বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

ফুল ফোটার রহস্য

প্রকাশিতঃ বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০১৬, ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

flowerগাছে গাছে অসংখ্য ফুলের সমারোহ দেখে সবাই বুঝতে পারে প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে। আবার প্রকৃতিতে বসন্ত আসি আসি করলে শীতপ্রধান দেশগুলোয়ও সাদা তুষারের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ফুলের পাপড়ি। আবার একেক ফুল একেক সময় ফোটে। কোনোটা বসন্তে, কোনোটা আবার গ্রীষ্মকালে। সবার মনে তাই প্রশ্ন জাগে, উদ্ভিদকে তাহলে কে বলে দেয় এখন ফোটার সময় হয়েছে?

গবেষকরা বলছেন, উদ্ভিদের ফুল ফোটানোর এই চক্রের পেছনে কাজ করে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া। অ্যাপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এই জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেওয়া থাকে।

গবেষকদের মতে, জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকা- শুরু করার জন্য হুকুম করে। আবার অন্যভাবেও বলা যায়। আমরা যেমন ঘড়ি বা ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখি আর যন্ত্রগুলো সময় হলেই অ্যালার্ম বাজিয়ে আমাদের বলে দেয় এখন সময় হয়েছে। বিষয়টা অনেকটা সে রকম। অ্যাপেটেলা১ জিনটি অ্যালার্মারের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি আর এই অ্যালার্মিংয়ের কাজটা অ্যাপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

শুধু তা-ই নয়, উদ্ভিদের মধ্যে অ্যাপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা, নিষ্ক্রিয়তারও ব্যাপার আছে। এই জিন যদি সক্রিয় থাকে তাহলে ফুল ফোটে। আর যদি কোনো উদ্ভিদে জিনটা নিষ্ক্রিয় থাকে সেটায় ফুল ফোটা প্রায় অসম্ভব। তবে ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কা- পত্রবল্ল হয়ে ওঠে।

অ্যাপেটেলা১ হচ্ছে প্রভুসুলভ একাকী একটি জিন। ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্লান্ট ডেভেলপমেন্টাল জেনেটিকস গবেষণাগারের গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, এটি প্রোটিন তৈরি করতে পারে। তার তৈরি প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো-সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে।

প্রায় এক দশক আগে অ্যাপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা অ্যাপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সঙ্গে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীতে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, পুষ্পায়নের কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী। এই পদার্থের কারণেই ফুলের কুড়ির আবির্ভাব হয়ে গাছে। সে পদার্থটির তারা নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (Florigen)।

ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার হচ্ছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিকসের গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, ‘আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তদৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোন জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।’

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটা যন্ত্রপাতির জন্য একটা করে সুইচ আছে। আর সেই লাখ লাখ সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে। আর আপনি এর মধ্যে যেই সুইচটি চাপ দিলে শহরে সাইরেন বেজে উঠবে সেটা চিনে ফেললেন। এর মানে হলো একটা বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়তো কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন। এটা আপনার ঘরের বাতির সুইচের ক্ষেত্রেও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়তো আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ারকুলার ছেড়ে দিতেন!

গবেষকরা বলছেন, অ্যাপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন অ্যাপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হল উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদের একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো। এতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায়। তখন পাতার পরিবর্তে ফুল গঠনের দিকে তারা ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছে। যেমন : আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ ইত্যাদি। এগুলো প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এই পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো অ্যাপেটেলা১-এর কাছে পৌঁছে যায় আর অ্যাপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করার সময় হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের ওপর। নেচার ক্যালেন্ডার থেকে জানা যায়, কিছুদিন আগে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কি না ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্টের সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH)-এর অধীনে। এতে, ব্রিটেনের নাগরিকদের দেওয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH-এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে অ্যাপেটেলা১-এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে জিন প্রকৌশলের দিকে বিজ্ঞান আরো একধাপ এগিয়ে গেল। গবেষকরা বলছেন, এই আবিষ্কারের ফলে প্রজননকারী এবং চাষিদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাড়িক্ষত সময়ে ফুল বা ফসলের উৎপাদন করতে। এতে উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফুল কিংবা ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে। দক্ষ চাষাবাদের সুযোগও আরো বাড়বে।

সূত্র : বিজ্ঞানপত্রিকা