারের নামের ঘরে “৩” দেখলে প্রশ্ন করে না, দুই “প্রতিযোগীর” মালিকের ঘরে একই নাম দেখলে মেলায় না, আর নাগরিককে নিজের তথ্য নামাতেও দেয় না- আইন সেই খাতার ওপরই তুলে দিচ্ছে রাষ্ট্রের পুরো কেনাকাটা।
খাতাটি প্রশ্ন করতে শিখল কি না, সেটি তাই আর কারিগরি খুঁটিনাটি নয়।
তথ্য ঢোকে, প্রশ্ন বেরোয় না- এটাই ই-জিপির অন্ধকূপ। পাঁচ পর্বে দেখা প্রতিটি ছবি এই এক গর্তেরই আলাদা আলাদা কিনার: মুছে যাওয়া প্রতিযোগিতার হিসাব, দপ্তরের বেছে দেওয়া দরদাতা, এক মালিকের দুই “প্রতিযোগী”, কাগজে শেষ হয়ে যাওয়া কাজ, আর ভুল ধরার কেউ না থাকা।
যেদিন কাগজটি নিজেই প্রশ্ন করতে শিখবে- ভুল তারিখ আটকাবে, ধরন গুনবে, এক ক্লিকে নিজেকে মেলে ধরবে- সেদিন অন্ধকূপটা জানালা হয়ে উঠবে।
ততদিন প্রশ্নগুলো করতে হবে মানুষকেই।
বাকলিয়া সরকারি কলেজের বিদ্যমান একাডেমিক ভবনটি চার তলা। পুরো নিচতলা জুড়ে প্রশাসনিক ব্লক; বাকি তিন তলায় ক্লাসের উপযোগী কক্ষ মোটে আটটি, একটি আবার ল্যাব। ভবনটি তৈরি হয়েছিল সর্বোচ্চ এক হাজার শিক্ষার্থীর জন্য; এখন শিক্ষার্থী প্রায় তিন গুণ। ফল- একই শ্রেণিকে দুই শিফটে ভাগ করে পড়াতে হয়।
ঠিক এই সংকট মেটাতেই পাশের একতলার ছাদ করে রাখা ভবনটি ছয় তলায় উন্নীত করার কাজ চলছে। বরাদ্দটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের। সাত বছর।
কাগজে সেই কাজ “শুরু” হয়ে গেছে ১ এপ্রিলে। বাস্তবে তার প্রথম রডটি বাঁধা হয়েছে জুনের শেষে- আর প্রতিটি বিলম্বিত মাসে আরেকটি ব্যাচ গাদাগাদি ক্লাসরুমে বসে থেকেছে।
তাঁদেরই একজন, কলেজের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলছিলেন, “নতুন ভবনের কাজ কবে শেষ হবে জানি না। তবে যত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তত দিন আমাদের ক্লাস করতে হবে এই সংকটের মধ্যেই।”
সরকারের ডিজিটাল খাতা আর শিক্ষার্থীর চোখে দেখা ক্লাসঘর- এই দুইয়ের মাঝখানের দূরত্বটাই এই অনুসন্ধানের বিষয়।
সেই দূরত্ব মাপার ফিতা সরকার নিজেই বানিয়েছিল। নাম তার ই-জিপি।
এখন দেখা যাচ্ছে, ফিতার দাগগুলোই এলোমেলো।
প্রথম পর্ব পড়ুন: ২৪৮ জন বনাম ২ জন: যে তুলনাটা আর কেউ করতে পারবেন না
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: ‘তিন থেকে পাঁচটা লাইসেন্স আমরাই বেছে দিই, অন্য কেউ দেখবেও না’
তৃতীয় পর্ব পড়ুন: ‘এটা ১০০% পেতে পারি আমি’: এক মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান, ৮২ শতাংশ কাজ’
চতুর্থ পর্ব পড়ুন: চুক্তির আগেই ১৪৪ প্রকল্পের কাজ শেষ!
সরকারি কেনাকাটার ছয় ধাপ
সরকারি কেনাকাটার ছয়টি ধাপ পরপর ঘটার কথা: প্রথমে দরপত্র আহ্বান, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন প্রকাশ। এরপর দাখিল ও মূল্যায়ন- কে যোগ্য, কার দর কত। তারপর চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ বা কার্যাদেশ (এনওএ; কথ্য ভাষায় বলা হয় “নোয়া”)- কাকে কাজ দেওয়া হলো, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর পরের ধাপ কার্যসম্পাদন জামানত (পিজি)- ঠিকাদারের জমা দেওয়া টাকা, যা কাজ না করলে বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত ব্যাংকে যাচাই হওয়ার পরই হয় চুক্তি স্বাক্ষর। আর সবশেষে শুরু হয় কাজ।
সহজ কথায়: আগে কাগজ, পরে কাজ। এই ক্রম উল্টে গেলে কী দাঁড়ায়- সেটিই এই সিরিজের বিষয়।
[এই সিরিজের তথ্য, টেন্ডার আইডি ও আর্কাইভ লিংক প্রকাশিত হয়েছে নিচের সংযুক্তিতে]