
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : মরণ নেশা ইয়াবা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে স্রোতের মতো। কক্সবাজার ও বান্দরবানের ২৭২ কিলোমিটার সীমান্ত পথের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে এসব ইয়াবা দেশে ঢুকছে। মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার ৩৭টি কারখানায় এসব তৈরি হয়।
জানা গেছে, করোনাকালীন সময় ইয়াবার কারবার চাঙা রাখতে সস্তা ও সহজ কিস্তিতে ইয়াবার লেনদেন চালু করেছে কারবারিরা। এ সুযোগে মিয়ানমারের কারবারিদের থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা এনে মজুদ করছে রোহিঙ্গা ও দেশের ইয়াবা কারবারিরা। পরবর্তী এসব ইয়াবা নানা কায়দায় দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, পেটের ভেতর ঢুকিয়ে, গাড়িতে সংবাদপত্রের স্টিকার লাগিয়ে, ল্যাপটপ ও মোবাইলের বক্সের ভেতর, দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি বা গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতর ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা। নারী মাদক পাচারকারীরাও বিশেষ পদ্ধতিতে পাচারে জড়িত। কিছু চালান আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও বেশিরভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অবাধে এ মরণ নেশার বিস্তার ঘটিয়ে কোটিপতি বনে যাচ্ছেন মাদক কারবারিরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার পর পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ও পরবর্তী একযোগে কক্সবাজার জেলার সব পুলিশের বদলির সুযোগে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে মাদকের বিস্তার। চলতি বছর কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে এরইমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ ইয়াবা জব্দ করার ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, চলতি বছরে জেলা পুলিশ অভিযান চালিয়ে একদিনে ১৭ লাখসহ এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ ইয়াবা উদ্ধার ও দুই শতাধিক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে র্যাব-১৫ এর তথ্যমতে, চলতি বছরে তাদের অভিযানে প্রায় ২২ লাখ ইয়াবাসহ ২৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চলতি বছরে প্রায় ২০ লাখ ইয়াবা জব্দ করার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়াও চলতি বছরে কোস্টগার্ড ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এপিবিএন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অন্তত ২০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরে এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। অতীতে ৬ মাসের মধ্যে এত ইয়াবা জব্দ করার রেকর্ড নেই। এসব ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ৩০০ কোটি টাকা হতে পারে।
আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইয়াবার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ইয়াবা পাচার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের প্রতিরোধ করা গেলে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সম্প্রতি কারাগারে থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া মাদক মামলার দুইজন আসামির সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তারা নতুন করে মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হননি দাবি করে জানান, করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ থাকার কারণে ইয়াবা নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বেচা-বিক্রি কমে যায়। এরপর ইয়াবার কারবার চাঙ্গা রাখাতে মিয়ানমারের কারবারিরা প্রথমে কম দামে ও পরে সহজ কিস্তিতে ইয়াবা দেয়া শুরু করে।
এ সুযোগে কারবারিরা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা মজুদ করেছে জানিয়ে তারা জানান, যে পরিমাণ ইয়াবা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে তার ২০ শতাংশ হয়তো আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ছে।
এদিকে বাকি ইয়াবার লেনদেনকে ঘিরে কারবারিদের মধ্যে মারামারি ও খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। চলতি বছর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেকনাফে তিনটি ও কক্সবাজার শহরের দু’টিসহ ৫টি হত্যার ঘটনা ইয়াবার লেনদেনকে ঘিরে সংগঠিত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
এ ছাড়াও সম্প্রতি মাদকের বাকি টাকা চাইতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন জেল ফেরৎ মাদক কারবারি উখিয়ার পালংখালীর আবদু রশিদ। বিষয়টি শিকার করে রশিদ জানান, আনোয়ারুল ইসলাম প্রকাশ জাবু নামের একজনকে তিনি প্রায় কোটি টাকার ইয়াবা দিয়েছেন, তাকে মাত্র ৬ লাখ টাকা সে প্রদান করে। বাকি টাকা চাইতে গেলে তার ওপর হামলা করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি বলেন, ইয়াবার চালান নিয়ে ধরা পড়ার জন্য আমি জেল খেটেছি। সরকার নিশ্চয়ই আমাকে একই অপরাধের শাস্তি বারবার দিবে না। আমি সুন্দর জীবনযাপন করার জন্য আমার টাকা ফেরত চাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাবু বলেন, পালংখালী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার পর একটি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, বাকি ও কিস্তিতে ইয়াবা সংগ্রহ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক একাধিক চক্র ও টেকনাফ- উখিয়া এবং কক্সবাজার শহরের কিছু কারবারি কোটি কোটি ইয়াবা এনে মজুদ করে রেখেছেন। যা সময়-সুযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হবে।
সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মিয়ানমার সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, আসা-যাওয়া বন্ধ করা গেলে একটি ইয়াবাও বাংলাদেশ ঢুকার সুযোগ নেই।
তাদের তথ্যমতে, স্থলপথে টেকনাফের লম্বাবিল, শাহপরীর দ্বীপ, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, জালিয়াপাড়া, হেচ্ছারখাল, নাইট্যাংপাড়া, বড়ইতলী, জাদিমোরা ও সমুদ্রপথে হাড়িয়াখালিভাঙ্গা, কাঁকাবুনিয়া, খুরেরমুখ, আলুর ডেইল, মুড়ার ডেইল, বাহারছড়ার ঘাট দিয়ে প্রতিনিয়ত ইয়াবার চালান আসছে।
এসব পয়েন্টে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ ও আসা-যাওয়া বন্ধ করা গেলে ইয়াবার চালান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। যদিও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির দাবি, তাদের কঠোর নজরদারির কারণে বেশিরভাগ ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে।
কক্সবাজার পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে সবসময় কঠোর অবস্থানে ছিলো, এখনো আছে। তিনি বলেন, পুলিশ চলতি বছর মাদকের বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরেছে, যা আপনারা অবগত আছেন। আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
র্যাব-১৫ কক্সবাজারের উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, গ্রেপ্তারের পর অনেকেই জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ইয়াবার চালান আনা জন্য কেউ মিয়ানমারে গেলে তাদেরকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষা বাহিনী বাধা দেয় না, উল্টো সহযোগিতা করে। এতে করে বুঝা যাচ্ছে মিয়ানমারের আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত। এ কারণে বাংলাদেশে সহজে ইয়াবা আনতে পারে কারবারিরা।
তিনি বলেন, আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে ইয়াবা কারবারি ও সেবনকারিদের প্রতিরোধ করা না গেলে দেশে মাদক নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়বে। সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।
কক্সবাজার-৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ বলেন, ২০১৯ সালে বিজিবি ৫ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করেছিল। গত বছর কক্সবাজারে ২০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে। আর চলতি বছর শুধু কক্সবাজারেই এরমধ্যে ২০ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছে বিজিবি।
বিজিবি সবসময় কঠোর অবস্থানে থাকায় ও সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কারণে এ সফলতা এসেছে বলে মনে করেন তিনি।