সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

স্বর্ণ চোরাচালান: চট্টগ্রামের সেই আবুকে পুলিশে দিলেন হাইকোর্ট

| প্রকাশিতঃ ৮ জানুয়ারী ২০২৩ | ১০:৪৮ অপরাহ্ন


ঢাকা : প্রসাধনী ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালান করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযুক্ত চট্টগ্রামের আবু আহম্মেদ ওরফে আবুরকে (৪৯) তদবিরকারক কর্তৃক আদালতে হাজির করার পর আগাম জামিন মঞ্জুর করেননি হাইকোর্ট। তাকে কারাগারে পাঠানোর জন্য বলেছেন হাইকোর্ট। সঙ্গে সঙ্গে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।

রোববার (৮ জানুয়ারি) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। আসামি পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম আবুল হোসেন ও মো. হাবিবুর রহমান। আর দুদকের পক্ষে আইনজীবী শাহীন আহমেদ। শুনানি আবু আহমেদ ওরফে আবুকে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

২০২০ সালের ১৮ মার্চ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জাপতনগর এলাকার ফয়েজ আহম্মদ ওরফে বালী সওদাগরের ছেলে আবু আহম্মদ ওরফে আবুসহ ২০জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন, সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক মো. হারুন উর রশীদ।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে আসামিরা সংঘবদ্ধ হুন্ডি (অর্থ পাচার), স্বর্ণ চোরাচালান, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসার সর্বমোট ২০৪ কোটি ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮৭ টাকা জমা ও ২৪০ কোটি ৫ লাখ ১২ হাজার ১৬০ টাকা উত্তোলন করে মানিলন্ডারিং অর্থাৎ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

এছাড়া চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, চাঁদগাও, ফতেহনগর, রাউজান, ফটিকছড়িতে জমি ও বাড়ির মালিক হয়েছেন। দুবাইয়ে তার ২/৩টি দোকান রয়েছে। এছাড়াও আবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় স্বর্ণ চোরাচালানের মামলা রয়েছে।

এ মামলায় চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আগাম জামিন চান আবু আহাম্মদ। হাইকোর্ট তাকে জামিন না দিয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। নির্দেশের পর ২২ ফেব্রুয়ারি আবু আহম্মদ আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন।

ওইদিন চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত মামলার নথি তলব করে ৫ মে আবেদনটি শুনানির জন্য রাখেন। কিন্তু চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে নথি না আসায় ওইদিন ১৩ জুলাই জামিন আবেদনের শুনানি রাখেন। ওই তারিখেও নথি না আসায় ৩১ আগস্ট নথি উপস্থাপন করতে বলে আদালত ৫ সেপ্টেম্বর জামিন আবেদনের শুনানির তারিখ দেন।

পরে নথি আসলেও আবু আহম্মদের সময় আবেদনের কারণে জামিন আবেদনের শুনানি আরও কয়েকবার পেছানো হয়। গত ১৩ নভেম্বর জামিন আবেদনের শুনানির দিন আবু আহম্মদ ফের সময় আবেদন করলে তা না মঞ্জুর করে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

বিশেষ আদালতের আদেশে বলা হয়, গত নয় মাস যাবত জামিন শুনানি না করে আসামি সময়ের দরখাস্ত করে আসছেন। যা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও উচ্চ আদালতের আদেশ অবমাননার শামিল। এরপর আসামি আবু আহম্মদ হাইকোর্টে হাজির হয়ে আগাম জামিন চান। গত ৫ ডিসেম্বর আগাম জামিনের আবেদনের শুনানি শেষে আদালত আদেশের জন্য ৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য রাখেন।

কিন্তু গত ৬ ডিসেম্বর আসামি হাজির হননি। এ পর্যায়ে আবু আহম্মদের আইনজীবী আগাম জামিনের আবেদনটি ‘নট প্রেসড’ (উত্থাপিত হয়নি বলে খারিজ) করতে চাইলে আইনজীবী ফারিয়া বিনতে আলমের প্রতি আদালত উষ্মা প্রকাশ করেন। আর নট প্রেস না করে আসামিকে গ্রেফতার ও তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন। এছাড়া তাকে অবিলম্বে যে কোনো মূল্যে গ্রেফতার করে যথাযথ আদালতে হাজির করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন। পরদিন এ মামলার তদবিরকারককে তলব করেন হাইকোর্ট।

তলবে হাজিরের পর ১২ ডিসেম্বর তদবিরকারক নুর মোহাম্মদ নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তদবিরকারককে আসামিকে কোর্টে হাজির করার জন্য নির্দেশ দেন। আবু আহমেদ ওরফে আবুর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করায় রুল জারি করেন আদালত। তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপারকে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী আদেশের জন্য ৮ জানুয়ারি দিন রাখেন।

এরপর আজ তদবিরকারক আবুকে হাজির করলে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।

সূত্র জানায়, দেশের শীর্ষ স্বর্ণ চোরাকারবারিদের মধ্যে আবু আহম্মেদ অন্যতম। প্রসাধনী ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালান করে আবু এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। তার সম্পত্তির মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ও জাহানপুর এলাকায় ২৪টি দলিলমূলে বহু জমি। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ১৬ কাঠা জমি ছাড়াও চান্দগাঁওয়ে ছয়তলা বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি। এছাড়া রাউজানের ফতেহনগর এলাকায় পল্লী কানন ও পল্লী শোভা কনভেনশন হল, ফটিকছড়ির জাফরনগর এলাকায় দৃষ্টিনন্দন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তিনতলা বাড়ি জাহানারা ম্যানশন, রিয়াজুদ্দিন বাজারে দুটি, স্যানমার ওশান সিটিতে একটি দোকান ছাড়াও দুবাইয়ে দু-তিনটি দোকানের খোঁজ মিলেছে।

২০০৫ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আবুর নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

মামলায় আবু ছাড়াও ইকবাল আহমেদ ওরফে নিজাম, আবু রাশেদ, এস এম আসিফুর রহমান, ওবায়দুল আকবর, রফিক, মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাবলু, ইমরানুল হক কপিল চৌধুরী, এমতিয়াজ হোসেন, মোহাম্মদ আলী, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ এরশাদুল আলম, মো. হাসান, রুবেল চক্রবর্তী, মিনহাজ উদ্দিন, সাগর মহাজন, দিনবন্ধু সরকার, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক কমিশনার শাহজাহান ও টিটু ধরকে আসামি করা হয়।

মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এদিকে এ মামলায় গ্রেফতার ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা গডফাদার আবু সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।