
জিন্নাত আয়ুব : মূলত সংস্কৃতির সমঝদার তিনি। শৈশবে আপন মনে সুর তুলেছেন, টুকটাক গান করেছেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে যুক্ত হয়েছেন নাটকে। অভিনয় করেছেন মঞ্চ নাটকে। সংস্কৃতাঙ্গন মানে পরিশুদ্ধতার প্রতীক, সুন্দর, সাম্যের চিরায়ত আহ্বান। সেই আহ্বান জানাতে জানাতেই পার করে দিতে চেয়েছিলেন ছোট্ট এই জীবনতরী।
গান-নাটক, সংস্কৃতির অবগাহনে জীবনের সৌন্দর্য্য, মর্মার্থ শেষতক খুঁজতে না পারলেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে সুর-সংস্কৃতির সেই আহ্বান আর সুন্দর-সাম্যের বার্তা নিয়েই অহর্নিশ পথ চলছেন মাঠপর্যায়ে। বলছিলাম কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিনা সুলতানার কথা; যিনি কর্ণফুলী নদীর বিশালতায় দাঁড়িয়ে নিজের বিশালতাকে মেলে ধরছেন, তুলে ধরছেন মানুষের কল্যাণে নিত্য মানবিক সুর তুলে।
ইউএনও শাহিনা সুলতানার জন্মস্থান কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার জানঘর গ্রামে হলেও বেড়ে উঠা চট্টগ্রাম শহরে। বাবা আয়কর আইনজীবী থাকার সুবাদে পড়াশোনা, বেড়ে উঠা- দুটোই চট্টগ্রামে। ভাগ্যক্রমে কর্মস্থানও চট্টগ্রামে হওয়ায় চট্টগ্রামের মানুষের সেবা করার সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছেন অনুক্ষণ। তাই তো এখানে পদায়নের ছয় মাসের মধ্যেই জয় করেছেন কর্ণফুলী নদী আর নদীপাড়ের মানুষের মন।
শাহিনা সুলতানা প্রাথমিক পাঠ নেন চট্টগ্রামের হালিশহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ এবং তারপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ) থেকে অনার্স-মাস্টার্স।
সখের বশে অভিনয় অনেক সময় জীবনের স্থায়ী পাট-পঠন কিংবা পেশা হয়ে ওঠে, বাঁক নেয় অভিনয়শিল্পে। কিন্তু না, শাহিনার সেটা হয়নি, স্রেফ শখের আবর্তেই রয়ে গেলো অভিনয়টা। তারপর গাঁটছড়া বাঁধতে চেয়েছিলেন শিক্ষকতায়, জ্বালাতে চেয়েছিলেন সমাজে শিক্ষার মশাল। সেটাও হয়ে উঠলো না। শেষতক তুখোর মেধাবী শাহিনা সুলতানার ঠাঁই হলো বিসিএস ক্যাডারে।
মেধার স্ফুরণ ঘটিয়ে উত্তীর্ণ হলেন ২৮ তম বিসিএস অর্থনীতি ক্যাডারে। প্রথম পোস্টিং প্ল্যানিং কমিশনে। সেখানে থাকলেন ৪ বছর আট মাস। এরপর সচিবালয়ে এলজিইডি মন্ত্রাণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে। সেখানে ৩ বছর কাটানোর পর গত বছরের শুরুর দিকে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৩ মাসের জন্য অ্যাটাচমেন্টে আসেন। করোনার কারণে ৬ মাস অ্যাটাচমেন্ট থাকার পর গত বছরের ৩০ জুলাই কর্ণফুলী উপজেলায় ইউএনও হিসেবে যোগ দেন শাহিনা সুলতানা।
এখানে যোগ দিয়ে যথারীতি খুলে দেন মানবিক কর্মের ঝাঁপি, ব্রতী হন প্রজাতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ কর্মচারী হওয়ার। সেই লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে প্রথম যে কাজটি করেছেন তা হলো- কর্ণফুলী উপজেলাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি ভাতাপ্রাপ্তির যে অ্যাকাউন্ট, সেটি পটিয়া থেকে কর্ণফুলী উপজেলায় নিয়ে আসার উদ্যোগ। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা ২০-৩০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অশীতিপর শরীর নিয়ে পটিয়ায় গিয়ে ভাতা তুলুক ইউএনও শাহিনা সুলতানা তা মানতে পারেননি। মুক্তিযোদ্ধারা এখন বাড়ির পাশেই পায়ে হেঁটে ভাতা তুলতে পারেন। এজন্য ইউএনও’র জন্য দোয়ার ভাণ্ডার খুলে রেখেছেন কর্ণফুলী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা।
খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও মাদকের বিস্তার রোধ, অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভাপতি হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রায় প্রতিদিনই ছুটতে হয় উপজেলার নানা জায়গায়। অবৈধভাবে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে মধ্যরাতেও ছোটেন কর্ণফুলী নদীতে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করে সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনাসহ করতে হয় নানাবিধ কর্মসম্পাদন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপজেলার সরকারি কাজের সমন্বয়কারী হিসেবেও কাজ করতে হয় তাঁকে।
ইউএনও শাহিনা সুলতানা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়েই ইউএনওদের কাজ করতে হয়। তবে নারী হিসেবে বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকি তো থাকেই। স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ঝুঁকি তো আছেই; পরিবারের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়। কখনো কখনো রাতের বেলায় কোনো অভিযান চালাতে গেলে কিছু অসুবিধায় পড়তে হয়। আবার সমাজব্যবস্থায় এখনো নারীবিদ্বেষী কিছু মানুষও আছে। এসবও মোকাবিলা করতে হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের বিরাগভাজনও হতে হয়। এরপরেও জনগণের জন্য ভালো কিছু করতে পারার আত্মতৃপ্তি কিংবা অনভূতিই আলাদা।’
তাঁর মতে, লেডি অফিসারদের কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। নারী হওয়ায় মেয়ে বা বোন হিসেবে সহজেই অসহায় মানুষ নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারেন। তাতে সমাধানও সহজ হয়। নারীরা দায়িত্ব পালনেও অধিক যত্নবান। সব মিলিয়ে ঝুঁকি থাকলেও নারী কর্মকর্তারা কিন্তু মাঠ প্রশাসনে খুব ভালো করছেন। আমিও ভালোটা করতে চাই যে কোনো মূল্যে, সর্বাগ্রে।-যোগ করেন ইউএনও শাহিনা সুলতানা।
শাহিনা সুলতানারা দুই বোন এক ভাই। ভাই মারা গেছেন। বোন বিদেশে থাকে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত। স্বামী মোহাম্মদ নিয়াজ মোরশেদ সাইথইস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা। এই দম্পতির মেয়ে সামরিন নামিরাহ্ ও ছেলে সানাফ নুযায়ের। বাবা এম এ হাই ভূঁইয়া আয়কর আইনজীবী আগেই বলা হয়েছে, মা মরিয়ম আকতার গৃহিণী।
বর্তমানে মুজিববর্ষের প্যাকেজ আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে ২৫টি ঘর নির্মাণ করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ইইউএনও শাহিনা সুলতানা। এসবের নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিছুদিনের মধ্যে ঘরহীন অসহায় ২৫ পরিবারকে সেসব ঘরের মালিকানা বুঝিয়ে দেবেন। এগুলো সময়মত হস্থান্তর করতে রাতদিন পরিশ্রম করেছেন পীড়ন ভেবে নয়, অসীম আনন্দে। কারণ অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর মাঝেই তাঁর আনন্দ, যত সুখ।
বলাবাহুল্য, ছোটবেলায় প্রচুর বই পড়েছেন শাহিনা সুলতানা। কিন্তু প্রতিদিন হরেক রকম মানুষকে পড়তে গিয়ে, সমাজকে জানতে গিয়ে এখন আর তেমন বই পড়া হয় না। তবুও ন্যূনতম সময়-সুযোগ পেলে বইতেই নিমগ্ন হন, নিজেকে সঁপে দেন বইয়ের পাতায়। পড়ুয়া এই মানুষটি অস্ট্রেলিয়া গিয়েও পড়েছেন। সেখানকার নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের উপর নিয়েছেন উচ্চতর ডিগ্রি।
একুশে/জেআই/এটি