মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

অপারেশন জঙ্গল সলিমপুরে কোথায় ভুল ছিল র‍্যাবের?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২০ জানুয়ারী ২০২৬ | ৮:৪১ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরেই অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু গত ১৯ জানুয়ারি সেখানে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি অভিযান ব্যর্থ হওয়া নয়, বরং আমাদের অপারেশনাল পরিকল্পনার বড়সড় গলদগুলোকেও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।

র‍্যাবের নায়েক সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া এবং তার সহযোদ্ধাদের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সন্ত্রাসীরা কতটা সংগঠিত এবং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যায়, এই ট্র্যাজেডিটি আসলে একটি ভুল এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার করুণ পরিণতি। র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ সূত্র মতে, গত ছয় মাস ধরে এই অপারেশনের ছক কষা হলেও বাস্তবায়ন ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সন্ত্রাসীরা এতটাই প্রযুক্তিনির্ভর ছিল যে, সিসি ক্যামেরায় র‍্যাবের গাড়ি দেখেই তারা আগেভাগে সতর্ক অবস্থান নেয়।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই টার্গেট করে রেখেছিল। তাকে ধরে নিয়ে উলঙ্গ করে অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়, হাত-পা থেঁতলে দেওয়া হয় এবং সবশেষে তার নিজের পিস্তল দিয়েই পায়ে গুলি করে নির্মমভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এই নির্মমতার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে তার পরিবারের ওপরও। মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‍্যাব-৭ কার্যালয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

শামিয়ানার ভেতরে যখন মোতালেব হোসেনের মরদেহ শেষবারের মতো গোসল করানো হচ্ছিল, তখন ৯ বছর বয়সী শিশুকন্যা সিদরাতুল মুনতাহার ‘আব্বু, আব্বু’ চিৎকার আর কান্নার দমক উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয়। স্বামী হারানোর শোকে পাথর স্ত্রী শামসুন্নাহার বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল।’ অন্যদিকে বাবার হত্যার বিচার চেয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে শামিমান জান্নাত প্রশ্ন রাখে, ‘বাবা তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজেই গিয়েছিলেন। কেন তাঁকে মরতে হলো?’

মেয়েটির এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অপারেশনাল প্রস্তুতির দৈন্যদশাটিই সামনে আসে। এটি কোনো সাধারণ বন্দুকযুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল তথ্যের জন্য চালানো একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যেখানে সন্ত্রাসীরা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত, সেখানে হেলমেট ছাড়া কেবল কালো কাপড় মাথায় বেঁধে এবং সেকেলে ১২ বোর শটগান নিয়ে ‘ডুস-ডুস’ আওয়াজ তোলার পরিকল্পনা ছিল কার্যত আত্মঘাতী।

জঙ্গল সলিমপুরের মতো জায়গায় অপারেশন করতে হলে প্রয়োজন ছিল এম-৪ কার্বাইন বা অন্তত বিডি-০৮ এর মতো লাইটওয়েট অ্যাসল্ট রাইফেল এবং সোয়াটের মতো ‘প্রপার কমব্যাট গিয়ার’। সিও সাহেব বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই দায় এড়াতে পারেন না যে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে সদস্যদের পাঠানো হলো।

যদিও জানাজা শেষে র‍্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান দাবি করেছেন, র‍্যাব সদস্যদের আত্মরক্ষায় গুলি করার অধিকার থাকলেও সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতির শঙ্কায় তারা তা করেননি। তবে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত র‍্যাব পিছু হটবে না। পাশাপাশি তিনি অপারেশনের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়টিও খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। পতেঙ্গায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো অভিযানটি তদন্ত করে দেখব—এখানে কোনো ভুলত্রুটি আছে কি না। যদি ভুলত্রুটি থাকে, সেগুলো সংশোধন করে আগামীতে আমরা আরো সফলতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করব।’

অত্যন্ত নির্মম এই ঘটনার পরপরই সরকারের টনক নড়েছে এবং মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে সব বাহিনী মিলে ‘কম্বাইন্ড অপারেশন’ বা যৌথ অভিযান চালানো হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির খবর, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে চড়া মূল্য দিতে হলো, তা কোনোভাবেই পূরণীয় নয়। প্রেস সচিব তার ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনাটি জঘন্য এবং এর সঙ্গে জড়িতরা যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই ঘটনা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভাঙবে না বরং তাদের সংকল্প বা রিজলভকে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে বাস্তবতা হলো, রণাঙ্গনে কেবল আবেগী কথায় মনোবল বাড়ে না; মনোবল বাড়ে যখন একজন সৈনিক জানেন তার হাতে শত্রুর চেয়ে উন্নত অস্ত্র আছে, তার পিঠে সঠিক পরিকল্পনার সুরক্ষা আছে এবং বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত ব্যাকআপ ফোর্স প্রস্তুত আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এখন বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযান নয়, বরং একটি সমন্বিত ও সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিকল্পনা হতে হবে এমন—পুরো এলাকাটিকে একটি নিশ্ছিদ্র কর্ডন বা বেষ্টনীর আওতায় আনা, যেখানে আউটার লাইনে আনসার, পুলিশ ও বিজিবি থাকবে এবং সেকেন্ড লাইন বা ভেতরের স্তরে অভিযানে নেতৃত্ব দেবে সেনাবাহিনী ও র‍্যাব। প্রয়োজনে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এবং ‘কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্স’ বা কিউআরএফ-কে কাজে লাগাতে হবে।

গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী যেমন সফল অভিযান চালিয়ে অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছিল, ঠিক তেমন একটি সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে আসায় আশার সঞ্চার হয়েছে।

নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার এই আত্মত্যাগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আবেগের বশবর্তী হয়ে বা তাড়াহুড়ো করে কোনো অভিযান পরিচালনা করা উচিত নয়। সরকারের ঘোষিত এই ‘কম্বাইন্ড অপারেশন’ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই ‘বারুদের স্তূপ’ নিষ্ক্রিয় করতে হলে সঠিক ‘ইক্যুইপমেন্ট প্রোফাইলিং’, নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের দীর্ঘমেয়াদী অভিযান অপরিহার্য।

মোতালেব হোসেনের রক্ত যেন বৃথা না যায় এবং জঙ্গল সলিমপুর যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি করতে না পারে—সেটাই এখন একমাত্র চাওয়া।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।