সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

অপতথ্যের ১০ শতাংশই এআই-নির্মিত, ভিডিওর মাধ্যমে ছড়িয়েছে অর্ধেকের বেশি

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ৬:৫১ অপরাহ্ন


যাচাই সংখ্যার বিচারে ২০২৫ সালকে ‘ভুল তথ্যের বছর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা ৯টি ফ্যাক্টচেকিং বা যাচাই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। তবে কেবল সংখ্যার বৃদ্ধিই নয়, অপতথ্যের ধরন, বিস্তার ও প্রযুক্তির ব্যবহারে এসেছে বড় পরিবর্তন।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে যাচাইকারী ওয়েবসাইটগুলোতে মোট ৫ হাজার ৭০৬টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একই ভুল তথ্য একাধিক সাইটে যাচাই হওয়ায় স্বতন্ত্র বা ইউনিক ভুল তথ্য হিসেবে ৪ হাজার ১৩১টি ঘটনাকে গণনা করা হয়েছে। যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ১৬৭টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বতন্ত্র অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। যাচাই হওয়া ভুল তথ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশই ছিল রাজনৈতিক বিষয়বস্তু। আইনশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অপতথ্য ছিল যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে। বছরজুড়ে নির্বাচন, সহিংসতা, দুর্ঘটনা, ধর্মীয় উত্তেজনা কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো ঘটনাগুলোর ছায়া ধরেই অপতথ্যের ঢেউ তৈরি হয়েছে।

অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭৪টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনের শিরোনামে তার নাম এসেছে। তার পুরনো ভিডিও, ছবি ও বক্তব্যকে ‘সাম্প্রতিক’ দাবি করে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া তার দেশে ফেরা, ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, আন্তর্জাতিক সমর্থন, গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুর গুজবও নিয়মিত ছড়ানো হয়েছে। এসব অপপ্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বানানো নকল বক্তব্য ও ভিডিওর বড় ভূমিকা ছিল।

তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে ঘিরে ১৫০টি ফ্যাক্টচেক শিরোনাম পাওয়া গেছে। এসব অপতথ্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে অস্থিতিশীল ও অবৈধ হিসেবে তুলে ধরা। এর মধ্যে ‘ইউনূস পদত্যাগ করেছেন’, ‘সেনাবাহিনীর ডেডলাইন’ কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি ছড়িয়ে দিতে গণমাধ্যমের নকল ফটোকার্ড ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়াও অপতথ্যের শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব।

প্রতিবেদনে অপতথ্যে প্রযুক্তির ব্যবহারের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে যাচাই হওয়া স্বতন্ত্র ভুল তথ্যের অন্তত ১০ শতাংশই তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে। রাজনীতি থেকে শুরু করে দুর্যোগ, বিনোদন কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে নেতাদের দেশে ফেরা বা জনসমর্থনের ভুয়া দৃশ্য তৈরি এবং ভূমিকম্প বা দুর্ঘটনার সময় এআই-নির্মিত কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে।

অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ভিডিও ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ভুল তথ্যের প্রায় ৫২ শতাংশই ছড়িয়েছে ভিডিও আকারে। এছাড়া গ্রাফিক কার্ড বা ফটোকার্ডের মাধ্যমে ২১ শতাংশ এবং ছবির মাধ্যমে প্রায় ১৮ শতাংশ ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি ছড়াতে ৭৪ শতাংশ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের নকল ফটোকার্ড ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাব তাদের গবেষণা পদ্ধতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা ৯টি প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এবং প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত ২২ হাজারের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পর্যালোচনা করে এই বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের ধরন যেভাবে বদলাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে এআইয়ের ব্যবহার ভুল তথ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।