চট্টগ্রাম: সকালে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন ‘মউ’। এই শোক সামলাতে পারেননি স্ত্রী। কীভাবেই বা সইবেন? স্বামীকে যে ভালোবেসেছেন অাপন প্রাণের সম। তাই হয়তো পতিহারা পৃথিবীকে বিশ্বাস করতে পারেননি। আজীবন এক সুতোয় বাঁধা ছিলেন দু’জন। জীবনের শেষ দিনেও একই সুতায় বাঁধা পড়লেন এই দম্পতি।
স্বাধীনতার পর থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দোকান দেন গুরা মিয়া। শুরু থেকেই তাকে ‘মউ’ বলে সম্বোধন করতেন শিক্ষার্থীরা। এ থেকেই নিজের দোকানের নাম দেন ‘মউর দোয়ান’। বেশকিছুদিন ধরে হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। শুক্রবার ভোরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল সাড়ে ৮টায় গুরা মিয়া মারা যান। সন্ধ্যা ৬টায় তাকে দাফন করা হয়।
দাফন শেষে ঘরে ফিরতেই পরিবারের সদস্যরা আবারও পেলেন মৃত্যুর সংবাদ। স্বামীর শোক সইতে না পেরে মারা গেলেন মউর স্ত্রী সুরা খাতুনও। আট ঘণ্টার ব্যবধানে স্বামীর সঙ্গী হয়েছেন পরপারের। একইদিনে বাবা-মাকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মউ’র সন্তানরা।
মউ’র ছোট ভাই সুরুজ মিয়া বলেন, বড় ভাইকে কবর দিয়ে আমরা মাত্র ঘরে ঢুকলাম। এসময় দেখি ভাবি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে তাকে দ্রুত মদনহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। কিন্তু এর আগেই তিনি মারা যান। শনিবার সকালে তাকে দাফন করা হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন কিন্তু মউর দোয়ানের (মামার দোকান) নাম শোনেননি এমন কাউকে হয়ত পাওয়া যাবে না। শাটল ট্রেনে চড়ার আগে মউর দোয়ানে বসে সিঙারা-সমুচার সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা না দিলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ধূলিকনার সঙ্গে যেন মিশে আছে ‘মউ’ নামটি। অনেকবার তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়েছিল। কিন্তু, সব সংবাদকে ছাপিয়ে প্রতিবারই তিনি দোকান খুলে বসেছেন। তবে আর তিনি দোকান খুলবেন না। মউর দোয়ান হয়ত ঠিকই থাকবে, দেখা যাবে না শুধু মউকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানাচ্ছেন শোক। মউয়ের স্মৃতিচারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজীব নন্দী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘মউ (মামা) ছিলেন আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কারবর্জিত আধুনিক মানুষ। ২০০৮ সালের দেশজুড়ে সেনা শাসনের জরুরি অবস্থার আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহে মউ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন রান্নার চুলার জন্য কেনা কাঠ! এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু পিএইচডি পণ্ডিতের লেকচার বা পৌণে পিএইচডিদের কচকচানির চাইতেও তাঁর মুখে চট্টগ্রামের ভাষায় ঝারি খাওয়া ছিলো অনেক শিক্ষণীয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, প্রেম, সংঘাত, চ্যারিটি, পাঠচক্র বহুকিছুর কালের সাক্ষী এই মউর দোয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে, না পড়িয়ে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়েই তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন এই মউ। আজ মউ আর নেই। দুনিয়াজুড়ে লাখো ভাইগনা-ভাগনি রেখে চলে গেলেন সকল লেনদেনের ওপারে। অ মউ, ভালা থাইক্ক!’
হামিদ হাসান নোমানী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অড লোমান মউ, তুইত স্যার অইগেউচ। আগে কি খাবি খ, বেয়াগ্গিন গরম এখন লামাইযি, তুই টেয়াঁদিয়েরে আরে সরম দয্যে নে। টেঁয়া ন লাইবু, আগে পেট ভরি খাই ল। তই মামু বিয়ে সাদী নগরয? আঁর মাইরে লইয়েরে একদিন দোয়ানত আইছ’ এভাবেই ছাত্র-শিক্ষক সবার সাথে তাঁর স্বভাবসুলভ আচরণ।’