সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

জমি-রেস্টুরেন্টের জিঘাংসা, কাউন্সিলর গিয়াস ও বারকোডের মঞ্জুরুল কী করছেন?

নেপথ্যে স্ট্যান্ডার্ড রোজ ভিলা হাউজিং
| প্রকাশিতঃ ১৯ জানুয়ারী ২০২৩ | ১১:৪৭ অপরাহ্ন

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : জায়গার মালিক না হয়েও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে চট্টগ্রামের শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন একটি রেস্টুরেন্ট (বেভারলি আইল্যান্ড) ও এর জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছে চসিক প্যানেল মেয়র ও ১৫নং বাগমনিরাম ওয়ার্ড কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

একই সাথে অন্যের মালিকানাধীন জায়গায় কাউন্সিলর গিয়াসের সাথে মোটা অংকের অগ্রিম ও মাসিক ভাড়ার চুক্তিতে রাতারাতি বেভারলি রেস্টুরেন্টের জায়গায় নিজের নামে রেস্টুরেন্ট করার অভিযোগ উঠেছে বারকোড রেস্টুরেন্ট গ্রুপের কর্ণধার মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে।

এছাড়া কাউন্সিলর গিয়াসের যোগসাজসে বেভারলি রেস্টুরেন্টের আসবাবপত্র দখল, বেভারলি রেস্টুরেন্টের মালিকের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে ভুয়া নথি ও কাগজ সৃজন করে নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স তৈরির অভিযোগ উঠেছে মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে মঞ্জুরুল হক চসিককে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছেন বলেও অভিযোগ।

অভিযোগে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট জায়গা ও বেভারলি রেস্টুরেন্ট দখলে নিতে ভুক্তভোগী নুরুল আজিমের ট্রেড লাইসেন্সটি অবৈধভাবে বাতিল করিয়ে সেই জায়গার ঠিকানায় কৌশলে মঞ্জুরুল হকের নামে ট্রেড লাইসেন্স করিয়েছেন কাউন্সিলর গিয়াস। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের অনুমতিপত্র পরিদর্শক জাহিদুল আজিম পাভেলকে (কাউন্সিলর গিয়াসের শ্যালক) ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন রেস্টুরেন্টটির মালিক নুরুল আজিম।

বেভারলি রেস্টুরেন্টের মালিক নুরুল আজিমের দাবি, তিনি ওই জায়গার মালিক। তার নামে খতিয়ানে বিএস নামজারি (বিএস খতিয়ান- ১৯, বিএস দাগ- ৩৯৮৩, ৩৯৮৪ দক্ষিণ অংশ) রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়মিত জায়গার খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স ও হোল্ডিং নম্বরসহ প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে ২০১৯ সালে রেস্টুরেন্টটি চালু করেন আজিম। রেস্টুরেন্টে যাতায়াতের জন্য কর্পোরেশনের অনুমতি ও নির্ধারিত ফি (১ লাখ ৭২ হাজার টাকা) জমা দিয়ে নালার উপর ব্রিজও নির্মাণ করেন তিনি।

একুশে পত্রিকাকে নুরুল আজিম জানান, সম্প্রতি রেস্টুরেন্টটির ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য চসিকের দামপাড়া কার্যালয়ে গেলে তাকে জানানো হয় তার রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। নথি পর্যালোচনা করে তিনি জানতে পারেন, কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দীন নিজেকে ওই জায়গার মালিক দাবি করে বারকোড গ্রুপের মালিক মঞ্জুরুল হকের সাথে রেস্টুরেন্ট ভাড়ার চুক্তি করেছেন।

আজিম জানান, এ ব্যাপারে আমি জানতে চাইলে কাউন্সিলর গিয়াসের সাথে আমাকে যোগাযোগের পরামর্শ দেন চসিকের অনুমতিপত্র পরিদর্শক পাভেল। পরবর্তীতে কাউন্সিলর গিয়াসকে পাভেল নিজেই ফোন দিলে আমাকে অফিস থেকে বের করে দিতে বলেন গিয়াস।

আজিমের দাবি, জায়গার সমস্ত কাগজপত্র তার নামে থাকলেও স্ট্যান্ডার্ড রোজ ভিলা হাউজিং লিমিটেড নামে একটি হাউজিং পেশিশক্তি ব্যবহার করে তার জায়গা দখলের পাঁয়তারা করে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। বিষয়টি কাউন্সিলর গিয়াসও জানতেন। ২০১৯ সালে বেভারলি রেস্টুরেন্ট উদ্বোধনের সময় বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির সাথে কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিনও অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।

আজিমের অভিযোগ, সম্প্রতি জায়গার ঝামেলা মেটাতে গিয়াসের সহযোগিতা চাইলে তিনি হঠাৎ করে ১০ গন্ডা জায়গা চেয়ে বসেন। এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রতিপক্ষের (স্ট্যান্ডার্ড রোজ ভিলা হাউজিং লিমিটেড) সাথে মিলে গিয়াস সম্প্রতি নিজের ক্ষমতাবলে বেভারলি রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে বারকোডের মঞ্জুরুল হকের নামে নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ব্যবস্থা করেন।

এদিকে, কোনো উপায় না পেয়ে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সরাসরি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর কছে লিখিত অভিযোগ করেন আজিম। একই মাসের ১৮ তারিখ অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করে এ বিষয়ে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মেয়র রেজাউল। যার প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য্য করে চসিক রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ।

পরবর্তীতে নুরুল আজিম ও মঞ্জুরুল হককে পুনরায় শুনানির নোটিশ [স্মারক নং- ৪৬.১১.১৬০০.০০৩.৯৯.০৫৯.২০২০-১১ (৩)] পাঠিয়ে ১৮ জানুয়ারি ট্রেড লাইসেন্সের মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন চসিক রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ।

জানা যায়, শুনানিতে নূরুল আজিম উপস্থিত থাকলেও মঞ্জুরুল হক অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজে না গিয়ে বারকোড গ্রুপের ম্যানেজারকে পাঠান। শুনানিতে স্ট্যান্ডার্ড রোজ ভিলা হাউজিং লিমিটেডের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, শুনানি চলাকালে ট্রেড লাইসেন্সধারী সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্টের মালিকানা নিশ্চিতের জন্য জায়গার কাগজপত্র চাওয়া হলে স্ট্যান্ডার্ড রোজ ভিলা হাউজিং কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি। তবে কাউন্সিলর গিয়াস কী মূলে ওই জায়গার মালিক সেজে মঞ্জুরুলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন সে ব্যাপারে কিছু জানতে চায়নি চসিক রাজস্ব বিভাগ।

এ অবস্থায় জায়গার কাগজ পেশ করতে সময়ের আবেদন করলে আগামি রোববার (২২ জানুয়ারি) শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য্য করেন চসিক’র রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ।

জানতে চাইলে চসিক রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বৃহস্পতিবার রাতে একুশে পত্রিকাকে বলেন, বেভারলি আইল্যান্ড রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে বারগুইজ টাউনের মালিক মঞ্জুরুল হকের নামের ট্রেড লাইসেন্স করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা শুনানি করছি। আগামী রোববার সংশ্লিষ্টদের নিজেদের স্বপক্ষে কাগজ নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। বিষয়টি পুংখানুপুংখ পর্যালোচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো, যাতে অন্যায়ভাবে কেউ সাফারার না হয়।

অন্যদিকে, শুনানি শেষ হওয়ার আগেই (শুনানি কার্যক্রম চলাকালে) বুধবার (১৮ জানুয়ারি) রাতারাতি বেভারলি রেস্টুরেন্টের নাম পাল্টে বারগুইজ টাউন রেস্টুরেন্টের উদ্বোধন করেন বারকোড গ্রুপের মালিক মঞ্জুরুল হক।

মীমাংসার আগেই মঞ্জুরুলের এমন কাজকে চসিক’র প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও নিজেদের পেশিশক্তি প্রদর্শন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তা নয়, বেভারলি রেস্টুরেন্টের যাবতীয় জিনিসপত্র নিজের কব্জায় নিয়ে সেগুলো নিজের রেস্টুরেন্টে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে।

বেভারলি রেস্টুরেন্টের জায়গায় বারগুইজ টাউন চালু প্রসঙ্গে নূরুল আজিম বলেন, ‘মঞ্জুরুল হক একসময় আমার বেভারলি রেস্টুরেন্টে পাশে রেস্টুরেন্ট চালুর ইচ্ছার কথা জানিয়ে আমার কাছে জায়গা চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি দিইনি। সুযোগ পেয়ে সেই ক্ষোভ থেকে তিনি আমার রেস্টুরেন্টকেই নিজের করে নিয়েছেন। এমনকি আমার বেভারলি রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড ছাড়া প্রতিটা জিনিস তিনি অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ব্যবহার করছেন।’

এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করেও মঞ্জুরুল হককে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস নােট পাঠিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলে একুশে পত্রিকাকে হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এরপর বিষয় উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের স্বার্থে তার বক্তব্য জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালে তিনি কিছুক্ষণ পর ফোন করবেন জানিয়ে ফিরতি মেসেজ দেন। দীর্ঘসময় পরও তিনি যোগাযোগ না করায় বেভারলি রেস্টুরেন্টের জিনিসপত্র দখলে নেওয়া ও অন্যের ট্রেড লাইসেন্স ছিনিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে ফিরতি ভয়েস নােট পাঠানো হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নুরুল আজিম ওই জায়গার মালিক নয়, সে ছিলো মালিকের কেয়ারটেকার। নকল দলিল তৈরি করে সে অবৈধভাবে জায়গাটি দখল করেছিল। সে যদি জমির মালিক হয় তাহলে তাকে কাগজ দেখাতে বলুন। সে একজন প্রতারক। আমি ২৫ বছর ধরে এই এলাকার কাউন্সিলর, আমি সব জানি। আমি প্রকৃত মালিকের নাম্বার দিবো, আপনি তার সাথে কথা বলে সত্যটা জেনে নিন।’

‘জায়গার বিষয়ে নুরুল আজিম আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে জায়গার কাগজ দেখাতে বলেছি, অভিযোগ দিতে বলেছি। যত কিছু হোক লিখিত অভিযোগ ছাড়া তো আমি ব্যবস্থা নিতে পারি না। কিন্তু সে আমাকে দলিল কিংবা অভিযোগ কোনোটিই দেয়নি। তার জায়গার মালিকানা যদি বৈধতা থেকে থাকে তাহলে সে আমাকে এসব দিল না কেন।’ – যোগ করেন গিয়াস উদ্দিন।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি জমির মালিক নই। যিনি জায়গার মালিক তিনি অন্যজনকে জায়গাটি ভাড়া দিতেই পারেন। আর ট্রেড লাইসেন্সে হস্তক্ষেপ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা বানোয়াট কথা। আমি একটা দায়িত্বশীল জায়গায় আছি। আমার কোনো ধরনের অন্যায় করার সুযোগ নেই। অন্যজনের জায়গায় থেকে সে কীভাবে নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্সে করে- এটা তো বড় অপরাধ।

কাউন্সিলর গিয়াস জায়গাটির মালিক নন বলে স্বীকার করলেও একুশে পত্রিকার হাতে আসা একটি নথি পর্যালোচনা করে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মঞ্জুরুল হককে জায়গা ভাড়া দেওয়ার চুক্তিপত্রে গিয়াস নিজেকে ওই জায়গার মালিক বলে উল্লেখ করেছেন। চুক্তিপত্রে দেখা যায়, গত বছরের ১৪ অক্টোবর ৭ বছরের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করেন উভয়পক্ষ।

গিয়াসউদ্দিনকে জামানত বাবদ দুই চেকে ১৫ লাখ [১ম চেকে (নং-৫৪৮৪৯১১) ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের নামে ১০ লাখ ও ২য় চেকে (নং-৭২১০৩৪৮) সিটি ব্যাংকের নাম ৫ লাখ] টাকা দেন মঞ্জুরুল হক।

এছাড়া প্রতি মাসের দোকান ভাড়া অগ্রিম বাবদ প্রদত্ত জামানত থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা সমন্বয় করে অবশিষ্ট ১ লাখ টাকা দোকান ভাড়া হিসেবে পরিশোধের কথাও উল্লেখ আছে কাউন্সিলর গিয়াস ও মঞ্জুরুল হকের চুক্তিপত্রে।