
চট্টগ্রাম মহানগরীর চারটি ওয়ার্ড—লালখান বাজার, শুলকবহর, ষোলশহর এবং উত্তর পাহাড়তলী—পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ। বাড়ি ভাড়ার ঊর্ধ্বগতির কারণে বাধ্য হয়েই তারা পাহাড়ের বুকে আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছেন, আর এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি কিছু অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতি, যারা অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎ ও পানির মতো সুবিধা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে উৎসাহিত করছে। ফলে সমন্বয়হীনতার এক ভয়াবহ চক্রে প্রতি বছরই পাহাড় ধসে ঝরছে বহু প্রাণ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরের একটি হোটেলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা আয়োজিত ‘চট্টগ্রামে পাহাড়ধ্বস ঝুঁকি মোকাবেলায় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি গাইডলাইন বৈধকরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় বক্তারা এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, অতিবৃষ্টি বা পাহাড় কাটার কারণে যখনই মতিঝর্ণা, ষোলশহর বা আকবরশাহ এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বারংবার মাইকিং করেও বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো যায় না। তারা ঘর এবং সহায়-সম্পদ ছেড়ে যেতে নারাজ থাকেন। অনেক সময় তারা উদ্ধারকর্মী ও প্রশাসনকে উল্টো অভয় দিয়ে বলেন, তাদের নিয়ে চিন্তা না করতে, তারা পাহাড়ে ভালো আছেন। কিন্তু এরই মর্মান্তিক পরিণতিতে ঘটে প্রাণহানি। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, কেবল গত ১৬ বছরেই পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২০০৭ সালে লালখান বাজারের ভয়াবহ ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরও আনোয়ারা কেইপিজেড এলাকায় ছায়া খুঁজতে গিয়ে পাহাড় ধসে দুই শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে।
আলোচনায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নাজুক চিত্রও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, নগরে কোনো বহুমুখী বা আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নেই। দুর্যোগের সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো ব্যবহার করা হয়, যেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার চরম অভাব রয়েছে। মানুষ তাদের কষ্টে অর্জিত সম্পদ, গবাদিপশু, স্বর্ণালংকার বা দলিলপত্র অরক্ষিত অবস্থায় রেখে আসতে চায় না। একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, রান্নাঘর, শুকনো খাবার, সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসক এবং একটি মনিটরিং সেলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষক ও পরিবেশবিদরা বেশ কিছু সুপারিশ করেন। তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক, প্রশাসন, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের সমন্বিত উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সরকারের পক্ষ থেকে জমি বরাদ্দ দিয়ে আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে উৎসাহিত করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ইপসার পক্ষ থেকে একটি খসড়া আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি গাইডলাইন উপস্থাপন করা হয়, যেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্কুল কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দেখানো হয়েছে।
ইপসার প্রজেক্ট অফিসার আতাউল হাকিমের সঞ্চালনায় কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আমিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চসিকের শিক্ষা কর্মকর্তা রাশেদা আকতার এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রামের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন। ইপসার রিসার্চ, মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন ম্যানেজার ডক্টর মোরশেদ হোসেন মোল্লা পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্রের গাইডলাইন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।