রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

এমপি সনি’র স্বামী-শ্বশুরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুন ১১, ২০২১, ১১:৪০ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : বেসরকারি ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের সাড়ে ১৫ কোটি টাকা লোপাটের দায়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনির স্বামী মো. পারভেজ আলম ও শ্বশুর এমএস আলম ওরফে শাহ আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছে চট্টগ্রামের একটি আদালত।

বৃহস্পতিবার (১০ জুন) চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাজিদুর রহমান এই গ্রেফতারী পরোয়ানার আদেশ দেন। আদেশে সংশ্লি­ষ্ট থানাকে আসামীদের আটক করে আদালতে হাজির করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালত সূত্র জানায়, ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে মেসার্স শাওন এন্টারপ্রাইজের নাম দেখিয়ে ঋণ নেন পারভেজ ও শাহ আলম। কিন্তু সেই ঋণের বকেয়া সাড়ে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯১ টাকা পরিশোধ করার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় তাগাদা দিলেও তা আমলে নেয়নি আসামিরা। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দাযের করে। এই মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে আদালত।

সংসদ সদস্য সনি’র শ্বশুর শাহ আলম দেশের ৮ টি ব্যাংক থেকে ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাত করার দায়ে তার বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা আছে। এর মধ্যে ৬টি মামলায় তার ৬ বছরের সাজাও হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামের সদরঘাটে মেসার্স আলম এন্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী এমএস আলম ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লে­খযোগ্য না হলেও বছরের পর বছর কৌশলে ঋণ ভাগিয়েছেন ব্যাংক থেকে। ঋণ পেতে খাটিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাব। সেই টাকায় জমির ব্যবসা করে নিজে ফুলেফেঁপে উঠলেও আটটি ব্যাংক এখন তার কাছ থেকে পায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

এমএস আলমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখাশোনা করছেন আরেক আসামী বড় ছেলে পারভেজ আলম হীরা। তাদের চট্টগ্রাম ভিত্তিক মাশরিফা ফুড প্রোডাক্টস নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নাম আছে এমএস আলমের। ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পারভেজ আলম এবং ডিরেক্টর হিসেবে রয়েছেন তার কন্যা ফারজানা আলম এবং কনিষ্ঠ দুই পুত্র ফরহাদ আলম ও ফয়সাল আলমের নাম। এর মধ্যে ফারজানা আলম চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের ছেলের বউ।

জানা গেছে, ২০১১ সালের পর থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ঋণের টাকা পেতে এমএস আলমের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে। ৩০০ কোটি টাকা আদায়ের জন্য তার বিরুদ্ধে আটটি ব্যাংক সব মিলিয়ে ৫৪টি মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে ৭টি মামলা শুধু অর্থঋণ আদালতে দায়ের হয়। যার মধ্যে চারটি মামলার রায় হয়েছে ইতোমধ্যে। বাকি সবগুলোই এনআই অ্যাক্টের মামলা। এনআই অ্যাক্টের ৬ মামলায় তার ৬ বছরের সাজাও হয়েছে। যেসব ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট করা হয়েছে, তার মধ্যে পূবালী ব্যাংক সদরঘাট শাখা পাবে ৫২ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা ৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা ৯০ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা ২৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, ব্যাংক এশিয়া খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা ২৯ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা আছে ৯ কোটি টাকা, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক জিইসি শাখার পাওনা ১৩ কোটি টাকা এবং ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ১২ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইভিপি ও খাতুনগঞ্জ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক (বর্তমান জুবিলী রোড শাখার ব্যবস্থাপক নুরুল আবছার বলেন, ‘ব্যাংকের তৎকালীন উর্ধ্বতন কর্মকতাদের ম্যানেজ করে ঋণ ভাগিয়ে নিয়েছেন এমএস আলম। আমি খাতুনগঞ্জ শাখায় দায়িত্ব পালনকালে এই টাকা উদ্ধারে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওই ব্যবসায়ীর টাকা পরিশোধের মানসিকতা নেই। তাই আমরা বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি। এখন বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা মামলায় সাজা হতে শুরু হলে তিনি বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে শুনছি’।

জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জোনাল হেড (চট্টগ্রাম) একেএম সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ‘পারিবারিকভাবে ব্যবসায় যুক্ত হলেও এমএস আলম খুবই ধূর্ত প্রকৃতির লোক। যার ফলে ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সহজে ঋণ সুবিধা নেন। কিন্তু ব্যবসার জন্য ঋণ নিলেও সেই টাকা বিনিয়োগ করে তিনি জমি কিনেছেন। এভাবে ব্যাংকের টাকা আটকে যাওয়ায় পাওনাদার ব্যাংকগুলো টাকা উদ্ধারে একের পর এক মামলা করতে থাকে।’

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুজ্জামান জানান, ব্যবসায়ী শাহ আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা মামলায় সাজা হওয়ার পর কয়েকবার তার দক্ষিণ খুলশীর বাসায় পুলিশ গিয়েছে। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন।