বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

যেখানে মিশে আছে ইতিহাস আর দীর্ঘশ্বাস

রাঙ্গুনিয়ার চাকমা রাজবাড়ির কথা
এম মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার | প্রকাশিতঃ ১৮ জুলাই ২০২৫ | ১১:৩০ অপরাহ্ন


দেয়ালজুড়ে শেকড় ছড়িয়েছে বুনো লতাগুল্ম, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তরার একেকটি চাঁই। একসময়ের গর্ব আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চাকমা রাজপ্রাসাদ আজ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ধ্বংসস্তূপের উপর। যেখানে একদিন রাজা-রানীর সিংহাসনের অহংকার ছিল, সৈন্যশালার হাঁকডাক ছিল, আজ সেখানে কেবল নির্জনতা আর ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।

চট্টগ্রাম শহর থেকে কাপ্তাই বা রাঙামাটি সড়ক ধরে ঘণ্টাখানেকের পথ পেরোলেই রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির দেখা মিলবে। পিচঢালা পথ পেরিয়ে রাজবাড়িতে ঢোকার মুখে ইটের রাস্তাটিই যেন আপনাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তবে সংরক্ষণের অভাবে সেই অতীতের চিহ্নগুলোও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

ব্রিটিশদের গোলার মুখে জন্ম যে প্রাসাদের

এই রাজবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাকমা জাতির প্রতিরোধ ও টিকে থাকার গল্প। জানা যায়, ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা শেরমস্ত খাঁ রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া এলাকায় একটি জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করে রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজা জান বক্স খাঁর আমলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পার্বত্যবাসী আন্দোলনে জড়ালে ইংরেজ সেনারা কামান দেগে সেই প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে রাজা জান বক্স খাঁ ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত মেনে কর্ণফুলী নদীর উত্তর পারে, বর্তমান দক্ষিণ রাজানগরে এই নতুন রাজপ্রাসাদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রাসাদের প্রবেশপথেই ছিল রাজদরবার, সৈন্যশালা ও বন্দিশালা। পাশেই রয়েছে শান বাঁধানো পুকুর আর একটি বৌদ্ধবিহার, যা আজও রাজাদের ধর্মীয় অনুরাগের সাক্ষ্য দেয়।

একটি রাজপরিবার, একটি অঞ্চলের রূপান্তর

এই রাজবাড়িকে কেন্দ্র করেই একসময় এই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটে। প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে রানি কালীন্দিনীর নামে খনন করা হয় বিশাল ‘সাগর দীঘি’। তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রানীরহাট’। একইভাবে রাজার নামে ‘রাজারহাট’ এবং রাজা ভুবন মোহন রায়ের নামে ‘রাজাভুবন উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে।

অবহেলায় হারাচ্ছে ইতিহাস

পরবর্তীতে চাকমা রাজ্যের রাজধানী রাঙামাটিতে স্থানান্তরিত হলে রাজবাড়িটি ধীরে ধীরে জৌলুস হারাতে থাকে। দুঃখজনকভাবে, রাঙামাটির বর্তমান রাজপ্রাসাদটিও ২০১০ সালে অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকা রাঙ্গুনিয়ার এই রাজবাড়িটি চাকমা জাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি দেখাশোনা করতেন রাজার বংশধর প্রমতোষ দেওয়ান। ২০১৩ সালে তার মৃত্যুর পর এখন তার ছেলে রুমেল দেওয়ান এর দেখভাল করছেন।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

স্থানীয়দের মতে, এই রাজপ্রাসাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারত। এর স্থাপত্য, ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সহজেই আকর্ষণ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম চাকমা সংস্কৃতি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত।

এই চাকমা রাজপ্রাসাদ শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বীরত্বের জীবন্ত দলিল। যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে এই অমূল্য নিদর্শনটি আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যা কেবল একটি অঞ্চলের নয়, পুরো দেশের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।