
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় এক অভিনব জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি খাতায় উপজেলার ১২৭টি পূজামণ্ডপের জন্য ১,১৪৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন দেখানো হলেও বাস্তবে বেশিরভাগ মণ্ডপই থাকছে অরক্ষিত। সরেজমিনে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত আনসার সদস্যদের বদলে ইউনিফর্ম পরিয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে ‘কামলা’ ভাড়া করে লোক দেখানো নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারের বরাদ্দ করা প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি অসাধু চক্র। শান্তিপূর্ণ পূজা উদযাপনে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এই ঘটনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ফটিকছড়ি ও ভুজপুর থানার ১২৭টি মণ্ডপকে ঝুঁকির ভিত্তিতে তিন শ্রেণিতে ভাগ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত ১,১৪৮ জন প্রশিক্ষিত আনসার সদস্য মোতায়েনের কথা। এজন্য সরকার জনপ্রতি দৈনিক ৪৭৫ টাকা হারে মোট ২৮ লক্ষ ৬৬ হাজার ২০০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বুধবার (১ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার সুয়াবিল বারমাসিয়া দুর্গামণ্ডপে গিয়ে কোনো পুরুষ আনসার সদস্যকে পাওয়া যায়নি। সেখানে দায়িত্বরত দুই নারীর নামও সরকারি তালিকায় নেই। মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবলা কুমার দে বলেন, “আনসারের কোনো সদস্যই এখানে আসেনি। নুরুল করিম নামে এক ব্যক্তি ১৮০০ টাকায় তিনজন লোক ঠিক করে দিয়েছেন, যারা আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাজ করছে।”
একই চিত্র ভুজপুর পূর্ব-ফটিকছড়ি মাতব্বর পাড়া সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে। সেখানে তালিকাভুক্ত ছয়জনের কেউই উপস্থিত নেই। তবে ইউনিফর্ম পরা চারজনকে পাওয়া যায়, যারা নিজেদের দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে ভাড়া করা ‘কামলা’ বলে দাবি করেন। মন্দির কমিটির সদস্য সাংবাদিক সুমন দে বলেন, “এমন ঘটনা সরকারের সদিচ্ছাকে ব্যর্থ করে দেবে এবং মণ্ডপে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে।”

এই নজিরবিহীন অনিয়মে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফটিকছড়ি থানা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রতন কান্তি চৌধুরী। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খাঁন বলেন, “রাষ্ট্র যাদের মাধ্যমে নিয়ম পরিচালনা করবে, তারাই যদি অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তবে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা আনসার ভিডিপি কার্যালয়ের প্রশিক্ষক মো. মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে বিষয়টি নজরে আসার পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আনসার-ভিডিপি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য রেঞ্জের উপমহাপরিচালক ড. মো. সাইফুর রহমান বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “কিছু মণ্ডপে আনসার সদস্যদের অনুপস্থিতি এবং ভুয়া নাম ব্যবহারের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শান্তিপূর্ণ পূজা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”