শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

সিনিয়রের মুখে পানি ছুড়েছে জুনিয়র, তাতেই রাজনীতি ছেড়েছিলেন তৈয়ব!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১, ৩:০৭ অপরাহ্ণ

চটগ্রাম : বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী খুব কঠিন-কদর্য, কালো সময় তখন। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করাও দুঃসাধ্য, দুঃসাহস রীতিমতো। থমথমে, মেঘাচ্ছন্ন সে সময়ে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগের হাল ধরেন তিনি। নিদারুণ এক কালোকালে সংগঠনের হাল ধরাটাও খুুব মসৃণ ছিল না। শিবিরের আধিপত্য, আস্ফালন কলেজজুড়ে, রক্তের হোলিখেলার উদগ্র রাজনীতি। সেই সময়টাতেই তিনি জ্বলে ওঠেছিলেন দাবানলের মতো। দায়িত্ব নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের কলেজ ছাত্রসংসদের জিএস-এর।

বলাবাহুল্য, একই সময়ে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন আজকের মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

আলখেল্লাপরা শিবিরের পবিত্র কোরআন শপথে কথিত আদর্শ বিতরণ-বণ্টনের নামে রগকাটার রাজনীতির বিপরীতে মেধাশাণিত দেওয়াললিখনে, ছিঁকা মেরে, বই পড়ে, লিফলেট বিতরণ করে জাতির জনকের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে ব্যাপৃত শক্ত-পোক্ত সেই ছাত্রলীগ নেতার নাম এসএম আবু তৈয়ব।

সেই তিনিই কিনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনভিপ্রেত, অপ্রত্যাশিত ঘটনার ক্ষোভ-কষ্টে প্রাণের সংগঠনটিই ছেড়ে দিয়েছিলেন। চিরতরে বিদায় নিলেন রাজনীতির মাঠ থেকে। কিন্তু আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটাননি। বরং অন্য আলোয় আলোকিত হয়ে সেখানেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক দ্যুতি ছড়িয়েছেন প্রতিনিয়ত।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর সম্প্রতি ‘দৃষ্টি’র ২৯ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের ফাঁকে খণ্ডিত এক আড্ডায় রাজনীতির স্বর্ণালী সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে একুশে পত্রিকা সম্পাদককে এই তথ্য জানিয়েছেন ‘৮০’র দশকের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা এস এম আবু তৈয়ব। এসময় উপস্থিত ছিলেন একুশে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এডভোকেট রেহানা বেগম রান, চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের সিইও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া ও তরুণ উদ্যোক্তা সৈয়দ রুম্মান আহমেদ।

যদিও প্রথমে তথ্যটি পত্রিকায় প্রচার না করতে অনুরোধ ছিল আবু তৈয়বের; কিন্তু সে সময়কার ছাত্রলীগ রাজনীতির পাঠ-পটন, অনুশীলন সর্বোপরি নেতাকর্মীদের আদর্শিক ভিত ও আনুগত্য-শৃঙ্খলার ব্যাপ্তি আজকের ছাত্রলীগ নেতাদের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে ভেবে ফের অনুমতি সাপেক্ষে গল্পটি একুশে পত্রিকার পাঠকদের সামনে নিয়ে আসা।

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাশ করে ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বে ভর্তি হন আবু তৈয়ব। সহপাঠীরাই মূলত চবিতে ভর্তি হতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, ছাত্রশিবিরের উল্লম্ফনের বিরুদ্ধে তাকে দিয়ে চবি ছাত্রলীগ সংগঠিত করার মানসে। তাকে চাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী করারও পরিকল্পনা ছিল সহপাঠীদের। সেভাবেই এগোচ্ছিল সব।

একদিন ক্যাম্পাসে ঝুঁপড়ির দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন আবু তৈয়বসহ জনাকয়েক সহপাঠী; এসময় প্ররোচিত এক জুনিয়র ভাই অকস্মাৎ তৈয়বের সাথে বসা সিনিয়র ভাইয়ের শরীরে মগভর্তি পানি ছুড়ে দিয়ে থেমে যায়নি; কদর্যরূপে অবস্থান নেয়।

এ প্রসঙ্গে আবু তৈয়ব জানান, ‘জুনিয়র পানি ছুড়ে দিল, সিনিয়রের শরীর ভিজল; তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া, সংগঠনে শৃঙ্খলা-আনুগত্য নষ্ট হওয়া। আমাদের সময়কার রাজনীতিতে এটা খুব মানা হতো। তাই সেই ঔদ্ধত্য, আস্ফালন মেনে নিতে পারিনি সেদিন।’

আজন্ম সুন্দরের পথে হাঁটা আবু তৈয়ব রাজনীতিতেও সুন্দর, শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যখনই অসুন্দর ভর করলো তখনই ছাড়লেন প্রিয় ছাত্রসংগঠনের সংশ্রব। কিন্তু আদর্শিক সংশ্রব কখনোই ছাড়েননি।

ছাত্ররাজনীতির ধারাবাহিকতা অটুট থাকলে আবু তৈয়ব হয়তো আওয়ামী লীগের বড় নেতা হতেন কিংবা মন্ত্রী এমপি, যেমনটি হয়েছেন রাজনীতিতে তার সমসাময়িক, জুনিয়র বা হাতেগড়া কর্মীরাও।

তা হয়তো হননি; কিন্তু তিনি মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঈর্ষন্বীয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন চিন্তায়, রুচিবোধ আর সেসবের সমন্বয়ে গড়ে তোলা গার্মেন্টস ব্যবসায়। তিনি শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত চট্টগ্রাম ক্লাবের চেয়ারম্যান, বিজিএমইএ’র প্রথম সহ সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালকের মতো প্রেস্টিজিয়াস পদগুলো অলংকৃত করছেন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব যোগ্যতায়। সারাদেশে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের একজন সিপাহশালারও হয়ে ওঠেছেন তিনি।

আবু তৈয়ব বিখ্যাত মোজাহের ওষুধালয়ের প্রতিষ্ঠাতার সন্তান। তার বড়ভাই এস এম আবুল কালাম চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও বর্তমানে কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

আবু তৈয়ব বলেন, সম্মানিত হওয়ার জন্য, দেশের জন্য কাজ করতে সবসময় পদ-পদবী লাগে না। সেসব ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছি। মানুষ ভালোবাসে, ডেকে নেয়, সম্মান করে। এর চেয়ে আর বেশি কী লাগে! – যোগ করেন তিনি।