বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

রাজপথে সক্রিয় হচ্ছে ধর্মভিত্তিক দল-সংগঠন

| প্রকাশিতঃ ৩ অক্টোবর ২০২৩ | ৯:০৮ পূর্বাহ্ন


ঢাকা : ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন নেতারা। তবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় অধিকাংশ দল। এ ইস্যুতে পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে রাজপথের কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছে তারা। একই সঙ্গে চলছে জোট গঠনে নানা তৎপরতা।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আলেম-ওলামাদের মুক্তিসহ নানা দাবিতে ইতোমধ্যে কর্মসূচি পালন করা এসব দল ও সংগঠন চূড়ান্তভাবে অক্টোবরের মাঝামাঝি কিংবা শেষ দিকে মাঠে নামতে পারে বলে জানা গেছে। উদ্দেশ্য- নির্বাচনকে উসিলা করে সরকারকে দাবি বাস্তবায়নে বাধ্য করা। কোনো কোনো সংগঠন তলে তলে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

মূলত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে ইসলামী দলগুলো। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের তৎপরতা শুরু করেছে এসব দল ও সংগঠন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও অরাজনৈতিক দাবি করা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি দল নানা ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে প্রায় কাছাকাছি সময়ে একযোগে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত পর্যায়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা যায়।

ঢাকামুখী কর্মসূচি হেফাজতের : দীর্ঘদিন পর গত মাসে সংগঠন পুনর্গঠন করে হেফাজতে ইসলাম। এরপর পুনর্গঠিত সংগঠনের প্রথম সভাতেই ঢাকামুখী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে আগামী ২৮ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন করার ঘোষণা দেয়া হয়। গত মাসের মাঝামাঝি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় সভা করে এই সিদ্ধন্তের কথা জানান হেফাজত নেতারা। ওই সভায় আলোচিত ও বিতর্কিত হেফাজত নেতা মামুনুল হকসহ কারাবন্দি সব আলেমের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে ৩৬ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। সভায় হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষিত ১৩ দফা বাস্তবায়নের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

হেফাজতে ইসলামীর আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, বর্তমানে এই সরকার আলেম-ওলামাদের কারাবন্দি রেখে কষ্ট দিচ্ছে, তার বদলা আল্লাহর কাছে চাই। এই জালেম সরকারকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিক। সরকার আমাদের বেশ কিছু আলেম-ওলামাকে এখনো জেলে বন্দি করে রেখেছে।

তিনি কারাবন্দি সব আলেম-ওলামার দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়ে বলেন, অন্যথায় যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সরকারের শত্রু নই এবং হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে আমাদের কোনো প্রার্থিতা নেই। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে নামানো আমাদের এজেন্ডা নয়। হেফাজতের ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার কোনো সুযোগও নেই। হেফাজত তার সুনির্দিষ্ট ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

এদিকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে হেফাজতে ইসলাম ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের গতিবিধিসহ সব কার্যক্রম সরকারের নজরদারিতে আনার পরামর্শ দিয়েছেন গোয়েন্দারা। এ সংগঠনগুলো যেন বিএনপি-জামায়াতের দিকে ধাবিত হতে না পারে, সে বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত বলেও মনে করেন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিশেষ করে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের কথা উল্লেখ করা হয়।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেয়া এক প্রতিবেদনে এসব পরামর্শ দিয়েছে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, হেফাজত ইসলামকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে নামানোর পরিকল্পনা চলছে। এ উপলক্ষে প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।

তবে একাধিক ইসলামি দলের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ধর্মভিত্তিক দলগুলো ভালোই চাপে আছে। তাদের ওপর সরকারি মহলের শক্ত নজরদারি রয়েছে। যাতে ইসলামি দলগুলো কোনোভাবেই বিএনপির দিকে না ঝুঁকে পড়ে। মহল বিশেষের এই তৎপরতা বিবেচনায় রেখেই ইসলামি দলগুলো রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ধর্মভিত্তিক ইসলামি দল ১০টি। এর মধ্যে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দল আছে ৬টি। সেগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন ছাড়া বাকি পাঁচটি দলই একসময় বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল। এখন মূল দলের কোনোটিই বিএনপির সঙ্গে নেই। তবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও ইসলামী ঐক্যজোট নামে দুটি খণ্ডিত অংশ বিএনপির সঙ্গে আছে, যাদের নিবন্ধন নেই।

কৌশলে এগোচ্ছে জামায়াত : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কর্মসূচি পালন করছে দলটির নেতাকর্মীরা। দলটির চাওয়া জামায়াতের আমিরসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনেকটাই কৌশলে এগোচ্ছে দলটি। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

জামায়াতের শীর্ষ একাধিক নেতা বলেছেন, ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি পালন করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বাধা আসায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নতুন কৌশলে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন তারা। এজন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি। তবে এই কর্মসূচি বিএনপির সঙ্গে একই মঞ্চে হওয়ার সম্ভাবনা কম। পৃথকভাবে যুগপৎ আন্দোলনের ভিত্তিতে হবে। দাবি নিশ্চিতে সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গেও ঐক্যের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

সম্প্রতি জামায়াতের এক কর্মসূচিতে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, দাবি আদায়ে আমাদের আমাদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। তাই সামনে আমরা নতুন ধাঁচে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামব। তিনি বলেন, আমাদের দাবি একটাই, কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। এই এক দফা দাবিতেই আন্দোলন করব। অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যৌথ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামব।

বড় কর্মসূচির দিকে ইসলামী আন্দোলন : জাতীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বড় কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে ধর্মভিত্তিক বড় সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়াও তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ। একই দাবিতে এবার বিএনপির সঙ্গে যুগপতে না থাকলেও কঠোর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে দলটি। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৭ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। ইতোমধ্যে টানা গত দুই মাস সারাদেশে কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। ঢাকার বাইরে কর্মসূচি শেষে গত শুক্রবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আগামী ৭ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশ, ১৩ অক্টোবর ঢাকায় শ্রমিক সমাবেশ এবং ২০ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র-যুব সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।

ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা বলছেন- দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবেন না তারা। দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। দলটির দাবি, আগামী নির্বাচনের আগেই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে।

দলটির আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, ভয়াবহ সংঘাতের মুখে নিপতিত দেশ। সরকারের একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটা দেশকে ভয়াবহ সংঘাতে নিয়ে যাবে। এ সংঘাত থেকে কেবল রক্ষা করতে পারে জাতীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার আগেই জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে। অন্যথায় একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করলে নির্বাচন কমিশনকে চরম খেসারত দিতে হবে।

দলটির মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সরকার বিরোধী দলগুলোর মতো আমরাও একই দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। সামনের দিনে ঢাকায় বড় কর্মসূচি আসবে। আমাদের প্রস্তুতি চলছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার পতনের দাবিতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে না থাকলেও আমাদের দাবি একটাই। এই সরকার যদি আমাদের দাবি না মানে তাহলে সব বিরোধী দলকে একটা ব্যবস্থার মধ্যে আসতে হবে। প্রয়োজনে ঐক্য হতে পারে। এই দাবিতে বিএনপির সঙ্গে ইসলামিক আন্দোলনের যোগাযোগ রয়েছে।