বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

অসাধারণ মেধাবীরা গবেষণায় যাবেন, সিভিল সার্ভিসে নয়

একুশে আড্ডায় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কর কমিশনার বাদল সৈয়দ

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১, ৬:০৩ অপরাহ্ণ

আফছার রাফি : অসাধারণ মেধাবীদের সিভিল সার্ভিসে নয়, দেশ-বিদেশে গবেষণায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যাওয়া উচিত বলে মনে করেন মানুষের মন-মনন ও সমাজ বদলের একনিষ্ঠ যোদ্ধা কবি-সাহিত্যিক বাদল সৈয়দ।

বলেন,  সিভিল সার্ভিসে অসাধারণ মেধাবী লোকজনের দরকার নেই। অসাধারণ মেধাবী লোকজন যাবে গবেষণায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে। সিভিল সার্ভিসের কাজের যে ধরন তাতে অবশ্যই মেধার দরকার আছে, কিন্তু দেশসেরা মেধার দরকার নেই।

সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ’একুশে আড্ডায়’  যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন এই সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বাদল সৈয়দ।

আড্ডায় অন্যান্যের মধ্যে  চট্টগ্রামের অতিথি খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার খাদিজা রহমান, একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার, চসিকের প্রাক্তন কমিশনার ও মানবাধিকারকর্মী  অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, সৌখিন এন্টিক সংগ্রাহক, শিল্পোদ্যোক্তা তারেকুল ইসলাম জুয়েল, সাহিত্যিক আবু মুসা চৌধুরী, বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা দীপংকর দাশ, সৃজনশীল ব্যবসায়ী সানিয়াত লুৎফী, চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রেসিডেন্ট টিপু সুলতান সিকদার, চট্টগ্রাম আইটি ফেয়ারের সত্ত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম, ডেইলি স্টারের চট্টগ্রাম করসপনডেন্ট মোস্তফা ইউসুফ, লেখক-সাংবাদিক ফায়সাল করিম, জাতীয় বিতার্কিক ইশরাত জাহান ইমা, হিডেন হার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সুনেহরা জহুরা ইসলাম প্রমুখ।

ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সিভিল সার্ভিস-ফোবিয়ার উদাহরণ টেনে বাদল সৈয়দ বলেন, আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তার খুব সখ, সিভিল সার্ভিসে আসবে। খুব ব্রিলিয়ান্ট সে। আমি তাকে সবসময় বলি, দেখ সিভিল সার্ভিসে মিডিয়াম মেধাবী হলে চলে। তুমি অসম্ভব মেধাবী। তোমার মেধাটা দেশ-বিদেশে গবেষণায় কাজে লাগাও। অনেক বড় একটা ভূমিকা রাখতে পার সারা পৃথিবীর জন্য। কিন্তু না, তার সখ সে সরকারি চাকরি করবেই।

‘একদিন সে আমাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠালো। ছবি পাঠিয়ে বলল, মামা দেখেন- এই ছবিটা। অন্নদা শঙ্কর রায় অত্যন্ত নামজাদা লেখক হয়েও বসে আছেন সারিবদ্ধ চেয়ারের এক কোণায়। মাঝখানে বসে আছেন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট। অন্নদা শঙ্কর রায় এতবড় লেখক হওয়ার পরেও কিন্তু মাঝখানের আসন পাননি। আমি তাকে লিখলাম, মাঝখানে যে ডিএম বসে আছেন তার নাম কী? সে বলল, তার নাম জানি না।’

‘আমি বললাম, পার্থক্যটা এখানেই। মাঝখানে যে ডিএম সাহেব আছেন তার নাম তুমি কিন্তু জানো না, অন্নদা শঙ্কর রায়ের নাম তুমি জানো এবং সারা ভারতের মানুষ জানে। এ কারণেই তিনি অন্নদা শঙ্কর রায় হতে চেয়েছিলেন। এখন তোমার সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, অন্নদা শঙ্কর রায় আইসিএস অফিসার ছিলেন এবং এরকম ডিএমগিরি করার পরেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাহলে শেষ পর্যন্ত মানুষের মনে কে আছে? মাঝখানে বসা লোকটি নাকি কোণায় বসা অন্নদা শঙ্কর রায়?’

‘নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু আইসিএস পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছিলেন। তুড়ি মেরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাই তিনি নেতাজী সুভাস বসু হতে পেরেছেন। তাই বলে কেউ ধরে নেবেন না যে, আমি অন্নদা শঙ্কর রায় হবো, আমি সুভাস বসু হব। কিন্তু আমি যেটি হতে চেয়েছি সেটি হচ্ছে আমি আমার সরকারি পরিচয়ে কৃতজ্ঞ। যেটা আমার রুটি-রুজি। আমার সেখানে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন আছে।’ – বলেন বাদল সৈয়দ।

আড্ডারুদের এক জিজ্ঞাসার জবাবে বাদল সৈয়দ বলেন, লেখালেখির সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা কিন্তু আশির দশক থেকে। আমি চাকরিতে আসার আগ থেকেই কিন্তু খুব ছোট হলেও বা অনুল্লেখ্য হলেও একজন লেখক ছিলাম। সাক্ষী যদি কাউকে দিতে বলেন তাহলে আবু মুসা ভাই দেবেন। কারণ আশির দশকে তার হাত ধরেই আমরা মোটামুটি লেখার জগতে আসি। এরপরে চাকরি শুরু। এখন একটি প্রশ্ন এসেছে যে, চাকরিতে যে নির্ঝঞ্জাট বা আয়েশী জীবন; সেটি বাদ দিয়ে কেন এই বিভিন্ন ধরনের ছোটখাট কাজে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করি কিংবা কেন সো-কল সরকারি যে সুবিধাগুলো আছে সেগুলো নেই না?

‘এটার উত্তর হচ্ছে, আপনাদের সবাইকে আমি অনুরোধ করবো, যে যেদিন পারেন আমার অফিসে চা খেতে আসুন। আপনারা যদি আমার অফিসে যান আমি আপনাদেরকে একটা ‘অনারবোর্ড’ দেখাবো; যেখানে চট্টগ্রামে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমিসহ সব ইনকাম ট্যাক্স কমিশনারের নাম আছে। যেহেতু আপনারা আমাকে চেনেন, তাই শুধু আমার কথাই ওই মুহূর্তটা মাথায় রাখবেন। আগে যারা ছিল তাদের কাউকে আপনারা চেনেন না, চেনার কথাও না। আমি যখন ওই চেয়ারে থাকবো না তখনও এরকম কয়েকশ’ কমিশনার কয়েক শত বছরে আসবেন। তাদেরকেও কেউ মনে রাখবে না। সরকারি চেয়ারে আসেন, বসেন, চলে যান। আমার আগেও ছিলেন, আমার পরেও থাকবেন। তাই প্রথম থেকে আমার চিন্তা ছিল, যে পরিচয়টা চেয়ার ছেড়ে দেওয়া মাত্র আর থাকে না সেই পরিচয়ে আমি পরিচিত হব না। আশির দশক থেকে আমি বাদল সৈয়দ নামে লেখালেখি করি। আমার টার্গেট ছিল পরিচিত যদি হই তাহলে এই নামেই হব যাতে মানুষ আমাকে চাকরি না থাকলেও চিনতে পারে।’ আমি গতকালও একটা লেখায় লিখেছি, নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট চাকরিজীবী। ওই সময় আমি অন্য কোনও ধরনের সামাজিক কাজ, সামাজিক মিটিং এ্যালাউ করি না। উই অল ডে রেসপেক্ট টু মাই জব।

‘আমি বলতে চাই, আমি এর বাইরে একটি পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছি যে পরিচয়টি টিকে থাকবে। আমি জানি না এখন আজ পর্যন্ত সেখানে আমি পৌঁছাতে পেরেছি কি না বা টিকে থাকবো কি না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার থাকবে যে , আমি চেষ্টা করে যাব। আমি যদি আজকে ওই চেয়ারে নাও থাকি আমি আপনাদের একুশে পত্রিকা অফিসে আসলে আপনার কিন্তু আমাকে বাদল সৈয়দ নামে বরণ করবেন। আমাকে কিন্তু আমার চাকরির জন্য বরণ করে নেবেন না। আমি এটাই চেয়েছিলাম। অনেক সময় হয় কী সরকারি কর্মচারিরা রিটায়ার্ড হওয়ার পর বেশিদিন বাঁচে না। কেন বাঁচে না জানেন? ইন ওয়ান ফাইন্ড মর্নি উনি দেখেন এভরিথিং ইজ ডিজ অ্যাপায়ার, কিছু নাই। কালকেও তার গাড়ি ছিল, আজকে তার গাড়ি নাই। কালকে তার চার পাঁচটা অর্ডারলি ছিল, আজকে তা নাই। বেল টিপতে গিয়ে দেখেন ওই টেবিলও নেই। কিছুই নেই।’

এটা শুধু সরকারি কর্মচারিদের ক্ষেত্রে নয়, আমি আপনাদের কয়েকটা উদাহরণ দিতে পারি। নাম্বার ওয়ান- আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিগ্যান রিয়াটার্ড করেন। যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষ। রিটায়ার্ড করে উনি চলে গেলেন উনার স্টেট ক্যালিফোর্নিয়ায়। আমেরিকার রিটায়ার্ড প্রেসিডেন্টের জন্য একটা নিয়ম আছে। উনারা যখন পাবলিকলি চলাফেরা করেন অর্থাৎ পাবলিক রাস্তায় যখন উনারা যান তখন দে আর প্রোবাইডিং সো ফার ফ্রম দ্যা গভর্নমেন্ট, সিক্রেট সার্ভিসের একজন লোক গাড়ি চালান। কিন্তু নিজের রেঞ্জে যদি গাড়ি চালান বা নিজের স্টেটে যদি গাড়ি চালান তখন কিন্তু  ওটা আর থাকে না। পরেরদিন উনি নিজের স্টেটে  গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। ব্যাকসিটে গিয়ে উঠে উনি একটু পরে খুবই বিরক্ত হয়ে উঠলেন কী ব্যাপার, গাড়ি ছাড়ছে না কেন। আমি উঠার সাথে সাথে তো গাড়ি চলার কথা। হোয়াই দ্যা কার ইজ নট মুভিং? তারপরে তার মনে পড়লো আমাকেই চালাতে হবে, কারণ আমার তো আর গভর্নমেন্ট ড্রাইভারের সাপোর্ট নেই। এটাই হচ্ছে একটা এক্সপেরিয়েন্স।

দ্বিতীয় নাম্বার এক্সপেরিয়েন্স হচ্ছে জজ বুশের। তিনি বলছেন, প্রতিদিন সকালে উঠে তাকে এক কাপ কফি দেওয়া হতো। তিনি কফি পছন্দ করতেন। যার কারণে সকালে উঠেই তাকে একটা কফি সার্ভ করা হতো। বললেন, আমি টেক্সাস গিয়ে পরদিন সকালে উঠে বসে আছি, কফি আসছে না কেন? কফি তো চলে আসার কথা, কিন্তু আসছে না কেন? দুয়েক মিনিট পর দেখলাম কফি নিয়ে ঢুকলেন আমার স্ত্রী লরা বুশ। আমার সেই মুহূর্তে মনে পড়লো যে, এখন থেকে লরার হাতেই আমাকে কফি খেতে হবে। হার্ড এক্সপেরিয়েন্স হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। আমেরকিার প্রেসিডেন্ট যখন হোয়াইট হাউজে যান তখন এল দ্য চিপ নামে একটা গান বাজানো হয়। উনি বলছেন, উনার ইন্টারভিউতে- আমি অ্যারিজোনার বাসা থেকে বাইরে বের হয়ে আমি খুব অবাক হয়েছি , মিউজিক বাজছে না কেন। গানটা শুনতে পাচ্ছি না কেন। একটু পরে আমার মনে হলো এই গানটি এখন আরেকজনের জন্য বাজানো হচ্ছে। দিস ইজ এ ভেরি রিয়েল।

বাদল সৈয়দ বলেন, এসব পরিচয় খুবই ক্ষণস্থায়ী, এসব নিয়ে যারা ব্যতিব্যস্ত থাকেন তারা একটা সময় তো শুধু সব হারান না এমনকি শরীর এবং আয়ুও হারান। এটলিস্ট পৃথিবীতে কিছুদিন বেঁচে থাকার স্বার্থের হলেও আমি ওই পরিচয়টা বহন করতে চাই না।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৪ সালে সিভিল সার্ভিসে (কর ক্যাডার) যোগ দিয়ে এখন চট্টগ্রামের কর কমিশনার পদে কর্মরত বাদল সৈয়দ। ২০১৩ সাল থেকে জাতিসংঘের ট্যাক্স নিয়ে গঠিত প্যানেলেও তিনি কাজ করছেন। বাদল সৈয়দের মাথা থেকেই এসেছে পে ইট ফরোয়ার্ডের ধারণাটি। ফেসবুকভিত্তিক এই সংগঠন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ধরে রাখে, তাদের পড়াশোনার খরচ জোগায় দাতাদের অনুদানে। এখন তারা অন্তত পাঁচশ’ শিক্ষার্থীর পড়ালেখার খরচ জুগিয়ে যাচ্ছে। শুধু পড়ালেখা নয়, অনেক থমকে যাওয়া মানুষের জীবনকে এগিয়ে চলার পথ দেখাচ্ছে পে ইট ফরোয়ার্ড।
বাদল সৈয়দের নেতৃত্বে এর ২১ হাজার মানুষ মানবসেবার ব্রত নিয়ে একটি মঞ্চে যেন এক হয়েছেন।

শুধু পে ইট ফরোয়ার্ড নয়, তাঁর সৃজনশীল মস্তিষ্ক থেকে উঠে এসেছে আরও কয়েকটি এ রকম অভূতপূর্ব সেবামূলক সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ‘অনেস্ট’। এটিও ফেসবুকভিত্তিক একটি বড় সংগঠন। অভাবী কিন্তু মেধাবী ও সৃজনশীল তরুণেরা যাতে কোনো বিনিয়োগ ছাড়া কিছু আয় করতে পারেন, তার জন্য এ উদ্যোগ। সোজা কথায় এটি একটি পণ্য কেনাবেচার প্রতিষ্ঠানই। কিন্তু ব্যতিক্রমটা হলো, এখান থেকে যে যা কেনেন, সে টাকার কিছু অংশ ফেরত পান। বেশি দামে নয়, বরং বাজার থেকে সব সময় এখানে কম মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়। এ প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই। যাঁরা কেনাবেচা করেন, তাঁরাই মালিক। এতে অনেকে মূল্যবান জিনিসপত্র দান করেন। সেটি বিনা মূল্যে অথবা ন্যূনতম মূল্যে চাহিদাসম্পন্ন গ্রাহকদের দেওয়া হয়। বাজার থেকে দরকারি পণ্য কিনে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে বিক্রি করে অনেস্ট।