সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

যেখানে উৎসব থেমে গেছে, রয়ে গেছে শুধু ঐতিহ্য

আমির হামজা | প্রকাশিতঃ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ৮:৫৬ অপরাহ্ন


একসময় যেখানে শত শত মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত প্রাঙ্গণ, উৎসব-পার্বণে বসত হাজারো মানুষের ভোজের আয়োজন, চট্টগ্রামের রাউজানের সেই বিখ্যাত রামধন ধর জমিদার বাড়ির জৌলুস আজ কালের গর্ভে বিলীন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর কয়েক দশক পেরিয়ে সেই প্রাণচাঞ্চল্য এখন কেবলই স্মৃতি। পলেস্তরা খসে পড়া দেয়াল আর আগাছায় ভরা জরাজীর্ণ কাঠামো নিয়ে বাড়িটি এখন যেন নিজের অতীতের কঙ্কালসার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এই বিশাল বাড়ির প্রায়ান্ধকার ঘরগুলো আগলে রেখেছেন জমিদার বংশের এক কুমারী বৃদ্ধা—ছবি রাণী ধর। শোনা যায়, অপরূপ সুন্দর হওয়ায় তার নাম রাখা হয়েছিল ‘ছবি’। কিন্তু প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি আর বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। জমিদারি জৌলুসের শেষ স্মৃতিচিহ্ন হয়ে ছবি রাণী এখন এই বাড়ির একাকিত্বের সঙ্গী।

বাড়িটির বর্তমান অবস্থা দেখলে তার অতীতের জাঁকজমক কল্পনা করাও কঠিন। কয়েকটি মাত্র কক্ষে মানুষের বাস, বাকিটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো পরিত্যক্ত। শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে জন্মেছে পরগাছা, ভেঙে পড়ছে ছাদের কার্নিশ। রামধন ধরের বংশধরেরা এখন চাকরি ও ব্যবসার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ছবি রাণী ধর এবং বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুটি তত্ত্বাবধায়ক পরিবার ছাড়া এখানে আর কেউ স্থায়ীভাবে থাকে না।

তবে বছরে কয়েকবার এই বাড়ি যেন ক্ষণিকের জন্য তার পুরোনো প্রাণ ফিরে পায়। দুর্গাপূজা বা অন্য কোনো সামাজিক উপলক্ষ্যে যখন বংশধরেরা ফিরে আসেন, বাড়িটিতে আবারও জ্বলে ওঠে আলো, শোনা যায় হাসির শব্দ।

জমিদার বংশের সদস্য রাম প্রসাদ ধর ও ছবি রাণী ধর স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এক সময় পূজা-পার্বণ এলে বাড়িতে উৎসব লেগে যেত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। এখন কালের বিবর্তনে সেই উৎসব কেবলই ছোটখাটো পারিবারিক অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।”

চট্টগ্রামের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও সরকারি স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জমিদার পরিবারের নাম। সেই গৌরবময় ইতিহাস এখন কেবলই অতীত। তবুও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আর বংশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে বংশধরেরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জৌলুস না থাকলেও প্রতি বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে তারা সেই সোনালি দিনগুলোকেই স্মরণ করতে চান, যা এখন শুধুই ইতিহাসের অংশ।