রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

আ.লীগের সাংসদের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া রাজাকারের পরিবার!

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুন ১৬, ২০২১, ৯:১৭ অপরাহ্ণ

জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা একটি রাজাকার পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই পরিবারটিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে ক্ষমতাসীন দলটির নেতারাও অভিযোগ করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, খুরুশকুল তেতৈয়া গুইল্ল্যা বাপের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মমতাজ আহমদ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। মমতাজের নাম মুক্তিযুদ্ধের ৯ নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) এ.এস এম শামছুল আরেফিনের লেখা ‘রাজাকারদের তালিকা, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা’ বইয়ের ৬৫নং পৃষ্ঠায় ১৪০নং সিরিয়ালে রয়েছে। এ ছাড়া মমতাজের পুরো পরিবারই স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর পক্ষে কাজ করেছে বলে এলাকায় জনশ্রুতি আছে।

সেই মমতাজের ছেলে আক্তারুজ্জামান ওরফে পুতু, মমতাজের ভাই বাদশা মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দীন প্রকাশ পোস্টার কামাল, ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও মুবারক হোসেন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, রাজাকার পরিবারটির ছেলেদের অধীনে ২৫ থেকে ৩০ সদস্যের একটি সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। তাদের দখলবাজি ও নির্যাতনের হাত থেকে সাধারণ মানুষ তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, আওয়ামী লীগ ও বিচারকের পরিবারও রেহাই পায়নি।

সম্প্রতি চাঁদাবাজি মামলায় কামাল উদ্দীন ও শেখ কামাল গ্রেপ্তার হলেও সক্রিয় রয়েছে অন্যন্য সদস্যরা। তাদের চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই খুরুশকুল এলাকা ছেড়েছেন। ভুক্তভোগী স্থানীয়দের দাবি, স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজাকারের পরিবারটি এলাকাবাসীকে জুলুম নির্যাতন করে আসছে।

খুরুশকুলের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভূমিদস্যু কামালদের পৈত্রিক কোন সম্পদ নেই। এরপরও আমার পরিবারের একটি জমিতে তাদের অংশ রয়েছে দাবি করে ৫ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছে পোস্টার কামাল ও মেম্বার শেখ কামাল। বিষয়টা এলাকার সবাই জানলেও ভয়ে আমাদের পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি।’

অভিযোগ আছে, দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় খুরুশকুল ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত গ্রাম পুলিশ সদস্য আলি হোসেনের প্রায় এক একর কৃষিজমি দখল করে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন ইউপি সদস্য শেখ কামাল।বিষয়টি বর্তমানে পরিষদে বিচারাধীন রয়েছে।

এছাড়া মনজুর আলম নামের একজন দুবাই প্রবাসীর ৩০ শতক জমি দখল করে একটি বিলাসবহুল বাড়ি ও অনুমোদনহীন একটি করাত কল স্থাপন করার অভিযোগ আছে শেখ কামালের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, চাঁদা না দেওয়ায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থানীয় মৃত কবির আহমদের ওয়ারিশদের ৬০ শতক জায়গা দখল করে তিনটি পুকুর খনন করেন রাজাকার মমতাজের ভাতিজা শেখ কামাল। তার ব্যক্তিগত অফিসটিও অন্যের জমি দখল করে করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

একইভাবে রাজাকার মমতাজের আরেক ভাতিজা কামাল ওরফে পোস্টার কামাল মহসিন নামের এক ব্যক্তির জমি দখল করে পোল্ট্রি ফার্ম ও আরেক স্থানীয় অসহায় ব্যক্তির জমি জোরপূর্বক দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়রা জানান, ভয়ভীতি দেখিয়ে জাহাঙ্গীর কাশেম নামের এক ব্যক্তির প্রায় ১০০ একর প্যারাবন ও চিংড়ি ঘের কয়েক বছর ধরে দখল করে রেখেছে রাজাকার মমতাজের পরিবারের সদস্যরা।

এ ছাড়াও পোস্টার কামাল ও শেখ কামাল মিলে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দার কৃষি জমি ও ভিটা দখলে করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিল রাতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় খুরুশকুল তেতৈয়া এলাকার বাসিন্দা চট্টগ্রামে কর্মরত সিনিয়র সহকারী জজ কামাল উদ্দিনের পরিবারের ৩ দশমিক ৪৪ একর কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল করে শতাধিক ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে তারা। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ কমলের ছবিও টাঙানো হয়।

দখলবাজির বৈধতা পেতে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত দুই কামাল উল্টো বিচারকের পরিবারকে জামায়াত-শিবির তকমা দিতে চেষ্টা করে। অথচ স্থানীয়রা জানান, বিচারক কামাল উদ্দিনের বাবা রফিকুল ইসলাম ওই এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও বর্তমান স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহভাপতি। এছাড়া বিচারক কামালের প্রয়াত দাদা আবুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বৃটিশ ভারতের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ফৌজ আর্মির সদস্য ছিলেন।

এদিকে বিচারক পরিবারের ভূমি দখলের সত্যতা পাওয়ায় গত ১ জুন দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা সরাতে দুইদিনের সময় বেঁধে দিয়ে দিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু দখলদাররা এখনো তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়নি।

অভিযোগ আছে, অবৈধ স্থাপনা ঠিকিয়ে রাখতে গত সপ্তাহে এমপি কমলের সঙ্গে দখলদারদের কয়েকজন গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বৈঠকের কিছু ছবি একুশে পত্রিকাকে পাঠিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বলছেন, মূলত স্থানীয় সাংসদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে রাজাকারের পরিবারটি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, গত কয়েক বছর আগে এই পরিবারের সদস্যরা সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী তামজীদ পাশাকে হত্যার চেষ্টা করে। দীর্ঘ ৫ মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে তামজীদ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন। কিন্তু এ ঘটনায় সাংসদ কমলের হস্তক্ষেপের কারণে মূল আসামিদের বিরুদ্ধে সদর থানা পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ আছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল করিম মাদু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে বিচারক-পরিবারের জমি দখল করে কোটি টাকার প্লট বিক্রি করেছে রাজাকারের ভাতিজা কামাল।’

তিনি বলেন, ‘সবাই বলছেন, এমপি কমল তাকে আগামী ইউপি নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন নিয়ে দেবেন বলেছেন। এ কারণে নির্বাচনের খরচ তুলতে অন্যের জমি দখল করে প্লট বিক্রি করছে কামাল। এ টাকা কার কার পকেটে গেছে তা তদন্ত করা প্রয়োজন।’

মাহমুদুল করিম মাদু বলেন, ‘এমপি কমলের কয়েক দফা অনুরোধের পর কামালকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য করেছিলাম। দলীয় সদস্য পদ পেয়ে সে মানুষের জায়গা-জমি দখল ও বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। আর তাকে সবকিছুতেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন এমপি কমল।’

খুরুশকুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন একুশে পত্রিকা বলেন, ‘আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে এমপি কমলের কাছ থেকে ‘নৌকা’ প্রতীক মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন কামাল। মনোয়নপ্রাপ্তি ও নির্বাচনী খরচ জোগাতেই বিচারক পরিবার ও বনায়নের জমি দখল করে রাতারাতি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন কামাল। একথা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।’

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল। একুশে পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘কত মদদি কত কথা বলবে এসবের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন আমি মনে করি না। শেখ হাসিনা কি কোনো নেতার কথায় মনোনয়ন দেবে?’

পরক্ষণে তিনি তার বক্তব্যের বিষয়টা এড়িয়ে যেতে অনুরোধ করে বলেন, ‘এসবের জবাব দিতে গেলে আমি তাদের সমান হয়ে যাবো। আমি তো জসিম, শাহজানকেও মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থাকবো বলেছি। কিন্তু মনোনয়ন তো দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’