২৩ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, বুধবার

ইউরোপের সবুজ প্রকৃতির মুগ্ধতা…

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ১৫, ২০১৯, ২:৪১ অপরাহ্ণ

জেনেভা লেকের ধারে সস্ত্রীক লেখক

মো. আবদুল মান্নান : দশ দিন অনেক সময়। মনে হয় সেই দুনিয়াকাঁপানো দশ দিন। স¤প্রতি সরকারি কাজের অংশ হিসেবে অল্প সময় হলেও ইউরোপের বেশ ক’টি দেশ দেখার সুযোগ পাই। পুরো ভ্রমণই হয় সড়কপথে। সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবসহ একই বাহনে এ ধরনের ভ্রমণের কোনো জুড়ি নেই। প্রতিদিন হাজার কিলোমিটারের অধিক জার্নিতেও যেন ক্লান্তি নেই, বিষাদ নেই, বিরক্তি নেই। বিরামহীন এক আনন্দযাত্রা। নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়াম-জার্মানি-ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড-জুরিখসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান, দর্শনীয় স্থাপনা, নান্দনিক প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য, জলপ্রপাত এবং বিশ্ববিজ্ঞান প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার নানা আয়োজন, নানা উপকরণ, নানা অর্জন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়। সড়কপথে গমন করায় ইউরোপের অকল্পনীয়, অসাধারণ সবুজ প্রকৃতির মুগ্ধতায় সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। সবুজের এমন বাহার, এমন প্রাণ, এমন সমারোহ কোথাও আগে দেখিনি। শীতে তৈরি মানুষগুলো যেন চিরসবুজ, চির প্রাণময়, তারুণ্যজয়ী, নিসংশয়, নির্ভার অথচ কর্মব্যস্ততায় দ্রুতগামী।

২. মুক্ত ইউরোপ জুড়ে সড়কপথে, রেলপথে, আকাশপথে কেবল সর্বগ্রাসী মানুষের বিচরণ। বাধাহীন, বিপত্তিহীন এক আকাশের তলে জীবনানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ। কেউ কাউকে প্রশ্ন করছে না, অথচ ঊর্ধ্বশ্বাসে যন্ত্রদানব হয়ে ছুটছে মানুষ দেশ থেকে দেশান্তরে। সবুজ বনভ‚মি, প্রাণময় জীবন্ত বৃক্ষরাজি, ফুলে ফুলে উদ্ভাসিত সারি সারি গাছের নান্দনিক সৌন্দর্য আমার হৃদয়কে আন্দোলিত করে, মোহিত করে। ভাবছি, এমন সাজানো প্রকৃতি কি ইউরোপে প‚র্বেও ছিল? শীতের দেশে, বরফের সাদা প্রান্তরে, পাথরের বুক বিদীর্ণ করে নয়নভোলানো এত সবুজ কীভাবে সম্ভব! ঘুরতে ঘুরতে মনে মনে বহুবার গেয়েছি-‘যে তুমি আলো দিতে প্রতিদিন স‚র্য উঠাও, ওদের বুঝিয়ে দাও সে তুমিই পাথরেও ফুল যে ফোটাও’। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা প্রার্থনাধর্মী এ গানের কলি।

৩. বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে জেনেছি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদের অন্যতম প্রধান কিংবদন্তি, বিশ্ব পুঁজিবাদের ভিত কাঁপানো মতবাদ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের” জনক কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩) তাঁর ঐতিহাসিক ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর’ শুরুতে বলেছেন, “ইউরোপ ভূত দেখেছে, কমিউনিজমের ভূত”। আমস্টার্ডাম থেকে ব্রাসেলস্ যাওয়ার পথে মনে পড়ছিল কার্ল মার্ক্স তাঁর সেই ঐতিহাসিক ম্যানিফেস্টোটি ১৮৪৮ সালে ব্রাসেলসে বসেই রচনা করেছিলেন। তবে আজকের পরিবর্তিত ইউরোপে এসবের ছিটেফোঁটাও নেই। এ প্রজন্মের সেলফোন তারুণ্যের মাঝে বিগত প্রায় দুশ’ বছরের ঝড় তোলা শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থার এমন কালোত্তীর্ণ প্রেসক্রিপশন নিয়ে কোনো বাকবিতণ্ডা বিদ্যমান আছে বলে মনে হয়নি। আজকের এই ইউরোপের ভূত দেখার তো প্রশ্নই আসে না। আলো ঝলমলে আকাশ ছোঁয়া উন্নয়নের ¯্রােতে যেন ভূতের বাড়িঘরও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সর্বত্র মানুষের অবাধ বিচরণ, মনুষ্য পদচিহ্নবিহীন একটি স্থান বা এক টুকরো ভূমিও বোধকরি ইউরোপের কোথাও অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত জয় করার শ্বাশত নেশায় অবিচল অবিনাশী মানুষের দল। জন থেকে জনপদে, সীমানাছাড়া, ভিসাহীন মানুষের অন্তহীন মিছিল যেন অনন্তকাল চলবে। সীমান্ত বাধা, প্রাচীরের বাধা, ভাষার বাধা, মুদ্রার বাধা এমন কি খাদ্যের বাধাও তারা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। দেখে দেখে ভাবছিলাম, সত্যিই কি মানুষ একদিন ভিসামুক্ত পৃথিবী পাবে?

৪. গোটা ইউরোপেই প্রযুক্তির সুবাতাস বয়ে যাচ্ছে। মানুষ এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সুফল ঘরে তুলছে। তবু দেখা যায় সর্বত্র স‚র্যালোক থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি, প্রবহমান বাতাস থেকে উইন্ড মিলের বিদ্যুতে কৃষিকাজ চালানো, পানিকে শাসন করে চলেছে যাবতীয় সমৃদ্ধির সকল সোপান। বলা যায়, প্রকৃতির বাতাস, স‚র্যের আলো, সমুদ্রের জলরাশি সবই মানুষের শাসনের আওতায় চলেছে। সবুজ বনায়ন, ফলজ বৃক্ষের পৃথক খামার, অর্গানিক খাদ্য উৎপাদন পুরোদমে চলেছে। প্রকৃতির সকল বিরূপতাকেই তারা জয় করতে অভ্যস্ত এবং আত্মবিশ্বাসী। যেন যেখানেই অভিশাপ সেখান থেকেই এদের আশির্বাদের যাত্রা শুরু। কোথাও বিশাল জলরাশি, কোথাও আবার বরফের বিস্তীর্ণ পাহাড় সব এলাকাই হয়ে উঠেছে দুনিয়ার পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

জানা যায়, নেদারল্যান্ডস কেবল টিউলিপ ফুলের রকমারি চাষ করে এবং যথাযথভাবে এর উপস্থাপন করে বছরে লক্ষ লক্ষ পর্যটককে আকৃষ্ট করে চলেছে। সুইজারল্যান্ড প্রকৃতি প্রদত্ত বরফ আর ‘রাইন ফলস’ প্রদর্শন করে কোটি পর্যটকের মন জয় করছে। ফরাসীরা এক ‘আইফেল টাওয়ার’ দিয়ে পুরো পৃথিবীকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন মি. আইফেলকে প্রণতি জানাতে। তেমনি জার্মানদের আছে ভাঙা বার্লিন প্রাচীরের রেখাচিহ্ন।

৫. ভ্রমণের এক পর্যায়ে জেনেভা থেকে জুরিখ শহরে যাত্রা করি। সবাই একই মার্সিডিস বেঞ্চ মাইক্রোবাসে সকাল বেলায় রওয়ানা হই। জেনেভার H+ হোটেল থেকে চেক-আউট হয়ে সঙ্গে থাকা মালামাল গাড়িতে নিয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল ঝলমলে আকাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছি। ট্রাফিক সিস্টেম গোটা ইউরোপেই শতভাগ ইলেকট্রনিক। জেনেভা থেকে জুরিখ প্রায় ৫ ঘণ্টার রাস্তা। মাঝপথে আসতেই আকস্মিক বাসের সবাই বিস্মিত হয়ে যাই। পেছন থেকে দ্রুতগামী একটি পেট্রল-কার আমাদের বাসের সামনে এসে যায়। গাড়ি থেকে আলোর সিগনালে ভেসে আসছে follow me। আমরা সবাই হতবাক। আমাদের ড্রাইভার কি কোন বড় অনিয়ম করলো?

জানা গেল, এটি ট্রাফিক পুলিশের গাড়ি। সামনেই কোনো ট্রাফিক পুলিশের স্টেশনে গিয়ে আমাদের নেমে যেতে হবে। মিনিটখানেক যেতেই high way থেকে ডাইভারসন রোডে প্রবেশ করলো আমাদের বাস। একটি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে থামতেই আমরা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, what’s wrong brother? ড্রাইভার বেশ সুদর্শন, সৌম্য, ভদ্র, স্মার্ট লোক। তাকে আমি মজা করে নাম দিয়েছি আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাস থেকে সবাই নিচে নেমে দাঁড়াই।

জানা গেল, আমাদের বাসে বহন করা মালামালের (luggage) ওজন প্রায় একশ কেজি বেশি আছে। সড়কে বসানো ইলেকট্রনিক স্কেলে তা ধরা পড়েছে। একইসাথে ট্রাফিক বিভাগ জানতে পেরেছে, ওজন বেশি হওয়ার কারণে বাসটি এর স্বাভাবিক গতিতে ছিল না। যাক, অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হলো প্রায় এক ঘণ্টা পরে। আমাদের ড্রাইভার-এর পয়েন্ট কাটা গেল, ৫০০ ফ্রাঙ্ক জরিমানা হলো এবং ড্রাইভারকে তার কোম্পানি থেকে অন্য একটি গাড়ি এনে এসব মালামাল শিফট করে যেতে হবে।

তাই হলো, একটি ছোট মাইক্রো এলো। সকলের লাগেজ উঠানো হলো। মহাসড়ক ধরে আবার যাত্রা। শাস্তি হিসেবে আমাদের ড্রাইভার বড় গাড়ির পরিবর্তে আগামী ছয়মাস একটি ছোট্ট গাড়ি চালাবে। বিনাবাক্যে সব কিছু মেনে নিয়ে এক পড়ন্ত বিকেলে শান্তির শহর জেনেভা এসে পৌঁছি। প্রযুক্তির কী বিস্ময়কর ব্যবহার। ট্রাফিক বিভাগের কর্তব্যবোধ কত বড়। এদের দেশপ্রেমবোধ কতটা প্রবল। অবশিষ্ট সময় এ নিয়েই সবাই আলোচনা করি। আমরা বলছি, পনের জন মানুষের মধ্যে মাত্র ১০০ কেজি ওজন অতিরিক্ত, তাতে কী এমন ক্ষতি হতো? আমাদের high way-গুলো কোনোক্রমেই রক্ষা করতে পারছি না ম‚লত: ‘ওভার ওয়েট’ বা মাত্রাতিরিক্ত ওজনের যানবাহনের কারণে।

৬. এক সন্ধ্যায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে নেদারল্যান্ডের রাজধানী ‘হেগ’ শহরে যাই। এত নিবিড় অরণ্যপ্রধান সবুজ শহর আগে আর কোথাও আমার চোখে পড়েনি। যেন সবুজ বনানী ঘেরা শান্ত, স্মিগ্ধ এক স্বর্গীয় দ্বীপ। গাড়ি থেকে নেমে বাসার দিকে পা রাখতেই দেখি, নিচতলার এক ফ্ল্যাটের জানালার পর্দা খানিকটা ফাঁক করে দেয়া আছে। গøাসের ভেতর থেকে চুপচাপ বসে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে একটি স্বাস্থ্যবান বিড়াল। দেখে মনে হয়েছে ফ্ল্যাটের গৃহকর্তাগণ যে যার নৈমিত্তিক কর্মে আছে, বাসায় শুধু সেই একা। পথচারি মানুষের যাতায়াত, গতিবিধি সতর্কভাবে লক্ষ করছে সে। আমি হাতের ক্যামেরা নিয়ে কাছে গেলেও সে দিব্যি নির্ভয়ে বসে আছে। যেন বুঝতে পেরেছে, আমরা তার বাসার কোনো অতিথি নই। তবে বড় বড় চোখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে, কে কোন দিকে যাচ্ছে। ভাবছি বিড়ালটিকে পর্দা ফাঁক করে দেয়ার কারণেই বোধ হয় তার এমন নিঃসঙ্গ প্রহরগুলো মোটামুটি আনন্দে কেটে যাচ্ছে। অন্যথায় হয়তো সে অনেক বিষণ্নতায় মন খারাপ করে অস্বস্তিতে পড়তো। হয়তো বা নিরানন্দ এমন একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে আত্মহননের পথ বেছে নিত। কারণ তারও তো জীবন আছে, মন আছে, দেখার দু’টি উজ্জ্বল চোখ আছে। এখন গৃহকর্তার জন্য দীর্ঘপথ চেয়ে থাকাতেও সে আনন্দ পাচ্ছে এবং নিজে একটি গুরুত্বপ‚র্ণ দায়িত্ব নিয়েই বেঁচে আছে। যেন ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’। আসলে দায়িত্ব কর্তব্যহীন অকর্মন্য জীবন মানে মৃত্যুর নামান্তর। নিত্য অপেক্ষমাণ বিড়ালটির কর্তব্যপরায়নতা আমাকে আনন্দদান করেছিল।

লেখক : বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম