
রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সম্ভাব্য সমাধান হাতে না থাকাকে বাংলাদেশের জন্য ‘কঠিনতম সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
তার মতে, এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গাদের নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে, যারা ক্যাম্পের জীবন মেনে নিতে চাইবে না, যা কেবল বাংলাদেশ নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বড় প্রভাব ফেলবে।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড এনালিটিকস (দায়রা)’ দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “বাংলাদেশের সামনে কঠিনতম সঙ্কট হলো, রোহিঙ্গা সমস্যার সম্ভাব্য কোনো সমাধান আমাদের হাতে নেই। যত দিন যাচ্ছে, সমস্যা তত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কেননা এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতে শিশু-তরুণের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে। এই পরবর্তী প্রজন্ম ইতোমধ্যেই বড় হতে শুরু করেছে। তারা আদৌ আর আশ্রয়-ক্যাম্পের জীবনে থাকতে চাইবে না। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মেনে নেবে কিনা- সেটা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শুরুর দিকের কথা স্মরণ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, “যখন আমাদের ভূমিতে রোহিঙ্গা প্রবেশ শুরু হলো, তখন আমি নিজেও দায়িত্বপ্রাপ্ত একটা জায়গাতে ছিলাম। সবাই ভেবেছিল, এটা সাময়িক সমস্যা। একমাত্র আমি বলেছিলাম, ‘যত দিন যাবে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হবে।’ কেননা তাতমাদোর (মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী) লক্ষ্যই হলো- মিয়ানমারকে সম্পূর্ণভাবে রোহিঙ্গাশূন্য করে ফেলা। সেজন্য প্রত্যর্পণের সুযোগ কোথায়?”
অনুষ্ঠানে বিশ্ব-রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন খুবই কাঠামোগত পদ্ধতিতে হচ্ছে, তেমনি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আক্রমণের মতো হুটহাট যুদ্ধাবস্থারও সৃষ্টি হচ্ছে। এসবের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার।”
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-আমেরিকার মধ্যে একটা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, যেমন- কোয়াডের মতো সংগঠন। কিন্তু হুট করে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে এখন ভারত-চীন একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। এটার ফলে এশিয়ার আরও শক্তিশালী হবার সুযোগ তৈরি হলো।”
সব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব যেভাবে ফ্যাসিবাদকে হটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, তাতে ইতিবাচক হওয়াই যায়। যদিও ১৯৯০ সালেও গণতন্ত্রের ভালো সুযোগ এসেছিল, যে সুযোগ আমরা ক্ষমতা পেতে না পেতেই হারিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “তরুণেরা ভুল করতে করতে শেখে। সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি দেখি, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বাংলাদেশে আমরা ভিশনারি রাজনীতি দেখতে পাবো। সেজন্যই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ‘ভালো কর্মী’ হিসেবে গড়ার উদ্যোগ অপরিহার্য।”