সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

অ্যামেরিকান কোর্টে একদিন : প্রেমে পড়াটা তাহলে ভুল হয়নি

| প্রকাশিতঃ ২ অক্টোবর ২০১৯ | ২:১৯ অপরাহ্ন


শেখ মোহাম্মদ জুলফিকার বিপুল : অনেক রাত, রাস্তার একবারে অন্ধকার কোণা থেকে হুট করে বিকট সাইরেন বাজিয়ে, হাজার পাওয়ারের লাইট জ্বালিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি আমার পিছু নেয়। নিয়ম হচ্ছে তখন সাথে সাথে গাড়ি থামাতে হবে। আমি তাই করি। পেছনের গাড়িটার ছাদ থেকে ফ্ল্যাড লাইটের মতো কিছু একটা জ্বলে উঠে আমার চোখ ঝলসে দেয়। তারপর যা হয় সেটা আমি কোনো দিন ভুলিনি।

একজন পুলিশ অফিসার ধীর পায়ে গাড়ির জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখেই সাথে সাথে আমি ভদ্রমহিলার প্রেমে পড়ে যাই। হয়ত তখন আমার বয়স নিতান্তই কম ছিল। সবে নিকলাজ কেইজের ‘রাইজিং এরিজোনা’ মুভিটা দেখেছি সেখানে ঠিক এরকম একজন পুলিশ অফিসার…

আমি আমার প্রিয় সব নায়িকা মেরিল স্ট্রিপ, মনিকা বেলুচি বা সুচিত্রা সেন সবাইকে ভুলে যাই, এমনকি শাট্‌ল ট্রেনে দেখা চিটাগাং ইউনির্ভাসিটির ওই মেয়েটাকেও আমি ভুলে যাই। আমার মাথায় যেন জীবনানন্দ দাশ বা হেলাল হাফিজের লেখা কোনো লাইন বা কোনো ভায়োলিনের সূর বাজছে। কিন্তু মহিলা এসবের কিছুই বুঝলনা গম্ভীর আর ঠাণ্ডা চোখে, আসলে বলা ভালো শকুনের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একহাত পিস্তলে অন্য হাত ডান্ডায়। বলল- লাইসেন্স এন্ড রেজিস্ট্রেশন প্লিজ!

আমার লাইন্সেস, ইনস্যুরেন্স আর অন্য সব ঠিক আছে কিন্তু গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এক্সপায়ার হয়ে গেছে প্রায় বছর খানেক আগে। খুবই ইনোসেন্ট চেহারা নিয়ে বললাম-এক বৃদ্ধার কাছ থেকে সদ্য গাড়িটা কিনেছি আমার কাছে রেজিস্ট্রেশন করার মতো টাকা নেই তবে খুব তাড়াতাড়ি আমি এটা করে ফেলবো। মহিলা আমার কাগজপত্র নিয়ে তার গাড়িতে চলে গেল। একটু পর ফিরে আসে। আমাকে এক গাদা প্রশ্ন করে। আমার মেজর কি, ডর্মে থাকি কিনা, এখন কোথায় যাচ্ছি… আমাকে কিছু উপদেশও দেয় কখনো যাতে এলকোহল নিয়ে গাড়ি না চালাই, স্পিডিং না করি…।আমি জোরে জোরে দুই দিকে মাথা নেড়ে বলি-কখনোই না, আমি এই জীবনে এলকোহোল তো দূর সিগারেটও খাইনি, বাকি জীবনেও এসবের কাছেও যাবো না। দেখে মনে হলো আমার নিরীহ চেহারা দেখে ইমপ্রেস হয়েছে। এই যাত্রায় কিছু করবে না।

আমার ধারণা ভুল, যাবার সময় একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো ২৫০ ডলার ফাইন। আমি মহিলার নিষ্ঠুরতায় হতভম্ব হয়ে বসে থাকি, প্রেমভাব দূর হয়ে যায়। টাকার এই এমাউন্ট আমার জন্য অনেক।

তখন ‘নেহান’ নামে একটা প্রেসে আমরা গরিব স্টুডেন্টরা কাজ করতাম। বলতাম ‘কামলা দিতে যাই’। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা। শেষ রাতের দিকে মাথা ঘুরতে থাকে। নিজেকে আর মানুষ মনে হয় না, সাধক মনে হয়। যেন আমি এই দুনিয়ার সুখ-দুঃখ সব কিছুর অনেক উর্ধ্বে।

বাসায় এলে এক ভাই ছিল, সে আমাকে বলল-চিন্তা করো না, ডিউ ডেইটে কোর্টে যাও জাজ সাহেবকে বুঝিয়ে বলো। আমারও এরকম হয়েছে দেখো কিছুই হবে না। তারপর আমাকে শিখিয়ে দেয় কী বলবো।

জীবনে কোনোদিন কোর্টে যাইনি আমার ফ্রিকড আউট হবার দশা। কিন্তু সেই ভাই ঠিক বলেছিল।

ধার্য্য তারিখে সকালে আমি আদালতে যাই। পেছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসি। সামনে দেখি ওই অফিসার বসে আছে একেবারে নির্মোহ চেহারা। কী ভয়ানক মনে হতে থাকে তাকে! অথচ প্রথম দেখাতেই আমি কিনা তার প্রেমে পড়েছিলাম। আমার ডাক আসে, জাজ সাহেব জানতে চায় বলে- মিঃ শেখ তুমি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলে কেন? আমি হড়বড় করে আমার সব দুঃখের কাহিনো বলতে থাকি- চারদিন ধরে এক নাগারে নেহানে কাজ করে সেদিন আমি ঘুমিয়ে পড়ি। রাতে ঘুম থেকে উঠে দেখি কোনো খাবার নেই তাই কোবর্ন্সে খাবার কিনতে যাচ্ছিলাম, তারপর ফাইনাল উইকের চাপ, দেশের জন্য মনখারাপ…

তিনি বলেন-তাই বলে এক্সপায়ার কাগজপত্র নিয়ে…
বলেই উনি থেমে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বলেন-আচ্ছা যাও তোমার ফাইন হাফ করে দিলাম। কবে দিতে পারবে।

বললাম- ইসন্টলমেন্ট করে দিলে দুই তিন মাস লাগবে। আমার টাকা আসলেই আমি এবার না খেয়ে হলেও গাড়ির কাগজপত্র ঠিক করে ফেলবো।

উনি হেসে উঠলেন। বললেন বুঝতে পারছি তোমার অনেক কষ্ট হবে। তাহলে এক কাজ করো কোর্টের খরচ হিসেবে ৩০ ডলার দিয়ে দাও। এই টাকাটা কি তোমার আছে?

বললাম-না হুজুর, আমি পে’চেক পাবো আরো দুই তিন দিন পর। আজকে কোর্টে এসেছি কিছুটা বাসে আর বাকিটা হেঁটে।

জাজ সাহেব বললেন- আচ্ছা দেখি তোমাকে যিনি ফাইন করেছেন তিনি কী বলেন। আমার মন আবার খারাপ হলো, মনে মনে বলি প্লিজ নো…নট হার…নট দ্যাট ক্রুয়েল লেডি…

পেছন থেকে সেই পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়ায়। জাজ সাহেব তাকে প্রশ্ন করে- যদি মিঃ শেখ এর পুরো ফাইনটা মাফ করে দিই আপনার কি কোনো আপত্তি আছে?

আমি নিশ্চিত ছিলাম এই মহিলা বলবে- ফাইন ডাবল করে দেয়া হোক।

কিন্তু আমি অবাক হয়ে শুনি তিনি বলছেন- না, কোনো আপত্তি নেই। ইট সিমস হি ইজ এ ভেরি হাম্বল বয়…

কোর্ট থেকে চলে আসার সময় দেখি এই প্রথম তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

যাক প্রেমে পড়ে যাওয়াটা তাহলে ভুল ছিল না!