জ্বালানি অলিগার্কদের ‘১০ দিনের ভেলকি’, সমাধান কোন পথে?

দেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে? দৃশ্যত সরকারের মনে হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আড়ালে গত দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা এক ‘লুটপাটের রাজত্ব’ এবং গুটিকয় ‘জ্বালানি অলিগার্ক’-এর দৌরাত্ম্যই নির্ধারণ করেছে দেশের বাতি জ্বলা বা নেভা।

ফয়সাল খানের নেতৃত্বাধীন সামিট গ্রুপ বা তাদের মতো ‘এনার্জি ট্রেডার’রা তারলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বা তেল আমদানির হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য বাস্তবায়ন করেন খুব কম সময়ের মধ্যেই, কিছু ক্ষেত্রে মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনে। দরপত্রের বালাই ছাড়াই কেবল ‘সমঝোতার’ টেবিলে সই হয় শত শত চুক্তি। অথচ একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ফাইল পরিবেশ অধিদপ্তর আর বিদ্যুৎ ভবনের টেবিলে ঘুরপাক খায় বছরের পর বছর।

গত ২৪ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, নীতি নির্ধারকদের একাংশকে সুবিধা দিয়ে এজেন্ডা পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিই এই অলিগার্কদের জন্ম দিয়েছে। টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পর্যালোচনাকৃত মাত্র পাঁচটি প্রকল্পেই ভূমি ক্রয় ও ক্ষতিপূরণ প্রদানে ২৪৯ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে, যা আইপিপি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। টিআইবির গবেষণায় নির্দেশিত এই ‘সুবিধাবাদী’ বা ‘অলিগার্ক’ সংস্কৃতিরই যেন বাস্তব প্রতিচ্ছবি সামিট গ্রুপ।

প্রশ্ন হলো, কেন তাদের এই দ্বিমুখী আচরণ? কারণ—‘সহজ লভ্যাংশ’ এবং ‘বারংবার কমিশন’। সামিট গ্রুপের ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ মেলে। মুখে ‘সবুজ জ্বালানি’র বুলি আওড়ালেও তাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই এসেছে পরিবেশ দূষণকারী এইচএফও (ফার্নেস অয়েল) এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের বাস্তবিক কোনো বড় বিনিয়োগ নেই।

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ একে বলছেন ‘ট্রেডার মেন্টালিটি’। তাঁর মতে, ‘একবার সোলার প্যানেল বসালে তো আর প্রতি মাসে তেল বা গ্যাস আমদানি করতে হবে না, ফলে প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ের পথও বন্ধ হয়ে যাবে।’

মোস্তফা আল মাহমুদ আরও বলেন, যারা ফসিল ফুয়েল নিয়ে বড় ব্যবসা করেন, তাদের একেকটা এলএনজি জাহাজেই ৭০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার কারবার। এই বিপুল অর্থের মালিকেরা চান না নবায়নযোগ্য খাত বিকশিত হোক। এটি খোদ জ্বালানি উপদেষ্টাও কিছুদিন আগে আমাদের এক প্রোগ্রামে স্বীকার করেছেন।’

তবে সিন্ডিকেটের এই দাপটকে কেবল ব্যবসায়ীদের ওপর চাপাতে রাজি নন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম। তাঁর মতে, ‘জ্বালানি খাতের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। এটা কোনো এক সরকারের দায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। তবে নেতৃত্ব যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে চায়, তবে কোনো সিন্ডিকেটই তা আটকাতে পারবে না। সাফল্য বা ব্যর্থতা—সবই শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’

বিশেষ আইনের ‘অন্ধকার’ সরতেই সাশ্রয় ৫ টাকারও বেশি

অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের সুরক্ষা বলয় সরিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কিনতেই বেরিয়ে এসেছে আসল চিত্র। সিন্ডিকেটের পকেটে এতোদিন বাড়তি যে টাকা ঢালা হচ্ছিল, তা বন্ধ করায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কমেছে প্রায় ৫ টাকারও বেশি।

২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য এবং এর পর গত ৯ ডিসেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে ট্যারিফ অনুমোদন দিয়েছে, তার গড় মূল্য প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৭ দশমিক ৮০ সেন্ট বা ৯ টাকা ৫৩ পয়সা। অথচ টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে বিশেষ আইনের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই দাম ছিল গড়ে ০.১২৪ ডলার বা ১২ দশমিক ৪ সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ টাকা ১৩ পয়সা। অর্থাৎ, কেবল একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণেই সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৬০ পয়সা।

টিআইবির অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, বিগত সময়ে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যয়ও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হতো। সংস্থাটির মতে, প্রতি মেগাওয়াট উৎপাদনে গড়ে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও, তাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পগুলোতে গড়ে ১৩.৮ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় দেড় গুণেরও বেশি দেখিয়ে বাড়তি টাকা লোপাট করা হয়েছে।

তবে এই দাম কমার পেছনে শুধু সরকারের কৃতিত্ব দেখছেন না বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত দরপত্রে বিদ্যুতের দাম কমে আসা সরকারের কোনো জাদুকরী সাফল্য নয়। ২০২৩ সালে সোলার প্যানেলের দাম ছিল ৩৩-৩৫ সেন্ট, যা এখন কমে ৮-৯ সেন্টে নেমে এসেছে। কাঁচামালের দাম কমার ফলেও বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমেছে।’

ভারত বনাম বাংলাদেশ: আকাশ-পাতাল ফারাক

দাম কমলেও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের খরচ এখনও আকাশচুম্বী। ভারতে যেখানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে মাত্র ২ রুপি ৬০ পয়সা অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে তিন টাকা, সেখানে বাংলাদেশে কিছুদিন আগেও অনুমোদিত প্রকল্পগুলোতে খরচ পড়ত প্রায় ১১ টাকা। টিআইবির গবেষণাতেও এই বিশাল ফারাকের চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্যমতে, ভারতে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম যেখানে ০.০৩ ডলার, সেখানে বাংলাদেশে গড় দাম ০.১২৪ ডলার—যা প্রায় ৪ গুণ বেশি। এই বিশাল ব্যবধানের কারণ কী?

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন জানান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচে এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে মূলত চারটি কারণ দায়ী। প্রথমত, জমির সংস্থান ও সরকারি সহায়তা—ভারতে সরকার সরাসরি জমি অধিগ্রহণে সহায়তা করলেও বাংলাদেশে এটি পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাঁধেই বর্তায়, যা প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত ব্যয়। পিজিসিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ গ্রিডে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন বা অবকাঠামো তৈরির ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকেই বহন করতে হয়, যার অবধারিত প্রভাব পড়ে বিদ্যুতের চূড়ান্ত দামের ওপর।

তৃতীয়ত, অর্থায়নের ভিন্নতা। ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে তা এখনও বেশ দুষ্প্রাপ্য ও জটিল। শেষ কারণটি প্রাকৃতিক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতে সৌর বিকিরণের তীব্রতা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি, যা প্রাকৃতিকভাবেই তাদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে।

বিদেশি বিনিয়োগের দরজায় খিল ও গ্যারান্টি সংকট

স্বচ্ছতা ফিরলেও নতুন নীতিমালার ‘কৌশলগত ভুলে’ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সাম্প্রতিক ৫৫টি দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। মূল কারণ—বিশেষ আইন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান রক্ষাকবচ ‘ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ বা সার্বভৌম গ্যারান্টি তুলে নেওয়া হয়েছে।

সিপিডির জরিপে ৮২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, বিদেশি ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রের গ্যারান্টি ছাড়া বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করে না। ফলে উন্মুক্ত দরপত্রে কনফিডেন্স গ্রুপ বা প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেলেও বড় আকারের বিদেশি পুঁজি আসছে না।

জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের দাখিল করা ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চার হাজার ১১৩ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সিপিডির ‘অ্যাচিভিং দ্য টার্গেট অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ শীর্ষক আরেকটি গবেষণা বলছে, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, বর্তমান নীতি ও বিনিয়োগের অচলাবস্থায় এর ধারেকাছে পৌঁছানোও কঠিন।

বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সার্বভৌম গ্যারান্টি ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আশা করা দুরূহ। বিদেশি ব্যাংকগুলো অর্থায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গ্যারান্টি খোঁজে। এটি না থাকায় সাম্প্রতিক ৫৫টি দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। তিনি বলেন, অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা দেশের স্থানীয় ব্যাংকগুলোর পক্ষে জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’

আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের রাজনীতিও এর সঙ্গে যুক্ত। চলতি ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত টিআইবির ‘আনলকিং ক্লাইমেট ফাইন্যান্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ বিষয়ক এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে অনুদানের বদলে ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে। বাংলাদেশে জিসিএফের অর্থায়নে ঋণের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ, যেখানে অনুদান মাত্র ২৫ শতাংশ। এমনকি সহ-অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ ৯৭ শতাংশেরও বেশি। নবায়নযোগ্য শক্তি বা অভিযোজন প্রকল্পে এই বিপুল ঋণের বোঝা ‘দূষণকারী কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদান’ নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী।

টিআইবির গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চরম বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি তহবিল পাওয়ার যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত, অথচ ১৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এখানে কাজ করছে। জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্প ছাড় হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। যেমন—একটি প্রকল্পের অনুমোদন পেতে জিসিএফ সময় নিয়েছে প্রায় ৬ বছর। আন্তর্জাতিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ঋণের ফাঁদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের পথকে সংকুচিত করে ফেলেছে।

নতুন ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫’-এ সরকার নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বললেও, বিনিয়োগ না আসার মূল কারণ হিসেবে নীতিগত অনিশ্চয়তাকে দায়ী করা হয়েছে। সরকার হঠাৎ করে প্রতিযোগিতা ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের আইন বাতিল করে দেওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত হয়ে যায়। নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় ‘ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ বা সরকারের পক্ষ থেকে পেমেন্ট গ্যারান্টি তুলে নেওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। প্রথম দফায় ডাকা ১২টি প্রকল্পের দরপত্রে কোনো বিদেশি কোম্পানিই অংশ নেয়নি।

অথচ সরকারের নীতিনির্ধারকরা শোনাচ্ছেন ভিন্ন সুর। মাঠ পর্যায়ে যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তখন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ দাবি করেছেন, সরকার সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ‘কার্যকর রূপান্তর’ বাস্তবায়ন করছে। তিনি জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত সৌরশক্তির স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে।

একই সুরে কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও। গত ৯ ডিসেম্বর ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে তিনি দাবি করেন, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে সৌর বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ অনুমোদনের ফলে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪২০ কোটি টাকা সাশ্রয় করবে। বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মোমতাজও জানিয়েছেন, ‘নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫’ হালনাগাদ করে ছাদে ১০০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারে।

কিন্তু সরকারের এই ‘সাশ্রয়’ ও ‘রূপান্তর’-এর আশাজাগানিয়া বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক যোজন যোজন। বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ এই অসংগতি তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার কাগজে-কলমে অনেক কথা বললেও বাস্তবে অগ্রগতি সামান্য। ডিসেম্বরের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আসার কথা ছিল ৩ হাজার মেগাওয়াট। ৩ মেগাওয়াটও আসেনি।’

মোস্তফা আল মাহমুদ আরও বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারলে এই খাতে বিদেশি পুঁজি আসবে না। আমরা যদি এভাবে চলতে থাকি, তবে প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই জ্বালানি আমদানিতে চলে যাবে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।’

সংকট উত্তরণে ৪ প্রস্তাব

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা কি সম্ভব? জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মতামত ও গবেষণার তথ্যে এই সংকট থেকে উত্তরণের চারটি সুনির্দিষ্ট উপায় উঠে এসেছে। এগুলো হলো:

১. সার্বভৌম গ্যারান্টি ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া বা পিপিএ-২০০৬ বহাল রাখা। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে পুনরায় চালু করতে হবে ‘স্ট্যান্ডার্ড ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ বা সার্বভৌম গ্যারান্টি। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এটি কোনো দুর্নীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের স্বীকৃত রীতি। এই গ্যারান্টি নিশ্চিত করা গেলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়বে, ফলে বিদ্যুতের দাম আরও কমে আসবে।

২. নবায়নযোগ্য শক্তি অর্থায়ন তহবিল দেশীয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার একটি বড় বাধা। এই সংকট কাটাতে সরকারি ও আন্তর্জাতিক উৎসের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘নবায়নযোগ্য শক্তি অর্থায়ন তহবিল’ গঠন করা প্রয়োজন বলে জানান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তাঁর মতে, উক্ত তহবিল থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ অর্থায়ন (ব্রিজ ফাইন্যান্সিং) সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শুধু বড় করপোরেট গ্রুপ নয়, দক্ষ যেকোনো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে আসতে পারবে। এতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে।

৩. কারখানার ছাদ ও সরকারি জমির ব্যবহার তৈরি পোশাক কারখানার অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উৎস হতে পারে। অক্সফাম ও সিপিডির গবেষণা বলছে, কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল বসালে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ ও উৎপাদন খরচ—দুটোই কমবে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের প্রধান বাধা হলো জমির অভাব। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি খাস বা অব্যবহৃত জমিতে ‘সোলার পার্ক’ গড়ে তুলে বিনিয়োগকারীদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।

৪. স্ট্যান্ডার্ড পিপিএ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) ছাড়া যেন কোনো প্রকল্প চালু না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কক্সবাজারের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ঘটনা (পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা হয়নি বা প্রকাশ করা হচ্ছে না) এড়াতে জবাবদিহির বিকল্প নেই বলে জানান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

গত ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘রিসেন্ট প্রকিউরমেন্ট ইনিশিয়েটিভস অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ শীর্ষক সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা যাতে আগে থেকেই ঝুঁকি ও আয়ের সঠিক হিসাব করতে পারেন, সে জন্য পিডিবিকে আন্তর্জাতিক মানের ‘স্ট্যান্ডার্ড পিপিএ’ প্রকাশ করতে হবে।

বাতিল আতঙ্কে ‘নির্ভার মুডে’ বিনিয়োগকারীরা

আর্থিক সংকটের চেয়েও বিনিয়োগকারীদের বড় ভয় এখন ‘পলিসি রিস্ক’ বা নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে। বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আতাউর রহমান সরকার একুশে পত্রিকাকে বলেন, বিগত সময়ে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) বাতিলের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘মিথ’ বা ভীতি তৈরি হয়েছে। তাদের শঙ্কা, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেসব চুক্তি করবে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে তা বাতিল করে দেবে কি না।

আতাউর রহমান সরকার বলেন, ‘এই রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন অনেকটা রিলাক্স মোডে বা পর্যবেক্ষণে আছেন। তারা নির্বাচনের আগে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।’ এ ছাড়া স্থানীয় ব্যাংকগুলোর বড় প্রকল্পে অর্থায়নের সক্ষমতা নেই এবং ওপেন টেন্ডারে আসা ছোট প্রকল্পগুলোর জন্য এখনও সঠিক নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি হয়নি বলেও মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

‘দেউলিয়া’ পিডিবির গ্যারান্টিতে আস্থা নেই

বিদেশিদের সার্বভৌম গ্যারান্টি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পলিসি বা নীতির ধারাবাহিকতা চায়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি নীতি বদলে যায় বা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া ৩৭টি প্রকল্পের চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, তবে বিদেশিরা আর আসতে চাইবে না। এর ফলে অনেক সিরিয়াস ইনভেস্টর বা ভালো বিনিয়োগকারীও তাদের বিপুল অর্থ খুঁইয়েছে।’

ড. তামিম সতর্ক করে বলেন, ‘এখন যদি সরকারি বা সার্বভৌম গ্যারান্টি তুলে দেওয়া হয়, তবে বিদেশিরা কার ভরসায় আসবে? পিডিবির গ্যারান্টিতে? পিডিবির ঋণের বোঝা আর সম্পদের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কার্যত একটি ‘দেউলিয়া’ প্রতিষ্ঠান। একটি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ কারণেই সাম্প্রতিক দরপত্রগুলোতে বিদেশি বিডার বা অংশগ্রহণকারী পাওয়া যাচ্ছে না।’

সিন্ডিকেট ভাঙার আনন্দ কি অন্ধকারে হারাবে

বিশেষ আইন বাতিলের পর বিদ্যুতের দাম কমে আসা মূলত গত দেড় দশকের ‘লুটপাটের মডেল’কেই উন্মোচন করে দিয়েছে। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এ ব্যাপারে একুশে পত্রিকাকে বলেন, অতীতের ক্ষত সারাতে গিয়ে বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা যদি বিদেশি বিনিয়োগের দরজায় খিল এঁটে দেন, তবে তা হবে আরেক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

শামসুল আলম আরও বলেন, অলিগার্কদের তোষণ করে নয়, বরং সার্বভৌম গ্যারান্টি ও সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরিই এখন একমাত্র মুক্তির পথ। নইলে আজ যে ‘৫ টাকা সাশ্রয়’ নিয়ে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ খরা আর দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে তা ম্লান হতে সময় নেবে না। তাঁর প্রশ্ন, সিন্ডিকেট ভাঙার আনন্দ কি অচিরেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?

প্রথম পর্ব: জাপানি ‘সততার’ আড়ালে সামিটের চুক্তিফাঁদ, পেট্রোবাংলার নীরবতা

দ্বিতীয় পর্ব: নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পাশ কাটিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজিতে ঝোঁকার কারণ কী?