মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

কোটি টাকার স্বপ্ন এখন ধুলোয় মিশে

যুক্তরাষ্ট্র থেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরলেন ৩৬ বাংলাদেশি
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২০ জানুয়ারী ২০২৬ | ৭:৫৬ অপরাহ্ন


স্বপ্নটা ছিল আকাশের ওপারে, আমেরিকার চকচকে জীবনে। সেই স্বপ্নের জন্য বাজি ধরা হয়েছিল ভিটেমাটি, পরিবারের শেষ সম্বল, এমনকি মায়ের গয়নাটুকুও। কিন্তু আটলান্টিকের ওপারে সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন। দালালের প্রলোভনে সর্বস্ব হারিয়ে, কেউ কেউ পায়ে শিকল পরা অবস্থায় শূন্য হাতে ফিরে এলেন নিজ দেশে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন ৩৬ জন বাংলাদেশি নামলেন, তখন তাঁদের চোখেমুখে ছিল কেবলই হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ।

অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই ৩৬ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ২৯৩ জন বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হলো। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে তাঁদের জরুরি সহায়তা ও খাবার প্রদান করা হয়।

ফেরত আসা এই ৩৬ জনের দলে রয়েছেন নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম। উন্নত জীবনের আশায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই যাত্রায় দালালদের হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। আজ তিনি সব হারিয়ে নিঃস্ব। একই পরিস্থিতির শিকার গাজীপুরের সুলতানা আক্তার। তিনি ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন, যা এখন পুরোটাই জলে গেল।

নোয়াখালীর আরও তিন যুবক—মির হাসান, রিয়াদুল ইসলাম ও রাকিব—যথাক্রমে ৫৫ লাখ, ৫০ লাখ ও ৬০ লাখ টাকা খরচ করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিয়ে দেশে ফিরলেন। ঋণের দায়ে জর্জরিত এই মানুষগুলো এখন জানেন না, দেশে ফিরে পাওনাদারদের সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন বা কীভাবে এই বিশাল ঋণের বোঝা শোধ করবেন।

ফেরত আসাদের জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৩৬ জনের মধ্যে ২১ জনই নোয়াখালীর বাসিন্দা। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের ২ জন এবং মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনা জেলার একজন করে রয়েছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, ফেরত আসাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই প্রথমে বিএমইটি-র ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধপথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।

শরিফুল হাসান আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে ১,৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গিয়েছেন, যার মধ্যে ৯৫১ জনই নোয়াখালীর। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সরকার যখন ব্রাজিলে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দিচ্ছে, তখন তারা আসলেই সেখানে কাজ করতে যাচ্ছেন নাকি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একেকজন ৪০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে যে শূন্য হাতে ফিরছেন, এই দায় কার? যেসব এজেন্সি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আইসিই-এর মাধ্যমে চার্টার্ড ও সামরিক ফ্লাইটে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করা হয়েছে, যেখানে অনেককে অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে।

জাহিদুল ইসলাম, সুলতানা আক্তার, মির হাসান, রিয়াদুল ইসলাম এবং রাকিবের মতো তরুণরা আজ যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তা দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। প্রবাসে সুখের আশায় তাঁরা যে চড়া মূল্য দিলেন, তা কি শুধুই তাঁদের ব্যক্তিগত ক্ষতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে এক বিশাল সিন্ডিকেটের কারসাজি—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।