শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

বহদ্দারহাট-এর অনেক ‘অসুখ’!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১, ৩:০২ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : বহদ্দারহাট ঘিরে বছরের পর বছর সড়ক, নালা ও ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও দখলের হিড়িক লেগে আছে। ফলে যেন দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী এখানকার মানুষের। তবে এবার বদলে যাবে বহদ্দারহাটের দৃশ্য এমন আশা মেয়রের এলাকার বাসিন্দাদের।

জানা যায়, সড়ক ফুটপাত, খাল নালায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার দায়িত্বে যে প্রতিষ্ঠানের, তারাই বহদ্দারহাটে নালার উপর একে একে গড়ে তুলেছেন ৭২টি দোকান। সিটি করপোরেশন মার্কেট নামে হিসেবে পরিচিত এটি। এছাড়া বছর দুয়েক আগে কাঁচাবাজারের ভেতর মূল সড়কের উপর ৮-১০টি দোকান নির্মাণ করা হয়। অনিয়ম জালিয়াতির মাধ্যমে এসব দোকান জায়েজও করেছেন চসিকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

২০১৪ সালে নগরীর শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট ডোমখালি খাল পর্যন্ত বক্স ড্রেন নির্মাণ করে চসিক। সেই সাথে নালাগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিলে ভেঙে ফেলা হয় বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের পাশে চসিকের পুরোনো টিনশেডের কিছু দোকান। নালার কাজ শেষ হতেই তার উপর গড়ে ওঠে ৩৫টি পাকা দোকান। এনিয়ে সেসময় ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হন তৎকালীন মেয়র এম মনজুর আলম।

সেসময় স্বপন বৈষ্ণব নামে এক মার্কেট মালিক উচ্চ আদালতে রিট করলে চসিককে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে সেই আদেশ তোয়াক্কা করেনি কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া নালা-খালের উপর স্থাপনা নির্মাণ কোনওভাবে আইন সমর্থন করে না।

বহদ্দারহাটের চারটি মার্কেটের দোকানীদের অভিযোগ, চসিকের কিছু অসাধু কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্থানীয় দখলদার চক্রের যোগসাজশে নালার ওপর অবৈধভাবে এসব দোকান গড়ে উঠেছে।

জানা যায়, প্রথমে অস্থায়ীভাবে টিনশেডের ১০-১৫ টি দোকান ছিল এখানে। পরবর্তীতে নালার উপর স্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হয় ৩৫টি দোকান। এতে শেষ নয়, নির্মাণ করা হয় দুইমুখী করে আরো ৩৫টি দোকান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ ছয় বছরেও উচ্ছেদ হয়নি নালার উপর চসিকের এই মার্কেট। এতে আশপাশের চারটি মার্কেটের অন্তত পাঁচশ’ দোকানি রীতিমতো ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করছেন। অগ্নিকাণ্ড কিংবা কোনও দুর্ঘটনা হলে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার সুযোগ পর্যন্ত নেই। এছাড়া বৃষ্টির কারণেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের মূল ভবন নির্মাণকালীন সময় বাজারের মূল সড়কের উপর ৮-১০টি দোকান নির্মাণ করা হয়। মোটা অংকের টাকায় বিক্রিও করা হয় এসব দোকান। ফলে চলাচলের মূল সড়কটি এখন সরু হয়ে গেছে।

এদিকে, ২০১৯ সালে বাজারের নতুন ভবন উদ্বোধন করেন বিদায়ী মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। প্রশস্ত গলি, আলো-বাতাস, চলাচলের যথেষ্ট সুবিধা থাকায় প্রথম দিকে ক্রেতার উপস্থিত ভালো ছিল। কিছুদিন যেতে না যেতেই বাজারের ভেতর চলাচলের অলিগলিতে শতাধিক মাছের দোকান বসে। এতে করে বৈধ ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রি কমে ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাজারের সামনে যে পার্কিং স্পেস রয়েছে তা দখল করে অন্তত ৬-৮টি দোকান নির্মাণের তোড়জোড় চালাচ্ছে একটি চক্র।

শুধু কাঁচাবাজার নয়, ব্যস্ততম বহদ্দারহাট মোড় ঘিরে সড়ক ও ফুটপাত দখলে চলছে যেন প্রতিযোগিতা। সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে কথিত ব্যক্তিরা এসব নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের কাছ থেকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও মাসোহারা পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কাঁচাবাজারের মুখ থেকে হক মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাত ও সড়কে নিয়মিত শতাধিক দোকান বসে। কোটি টাকায় ফুটপাত নির্মাণ করা হলেও, এর সুফল পথচারীরা পাচ্ছেন না। সূর্যের আলো যত কমতে থাকে, দোকানের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান হলেও পুনরায় তা দখলে চলে যায়। এমন চিত্র শুধু বহদ্দারহাট নয়, পুরো নগরজুড়ে।

বহদ্দারহাট পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দুই লেন সড়কের একপাশ নিয়মিত দখলে তাকে পরিবহন স্ট্যান্ডের। আর পুলিশ বক্সের পেছনে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বাস কাউন্টার। যাত্রী উঠানামাও করা হয় এখান থেকে।

বহদ্দার বাড়ি মসজিদের সামনে গেলে দেখা মিলবে গ্রাম সিএনজির স্ট্যান্ড। এখান থেকে বলিরহাট পর্যন্ত প্রায় দেড়শ’ নাম্বারবিহীন টেক্সি চলাচল করছে। ছিনতাইকারীরা নাম্বারবিহীন এসব সিএনজি ব্যবহার করে বলে প্রচার আছে।

বহদ্দারহাট মদিনা হোটেলের সামনে সড়কেই আছে একটি মাইক্রো স্ট্যান্ড। নতুন ব্রিজ পর্যন্ত চলছে পারমিটবিহীন অটো টেম্পো। হক মার্কেটের সামনে থেকে জেলার নোয়াপাড়া রুটে চলছে মাহিন্দ্রা নামক গাড়ি।

নতুন চান্দগাঁও থানার মোড়ে গেলে দেখা যায়, ব্যস্ততম এই মোড়ে অসংখ্য বাস দাঁড়িয়ে থাকে সড়কে। এখানে কাউন্টার খুলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার যাত্রী উঠানামা করা হয় ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। অথচ পাশেই রয়েছে নির্ধারিত বাস টার্মিনাল।

মোহাম্মদ ফারুক নামে স্থানীয় এক তরুণ বলেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রাম সিটির নবনির্বাচিত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরী নগরসেবায় আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছেন। তিনি চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাটের ঐতিহ্যবাহী বহদ্দার বাড়ির সন্তান।

নবনির্বাচিত এই মেয়রের সামনে জলাবদ্ধতা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও মশক নিধনসহ  নানা চ্যালেঞ্জ। বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দারা চান সর্বপ্রথম এখান থেকে শুরু করা হোক উচ্ছেদ অভিযান।-বলেন ফারুক।

এ প্রসঙ্গে নবনির্বাচিত মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন- শুধু বহদ্দারহাট নয়, নগরজুড়েই এমন পরিস্থিতি। একটা বাসযোগ্য নগর গড়তে এসব বাধা উপড়ে ফেলতে হবে যে কোনও মূল্যে। আমি কেবল দায়িত্ব নিয়েছি। নগরবাসীকে আশ্বস্থ করতে চাই, আমাকে একটু সময় দিন। আমার সদিচ্ছা কাজে লাগিয়ে পর্যায়ক্রমে সকল জঞ্জাল আমি দূর করব। এজন্য নগরবাসীর ধৈর্য্য ও সহযোগিতা কামনা করেন মেয়র রেজাউল।