রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

পোস্টাল ব্যালট ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বিএনপি-জামায়াতের
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ১১:০৪ পূর্বাহ্ন


আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলগুলোর অভিযোগ, পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে জটিলতা, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব এবং নিরাপত্তা দিতে ইসির ব্যর্থতা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

যদিও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ, কিন্তু ঢালাও অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিএনপির অভিযোগ, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করছে, যা নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, প্রবাসী ভোটারদের পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে ৫ কলাম ও ১৪ লাইনের বিন্যাসে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ শেষ লাইনের মাঝামাঝি রাখা হয়েছে। ফলে ব্যালট ভাঁজ করলে প্রতীকটি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, যা জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সংঘবদ্ধভাবে পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ ও একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে থাকার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় ইসির নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে শান্তির স্বার্থে আমরা কর্মসূচি স্থগিত করেছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এবং একটি রাজনৈতিক দল মনে করেছে এটা আমাদের দুর্বলতা। মূলত তারা বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে।

এছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিএনপির অভিযোগ, ফ্যাসিবাদের সময়ে দলের অনেক নেতা বিদেশে নাগরিকত্ব নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর তারা নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আবেদন করলেও প্রার্থিতা নিয়ে ইসি জটিলতা সৃষ্টি করছে।

জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা মাঠ প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জরুরি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তারা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছেন। কারও মনোনয়ন বাতিল করছেন, আবার একই অপরাধে অন্যজনেরটা বৈধ করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও ইসি ব্যবস্থা নিচ্ছে না, অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে না এবং বিভিন্ন জায়গায় তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ইসির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। সম্প্রতি ইসির গেটের সামনে একজন আপিলকারীর ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খোদ কমিশনের সামনে এমন ঘটনা ঘটা মানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

আসিফ মাহমুদ আরও অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় থেকেই ইসি একপক্ষীয় অবস্থান নিচ্ছে। দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের বৈধতা দিতে ইসি ফাঁকফোকর খুঁজছে। শত শত আইনজীবী নিয়ে এসে ইসির ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

রাজনৈতিক দলগুলোর এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, নির্বাচন শব্দটি খুবই স্পর্শকাতর। অভিযোগ ছোট হোক বা বড়, ইসির উচিত সঙ্গে সঙ্গে তা খতিয়ে দেখা এবং জনগণকে জানানো। এতে ইসির ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইসির চোখের সামনে একজনকে পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে, এটা হতে পারে না। এ বিষয়ে তাদের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অভিযোগ থাকবেই। কিন্তু নির্দিষ্ট করে বললে আমাদের বোঝা ও ব্যবস্থা নেওয়া সহজ। ঢালাও অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া মুশকিল। ইসির গেটের বাইরে মারধরের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি রাস্তায় ঘটেছে। ইসি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে, কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কোনো অভিযোগ করেননি।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী মনে করেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অভিযোগ সাধারণ ঘটনা। তবে কমিশনকে আইন ও বিধি মেনেই কাজ করতে হবে, তাতে সিদ্ধান্ত কারও পক্ষে বা বিপক্ষে যেতে পারে।