শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পৃথিবীতে আসার গ্লানি, সঙ্গে সঙ্গেই দুই টুকরো হলো নবজাতকের হাত!

| প্রকাশিতঃ ২৭ অগাস্ট ২০২১ | ১২:১০ অপরাহ্ন

এম কে মনির : চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বাধনিক প্রযুক্তি, আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা ও ভারতের ব্যাঙ্গালুরু, সিঙ্গাপুর, ইউরোপের আদলে সেবা প্রদানের ঘোষণা দিয়ে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল। চট্টগ্রামের অত্যাধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসার স্থান হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠান দ্রুতসময়ে আস্থা অর্জন করলেও এবার হাসপাতালটিতে সিজারিয়ান অপারেশনে নবজাতকের হাত ভেঙে ফেলার অভিযোগ ওঠেছে।
সিজারিয়ান অপারেশনে প্রধান চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে সিজার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এক প্রসূতির পরিবার। এ ঘটনায় ওই ভুক্তভোগী প্রসূতির স্বামী মো. সালাউদ্দিন হাসপাতালের চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের অনুলিপি চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছেও পাঠিয়েছেন।

২১ আগস্ট ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রবিউল হোসেন এর কাছে দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সাবরিনা সুলতানাকে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর থেকে সাবরিনা সুলতানা ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (অবস এন্ড গাইনী) ডা. শিরিন ফাতেমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। একইদিন সকাল ১০টায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সাবরিনার একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের পর থেকে শিশুটির বাম হাত অচল দেখতে পেয়ে নবজাতকের মা-বাবা ডাক্তারদের কাছে এর কারণ জানতে চান। তখন তারা সিজারের সময় অসাবধানতাবশত হাতে ফ্র্যাকচার হওয়ার কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এক্সরে রিপোর্টে শিশুটির বামহাত সম্পূর্ণ ভাঙা দেখা যায়।

অভিযোগে নবজাতের পিতা মো. সালাউদ্দিন উল্লেখ করেন- ‘বাচ্চা জন্মের পর এনআইসিইউতে একজন মহিলা ডাক্তার আমাকে নবজাতকের বামহাতটি কম নড়াচড়া করছে জানিয়ে অল্প কিছুক্ষণ পর তিনি বাচ্চার বাম হাতের কনুইয়ের ওপরে ফ্র্যাকচার হয়েছে বলে জানান। একইসাথে ফ্র্যাকচারটি সিজার চলাকালেই হয়েছে বলে তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয় ‘ওইদিন বিকাল ৫টায় একজন অর্থোপেডিক ডাক্তার এসে তাকে (সালাউদ্দিন) বাচ্চার ফ্র্যাকচার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেরে যাবে জানিয়ে দুশ্চিন্তা না করতে পরামর্শ দেন। নবজাতকের পিতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বেশ কয়েকবার ফ্র্যাকচারের বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে ডাক্তাররা প্রতিবারই ‘বাচ্চা সুস্থ হয়ে যাবে’ বলে সান্ত¡না দেন এবং আসল বিষয়টি চেপে যান। পরে কর্তব্যরত ডাক্তার ফয়সালের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে তিনি নবজাতকের বাম হাতের হাড় দু’টুকরো হয়ে যাওয়ার কথা জানান। এসময় ডাক্তার ফয়সাল সালাউদ্দিনকে ২০ আগস্ট বাচ্চার কোমরের কোনও সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয়ে একটি ডায়াগনোসিস করার পরামর্শ দেন। সেই ডায়াগনোসিসের রিপোর্ট এখনো আমাকে দেওয়া হয়নি।-বলেন নবতাজকের বাবা সালাউদ্দিন।

তিনি বলেন, এ অবস্থায় নবজাতকের পিতা হিসেবে দুঃশ্চিন্তা এড়াতে নবজাতকের সকল ডায়াগনোসিস রিপোর্ট হাতে পেতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে কোনও ধরনের ডায়াগনোসিস রিপোর্ট আমাদের দিচ্ছে না।

ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে মো. সালাউদ্দিন নবজাতকের বাম হাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন।

তার প্রশ্ন, ডেলিভারির আগে বাচ্চার অবস্থানে কোনো জটিলতা থাকলে ডাক্তার কেন প্রয়োজনীয় ডায়াগনোসিসের সাহায্য নিলেন না? সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়ার জন্য ডাক্তার কল করতে চাইলেও কেন তারা অনুমতি দিলেন না? বারবার পরিবারের পক্ষ থেকে বাচ্চার ফ্র্যাকচারের বিষয়টি জানতে চাইলেও কেন এড়িয়ে যান? ডায়াগনোসিস রিপোর্টের কপি চাইলে কেন হস্তান্তর করা হচ্ছে না?

নবজাতকের মা সাবরিনা সুলতানা জানান, অপারেশন থিয়েটারে সিজারিয়ান অপারেশন চলাকালে মূল ডাক্তার শিরিন ফাতেমাকে আমি দেখতে পাইনি। সিজার অপারেশন চলাকালে ডাক্তারদের মুখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ‘ম্যাডামকে তাড়াতাড়ি ডাক’ দুইবার কথাটি শুনতে পাই। সিজার সমাপ্তি হলে ডা. শিরিন ফাতেমা সিজার করা জটিল ছিল এবং বাচ্চা হাতে ব্যথা পেয়েছে মর্মে অভিভাবকদের অবগত করেন।

নবজাতকের পিতা মো. সালাউদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ১৯ আগস্ট সকালে আমার স্ত্রীকে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করাই। বেলা আনুমানিক এগারোটায় বাচ্চা প্রসবের সংবাদ পাই। কিন্তু জন্মের পরপরই বাচ্চার বাম হাত নড়াচড়া করছে না, সমস্যা হচ্ছে বলে জানতে পারি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার বিষয়টি জানতে চেয়েও কাক্সিক্ষত উত্তর পাইনি। আমি মনে করি এটি তাদের চরম অবহেলায় হয়েছে। স্বাভাবিক ডেলিভারিতে এরকম হলে বিষয়টি মানতে পারতাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আচরণ আমাদেরকে হতাশ করেছে। তারা কেউ আমাদের সাথে কথাই বলতে চাইছেন না। অবশ্য সম্পূর্ণ মেডিকেল বিল মওকুফ করে আমাদেরকে ছাড়পত্র দিতে চাইলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা বিল মওকুফ চাই না, চাই দোষীদের শাস্তি। বলেন সালাউদ্দিন।

নবজাতকের মামা রবিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমাদের যে ক্ষতি তারা করেছে এটি মানা যায় না। একটা বাচ্চার জীবন শুরুতেই নষ্ট করে দিল।

এ বিষয়ে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (অবস এন্ড গাইনী) ডা. শিরীন ফাতেমা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রোগীটি আমার তত্ত্বাবধানেই ছিল। আমি পাশের ওটিতেই ছিলাম। সিজারেও ছিলাম। ঘটনা হচ্ছে, সিজার অপারেশনটি খুবই জটিল ছিল। বাচ্চার পজিশন উল্টা ছিল, যে কারণে এরকম হয়েছে। সিজারে বাচ্চার পজিশন যথাযথ না থাকলে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। কোনও ডাক্তার ইচ্ছে করে বাচ্চার হাত ভেঙে দেয় না।’
তিনি বলেন, তারা যেভাবে আমাদেরকে দোষারোপ করে যাচ্ছেন তা মোটেও কাম্য নয়। তারা বারবার বলছেন, আমরা কথা বলিনি। আমি তাদেরকে বলেছি এক্সরে রিপোর্ট আসলে বলতে পারব। ধারণা করে তো কিছু বলা যায় না। কিন্তুু তারা সেটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে।

ডা. শিরীন ফাতেমা বলেন, ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল শিক্ষানবিশ দিয়ে সিজার করার হাসপাতাল নয়, এখানে সবাই স্পেশালিস্ট। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দিয়ে চলে এ হাসপাতাল। যা বলা হচ্ছে তা আমাদের সাথে যায় না।

এসময় তিনি বিল মওকুফ করে রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে জানান, বাচ্চাটির হাড় ভেঙে যাওয়ার সমস্যাটি দ্রুত সেরে যাবে। এটি বড় ধরনের কোনও সমস্যা নয়।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি একুশে পত্রিকাকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ এখনো আমি হাতে পায়নি। পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিব। হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনে এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়।