বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

হারিয়ে যাচ্ছে কাপ্তাইয়ের ঐতিহাসিক পিলারবিহীন মসজিদ

আবছার রাফি | প্রকাশিতঃ ২৮ জুলাই ২০২৫ | ৬:১৭ অপরাহ্ন


সচরাচর যেকোনো মসজিদ পিলারের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে কোনো পিলার ছাড়াই, যেন স্থাপত্যের এক আত্মবিশ্বাসী নিদর্শন। এর নির্মাণে বিদেশি প্রকৌশলী, পাকিস্তানের করাচি থেকে আনা ইট আর এক প্রেরণাদায়ী ইতিহাস—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে স্থাপত্য ও বিশ্বাসের এক অনন্য মেলবন্ধন। এখানে ইট-সিমেন্টের চেয়েও মানুষের শ্রদ্ধা যেন বড় হয়ে উঠেছে। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মসজিদটি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের বারঘোনিয়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে, অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে, গড়ে তোলা হয়েছে এই মসজিদটি। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘কেপিএম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’, যা স্থানীয়দের কাছে ‘বড় মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। এই মসজিদের গোড়াপত্তনের ইতিহাস, বর্তমান সংকট এবং তা উত্তরণে সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

জানা যায়, দাউদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তৎকালীন চেয়ারম্যান আহমেদ দাউদ এইচ. কে.-এর মা হাজিয়ানি হানিফা বাঈ ১৯৬৭ সালের ৮ ডিসেম্বর মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মূলত কর্ণফুলী পেপার মিলের (কেপিএম) শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্যই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। ৮ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের এই মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর ভেতরে একটিও পিলার নেই। ছাদের সম্পূর্ণ ওজন চারটি দেয়াল বহন করছে, ফলে মুসল্লিরা মসজিদের যেকোনো প্রান্ত থেকে ইমামকে সরাসরি দেখতে পান।

১৯৫৯ সালে দাউদ গ্রুপ দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজকল কেপিএমের দায়িত্ব নেওয়ার পর মসজিদটি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এর ছাদের গঠনশৈলীও ব্যতিক্রম। ঢেউটিনের মতো ঢেউ খেলানো ৯টি বিম পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে ছাদটি তৈরি করা হয়েছে, যা কোনো পিলার ছাড়াই পুরো কাঠামোকে ধরে রেখেছে। এই অনন্য স্থাপত্যের কারণে মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন একটি নিদর্শন হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

মসজিদের সব নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছিল পাকিস্তানের করাচি থেকে, আর প্রকৌশলীরা এসেছিলেন ভারত থেকে। নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল। ভেতরের কাঠের দরজা, মোজাইক করা মেঝে, দৃষ্টিনন্দন দেয়াল, একমাত্র গম্বুজ, মিম্বর আর খতিবের জন্য নির্ধারিত কাঠের চেয়ার—সবকিছু আজও সেই অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদে ৮টি প্রধান দরজা এবং প্রাকৃতিক আলোর জন্য গম্বুজ আকৃতির অসংখ্য জানালা রয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে মসজিদের ভেতরটা সবসময় শীতল ও আলোকিত থাকে। ছাদের তিন দিকে ছোট-বড় গম্বুজ ও মিনার এর বাহ্যিক সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক মসজিদের জৌলুস হারাতে বসেছে। কেপিএমের আর্থিক দুরবস্থার ছায়া পড়েছে মসজিদের ওপরও। ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, দেয়াল ও ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, আর মেঝেতে পানি জমে থাকায় মুসল্লিদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মসজিদের খতিব মাওলানা এ টি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় দেয়ালে ফাটল ধরেছে, জমেছে শ্যাওলা। এখন কেপিএম এবং এলাকাবাসীর দানেই মসজিদের ব্যয়ভার চলছে।’

স্থানীয়রা চান, এই স্থাপত্য নিদর্শনটি সংরক্ষণ করে একে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। কারণ এটি শুধু একটি ইবাদতখানা নয়, এটি একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য, গর্ব আর ইতিহাসের অংশ।

এ সময় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা বশির খানের সঙ্গে। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, “১৯৬৭ সালে পেপার মিলের মালিক দাউদ গ্রুপই এটি তাঁর মায়ের নামে বানিয়েছিল। এটি এখন অবহেলিত, কেউ সাহায্য-সহযোগিতা করে না। অনেকেই এসে আশ্বাস দিয়ে যান, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ম্যানেজমেন্টও তেমন কিছু করতে পারছে না। তাই মসজিদটির সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

কথায় আছে, কোনো স্থাপত্য যখন জীর্ণ হয়, তখন শুধু ইট-পাথরই খসে পড়ে না, বিশ্বাসের আশ্রয়ও নড়বড়ে হয়ে যায়। পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ আমাদের শেখায়, স্থাপনা শুধু বিশ্বাসের স্তম্ভের ওপর নয়, দাঁড়িয়ে থাকে ঐক্যের ওপর। পাকিস্তানের করাচি থেকে আনা সামগ্রী দিয়ে গড়ে ওঠা এই মসজিদ আজ আমাদের সুদৃষ্টি ও দায়িত্বের অপেক্ষায়। ইতিহাস আর হৃদয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে কেপিএম মসজিদ আজও যেন নীরবে উচ্চারণ করে চলেছে—হে মানুষ, তোমাদের অন্তরে আলো থাকুক আর মসজিদে থাকুক স্থায়িত্বের দোয়া।