চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সিএনজি অটোরিকশা চালক সাজ্জাদের হত্যাকাণ্ড ছিল এককথায় নিখুঁত অপরাধের চেষ্টা। একটি লাশ, একটি চুরি হওয়া সিএনজি অটোরিকশা—আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও এর গভীরে যে এমন এক লোমহর্ষক গল্প লুকিয়ে আছে, তা কে জানত? আনোয়ারা থানা পুলিশ সেই গল্পেরই জট খুলেছে, আর তাতে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ঙ্কর চোর চক্র এবং এক সিরিয়াল কিলারের নাম, যার হত্যার ধরন প্রতিবারই একই।
ঘটনার শুরু গত ১৪ সেপ্টেম্বর। ২২ বছর বয়সী তরুণ সাজ্জাদ সেদিন সন্ধ্যায় বটতলী রুস্তমহাট এলাকা থেকে যাত্রীবেশে ওঠা এক লোকের কথায় বরুমচড়ার উদ্দেশে সিএনজি অটোরিকশাটি ছোটান। তিনি জানতেন না, এটিই তার জীবনের শেষ যাত্রা হতে চলেছে। গন্তব্য ছিল বরুমচড়া ইউনিয়নের কানু মাঝির ঘাট এলাকা। সেখানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল একদল হায়েনা—রমজান আলী ওরফে আক্কর, মো. হারুন, সুমন, আশরাফ এবং এই চক্রের মূল হোতা সাইফুল।
পরিকল্পনা মতোই রাত পৌনে আটটার দিকে নুরুল হকের নির্জন ফিশারি খামারের পাশে সাজ্জাদকে সিএনজি থামাতে বাধ্য করা হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিক আক্রমণে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। আসামিরা জোর করে তার মুখ চেপে ধরে খামারের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর গামছা দিয়ে মুখ ও হাত-পা বেঁধে ফেলে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে এবং শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে লাশ খামারের কিনারায় পানিতে ফেলে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল কেবল একটি—সাজ্জাদের সিএনজি অটোরিকশাটি চুরি করা।
এর দুই দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর, ফিশারি খামার থেকে সাজ্জাদের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আনোয়ারা থানা পুলিশ তদন্তে নামে। কোনো ক্লু না থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ খুনিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। একে একে গ্রেপ্তার করা হয় বরুমচড়ার রমজান আলী ওরফে আক্কর ও মো. হারুনকে। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেই বেরিয়ে আসে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল হোতা সাইফুলের নাম।
শনিবার (১১ অক্টোবর) রাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ারা সার্কেলের এএসপি সোহানুর রহমান সোহাগ জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, আন্তঃজেলা সিএনজি চোর চক্রের অন্যতম সদস্য সাইফুলই এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী।
তদন্তে নেমে পুলিশ আরও আঁতকে ওঠার মতো তথ্য পায়। আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনির হোসেন জানান, রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার বাসিন্দা এই সাইফুল এক ভয়ঙ্কর অপরাধী। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই তিনটি হত্যা মামলা রয়েছে এবং অবাক করার বিষয় হলো, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই সে একই কৌশলে ঘটিয়েছে—সিএনজি অটোরিকশা চুরির উদ্দেশ্যে চালককে নির্জন জায়গায় নিয়ে জবাই করে হত্যা। সাইফুল রাঙ্গামাটি থেকে এসে আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও কর্ণফুলী এলাকায় একটি শক্তিশালী চোর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল।
ওসি আরও বলেন, “সাইফুল এবং অন্য আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা সব স্বীকার করেছে। আমরা আশা করছি, এবার এই ভয়ঙ্কর চোর চক্রের শেকড় আমরা উপড়ে ফেলতে পারব।”
একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে এক সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাওয়া এবং একটি আন্তঃজেলা চোর চক্রকে শনাক্ত করার এই সাফল্যকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফুল ইসলাম সানতুও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। একুশে পত্রিকার সাথে আলাপকালে তিনি এই ঘটনাকে আনোয়ারা থানা পুলিশের একটি বড় সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাজ্জাদের মৃত্যু তার পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা হয়তো কখনো পূরণ হবে না। কিন্তু এই তদন্তের মাধ্যমে এক ভয়ঙ্কর অপরাধী চক্রের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ায় ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক সাজ্জাদের জীবন রক্ষা পাবে।