বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

এই কী করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত!

| প্রকাশিতঃ ২৮ অক্টোবর ২০১৬ | ১:০৪ অপরাহ্ন

mobile courtশরীফুল রুকন : বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সোয়া আটটা। চট্টগ্রাম নগরের ওয়াসা মোড়। বাসা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাচ্ছিলেন একাদশ শ্রেণীর এক ছাত্রী। এসময় মোহাম্মদ নয়ন (২৯) নামের এক যুবক ওই ছাত্রীকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতে থাকেন। একপর্যায়ে মেয়েটি চিৎকার দেয়। তখন দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নয়ন। এ সময় আশপাশের লোকজন নয়নকে ধরে ওই কলেজে নিয়ে যান। পরে সকাল ১০টার দিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ নয়নকে খুলশী থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। এরপর দুপুরে খুলশী থানা পুলিশ নয়নকে নিয়ে যান জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। পরে বিকেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আখতার ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন মোহাম্মদ নয়নকে।

এসব ঘটনার বর্ণনা ও শাস্তির বিষয়টি জানিয়েছেন বৃহস্পতিবার সকালে ওয়াসা এলাকায় টহল পুলিশের দায়িত্বে থাকা খুলশী থানার এসআই শংকর দাশ। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নয়নের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ার শাহারবিলের মাইজঘোনা এলাকায়। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশের মোমিনবাগ আবাসিক এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারার উপধারা (১)-এ বলা হয়েছে, ‘ধারা ৫-এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা ধারা ১১-এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করিবার সময় তফসিলে বর্ণিত আইনের অধীন কোনো অপরাধ, যাহা কেবল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য, তাহার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ‌ঘাটিত হইয়া থাকিলে তিনি উক্ত অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করিয়া এই আইনে নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন।’

অর্থ্যাৎ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই অপরাধ সংঘটিত হতে হবে। তবেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিচার করার সুযোগ পাবেন ওই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু ইভটিজার নয়নকে আটক করার সময় কোনো একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে ছিলেন না। বিষয়টি স্বীকার করে খুলশী থানার ওসি মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সকালে নয়নকে ধরার পর থানায় আনা হয়। এরপর তাকে দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আখতারের দফতরে হাজির করা হয়। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নয়নকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক শারমিন আখতার বলেন, ‘ভুক্তভোগী মেয়েটির বাবা এসে অভিযোগ করেছে। অপরাধটা উৎঘাটিতও হয়েছে। তাই নয়নকে এই অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’

জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে বসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কারাদণ্ড দেওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। এরপর বলেন, ‘বিষয়টা অন্যভাবে দেখছেন কেন? স্বাভাবিকভাবে দেখুন। ইভটিজিংয়ের দায়ে কারাদণ্ড হিসেবে নিউজটা করুন।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মোবাইল কোর্টে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে না। শক্রুতার কারণে যে কেউ সাক্ষী দিলেই রায় দিতে পারে মোবাইল কোর্টের বিচারকরা। ভেজালবিরোধী বিভিন্ন অভিযানের মধ্যেই মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে ভাল হয়। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচার্য বিষয় নিয়ে মোবাইল কোর্ট না হওয়াই ভাল। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়।’

তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত হলেই তিনি আদালত পরিচালনা করে রায় ঘোষণা করতে পারবেন। কিন্তু প্রায় সময়ই দেখা যাচ্ছে পুলিশ ধরে এনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মুখোমুখি করছে। আইনী ঝামেলা থেকে পুলিশ ও বাদী পক্ষ রেহায় পেতে অবৈধভাবে এ কাজ করে যাচ্ছে। দোষ করুক বা না করুক মোবাইল কোর্টে রায় হয়ে যাচ্ছে। আসলে অপরাধস্থলে সবসময় উপস্থিত থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু রায় লেখার সময় বাধ্যতামূলকভাবে লেখা হচ্ছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।’

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের পরিদর্শক পদবীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইভটিজিং ও কয়েক পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মামলা করা পুলিশের পক্ষে নানা কারণে সম্ভব হয় না। ছোট ছোট এসব ঘটনায় মামলা দায়ের হলে পুলিশ অন্য কাজে সময় দিতে পারবে না; এসব মামলা তদন্তেই অনেক সময় ব্যয় হবে। তাই অবৈধ জেনেও অপরাধীকে ধরার অনেক পরে তাকে জেলা প্রশাসকের দফতরে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যে কোনো একজনের শরণাপন্ন হয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুরোধ করে পুলিশ। এভাবেই চলে আসছে অনেকদিন ধরে।’