
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ও অপতথ্য ছড়ানোর মহোৎসব চলছে। রানা প্লাজা ধসে হাত হারানো শ্রমিকের চেহারা ব্যবহার করে তৈরি রাজনৈতিক ভিডিও থেকে শুরু করে সেনা কর্মকর্তাদের ভুয়া বিবৃতি—সবই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এ ধরনের প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতীক বরাদ্দের আগেই এ ধরনের অপপ্রচার নির্বাচনকে সহিংসতা ও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রানা প্লাজার রিক্তাকে ব্যবহার করে আবেগি ফাঁদ
সম্প্রতি ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে মধ্যবয়সী এক নারীর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি হাত নেই এমন এক নারী অভিযোগ করছেন, একটি রাজনৈতিক দল প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েও কার্ড দেয়নি। তিনি ওই দলকে ‘ঘুষখোর’ আখ্যা দিয়ে অন্য একটি নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন।
ফ্যাক্ট চেক বা যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এআই দিয়ে তৈরি। ভিডিওর নারীর চেহারার সঙ্গে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে হাত হারানো পোশাকশ্রমিক রিক্তার মিল রয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি আপলোড করা ভিডিওটি রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে। পেজটি বাংলাদেশ থেকে সাতজন অ্যাডমিন পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে।
সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে অপপ্রচার
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এআই জালিয়াতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না সেনাবাহিনীও। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়। যাচাইয়ে এটিও এআই দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণিত হয়েছে। যদিও গত ১৪ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে এ ধরনের এআই-জেনারেটেড কন্টেন্ট সম্পর্কে সতর্ক করে জানিয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমের খালি গায়ে লুঙ্গি পরে নাচার ভুয়া ভিডিও, বিকিনি পরা নারীর কণ্ঠে ইসলামপন্থী দলের পক্ষে ভোট চাওয়া কিংবা বানরের মুখ দিয়ে ভোট চাওয়ার মতো ভিডিও ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেছেন, এআই ব্যবহার করে তার দল বেশি অপপ্রচারের শিকার হচ্ছে এবং ইসির পদক্ষেপ সন্তোষজনক নয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা, অশ্লীল বা মানহানিকর কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর কথা থাকলেও এখনই ফেসবুকে এসব ভিডিওর ছড়াছড়ি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন গত ১২ ডিসেম্বর এ বিষয়ে সতর্ক করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আব্দুল আলীম বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও ইসির কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তির এই অপব্যবহার বড় ধরনের সংঘাত তৈরি করতে পারে। মো. আব্দুল আলীম বলেন, কোনো প্রার্থীকে হেয় করে বা তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন—এমন ভুয়া এআই ভিডিও ছাড়া হলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় তরুণ সমাজ এসব ভিডিওর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে পুরো নির্বাচন কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, নাগরিকদের অভিযোগ নেওয়ার জন্য চারটি ই-মেইল ও একটি হটলাইন চালু করা হয়েছে। প্রাপ্ত রিপোর্টগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
বিটিআরসির তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক এবং সাড়ে ৪ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও তা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।