সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

‘সংখ্যালঘুদের ঘিরে ৬৪৫ ঘটনার মধ্যে সাম্প্রদায়িক ৭১টি’

ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, জমি ও পারিবারিক বিরোধেই বেশি আক্রান্ত সংখ্যালঘুরা
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ৬:৩২ অপরাহ্ন


দেশে ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ঘিরে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক কারণে ঘটেনি, বরং এসব ঘটনা সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত। পুলিশ সদর দপ্তরের এক বছরব্যাপী পর্যালোচনায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানানো হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য যাচাই করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান বা ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিপরীতে ৫৭৪টি ঘটনাকে পুলিশ ‘সাম্প্রদায়িক নয়’ বা সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যাচাইকৃত এসব তথ্য থানায় দায়ের করা মামলা (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগপত্র এবং চলমান তদন্তের হালনাগাদ নথি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রদায়িক উপাদানযুক্ত ৭১টি ঘটনার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল মন্দির ভাঙচুর, যা সংখ্যায় ৩৮টি। এছাড়া মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ৮টি, চুরির ১টি এবং ১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে প্রতিমা ভাঙার হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত করাসহ অন্যান্য ২৩টি ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ মোট ৫০টি মামলা দায়ের করেছে এবং ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ২১টি ঘটনায় অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক নয় এমন ৫৭৪টি ঘটনার বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, এসবের পেছনে প্রধানত পারিবারিক বা প্রতিবেশী বিরোধ, জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্বশত্রুতা কাজ করেছে। এর সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবেশী বিরোধের জেরে ৫১টি, জমিসংক্রান্ত বিরোধে ২৩টি, চুরির ঘটনায় ১০৬টি এবং পূর্বশত্রুতার জেরে ২৬টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ১৭১টি অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং ৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যান্য সাধারণ অপরাধের ঘটনা ছিল ১৩৮টি। এসব ঘটনায় ৩৯০টি নিয়মিত মামলা এবং ১৫৪টি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা হয়েছে। পুলিশ এসব ঘটনায় মোট ৪৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, এই পার্থক্যটি অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। সব অপরাধই গুরুতর এবং সব অপরাধীরই জবাবদিহি প্রয়োজন। তবে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এটিই প্রমাণ করে যে, সংখ্যালঘুরা ভুক্তভোগী হওয়া অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান সাধারণ অপরাধপ্রবণতা থেকেই ঘটে।

প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, দেশে প্রতি বছর সহিংস অপরাধে গড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যা সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে। তবে বিদ্যমান সূচকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উন্নত পুলিশিং, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ার ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এই প্রতিবেদন কোনো সমস্যাকে অস্বীকার করার জন্য নয়, বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে অপরাধপ্রবণতার একটি তথ্যভিত্তিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার না করে গঠনমূলক সমালোচনা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানানো হয়েছে।