সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

বিদেশ নয়, ছাবেরের ঠাঁই হল কারাগারে

| প্রকাশিতঃ ২৮ জুলাই ২০১৬ | ১১:৪২ অপরাহ্ন

jailচট্টগ্রাম: গত ২৫ জুলাই দুবাই যাওয়ার কথা ছিল প্রবাসী ছাবের আহমদের (৪০)। কিন্তু কথিত ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়ে তার ঠাঁই হয়েছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। অথচ, ওই মামলার এজাহারে নেই কোন সাক্ষীর নাম। উল্লেখ করা হয়নি বাদিনীর মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার। এমনকি যে হোটেলে ‘ধর্ষণ’ করা হয়েছে, তার ম্যানেজার, ওয়েটার কিংবা পার্শ্ববর্তী রুমের কেউ ঘটনা জানতো এমন কোন বর্ণনাও নেই এজাহারে। কম্পিউটার টাইপ করা ওই এজাহারে রয়েছে হাতে লেখা তারিখ ও ‘সালমা’ লেখা স্বাক্ষর।

গত ৪ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানায় রেকর্ড হয় এই ধর্ষণ মামলা। মামলাটির বাদিনীর পুরো নাম সালমা আক্তার পপি (২২)। এজাহারে বাদিনীর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে- স্থায়ী ঠিকানা: নোয়াখালী জেলার চরজব্বার থানার চরহাসেম গ্রাম ও বর্তমান ঠিকানা: চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানার বন্দরটিলার কালাম কলোনী।

অনুসন্ধানে নেমে, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও খোঁজ মেলেনি সালমা আক্তার পপির। এমনকি সন্ধান মেলেনি ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকায় ‘কালাম কলোনী’ নামের কোন স্থানেরও।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার এসআই বিকাশ কান্তি শীল বলেন, মামলার বাদি পপিকে আমিও খুঁজে পাচ্ছি না। বর্তমান ঠিকানায় খোঁজ নেওয়ার জন্য ইপিজেড থানাকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বাদির খোঁজে, তার স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নেওয়ার জন্য নোয়াখালীর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই দুই চিঠির কোন উত্তর এখনো পাইনি।

মামলার এজাহারে বাদিনীর মোবাইল নম্বর নেই কেন প্রশ্নে এসআই বিকাশ বলেন, মেয়েটির কোন আত্মীয় স্বজন নেই। মোবাইলও নেই। তাই নাম্বার ছাড়াই হয়তো অভিযোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ওসি স্যার ভাল জানবেন।

এদিকে আসামি ছাবের আহমেদের আইনজীবী এডভোকেট মো. জসিম উদ্দীন অভিযোগ করে বলেন, বাদশা কন্ট্রাক্টর ও ইব্রাহীম নামের দুইজনের সাথে ছাবেরের পূর্বশত্রুতা ছিল। এর জেরে পুলিশের যোগসাজসে সালমা আক্তার পপি নামের এক নারীকে ভিকটিম সাজিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ কোনোধরনের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই না করে মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এখন বাদশা কন্ট্রাক্টর ও ইব্রাহীম ধর্ষণ মামলাটি আপোষে তুলে নিবে বলে ৬ লাখ টাকা ও একটি অলিখিত চেক দাবি করছে।

তিনি বলেন, গত ২৫ জুলাই দুবাই যাওয়ার কথা ছিল ছাবেরের। এর আগে গ্রেফতার হয়ে গত ১৯ জুলাই থেকে কারাগারে আছেন ছাবের। মামলাটি যে মিথ্যা, তা তদন্তের পর প্রমাণ হবে। কিন্তু বিবাদি ছাবেরের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেল।

অভিযোগ প্রসঙ্গে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিকাশ কান্তি শীল বলেন, মামলা দায়েরর পরদিন পপিকে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাই আমি। কিন্তু চমেকের ফরেনসিক বিভাগের সকল ডাক্তার ঈদের ছুটিতে থাকায় ভিকটিম পপিকে আদালতের মাধ্যমে ডবলমুরিং থানাধীন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে চারদিন রাখি। এরপর ডাক্তারী পরীক্ষা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, গত ১৯ জুলাই নিজের গ্রাম থেকে আসামি ছাবেরকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে সাতকানিয়া থানা পুলিশ। এরপর আসামিকে শনাক্ত করার জন্য ওইদিন আদালতে হাজির হয় পপি। এরপর আদালতের আদেশে আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। আসামিকে আমি গ্রেফতার করিনি, তাছাড়া বাদির সাথে আমি আর যোগাযোগ করতে পারিনি। এখন আমি তদন্ত করে দেখছি, তদন্তে যা পাব, তাই আদালতে উপস্থাপন করবো।

মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, গত ৩ জুলাই রাতে নগরীর লালদীঘির পাড়ের হোটেল তুনাজ্জিনে নিয়ে গিয়ে সালমা আক্তার পপি (২২) নামের এক নারীকে ‘জোরপূর্বক’ তিনবার ধর্ষণ করেন ছাবের আহমদ (৪০)। ধর্ষণের পর ‘ঘুমিয়ে’ পড়ে পপি। পরদিন ৪ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘ধর্ষিতা’ পপি দেখেন ‘ধর্ষক’ ছাবের রুমে নাই। এরপর হোটেল থেকে বেরিয়ে ঘটনা আত্মীয় স্বজনকে জানায় পপি। ওই দিন দুপুর আড়াইটায় তুনাজ্জিন হোটেলের ৫০০ গজ অদুরে অবস্থিত কোতোয়ালী থানায় গিয়ে প্রবাসী ছাবেরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন পপি।

অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিক অনুসন্ধান ছাড়া ঠিকানাবিহীন এক নারীর অভিযোগকে ‘গুরুত্ব’ দিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুততায় মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন কোতোয়ালী থানার ওসি মোঃ জসিম উদ্দিন।

সচেতনমহলের প্রশ্ন, যেখানে মোবাইল ফোন নম্বর ছাড়া একটি জিডি এন্ট্রি হয় না, সেখানে কিছু ছাড়া এধরনের একটি স্পর্শকাতর মামলা হয় কী করে?

৬ লাখ টাকা দিলে মামলা তুলে নেওয়ার অভিযোগ, বাদিনীর খোঁজ না পাওয়া ও মোবাইল নম্বর ছাড়া মামলা রেকর্ড করা প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওসি মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, মামলাটি সম্পর্কে বিজ্ঞ আদালত অবহিত। এ বিষয়ে বিচারকের আদেশ অনুযায়ী মামলার কাজ চলবে। আমি আর কিছু বলতে চাই না।