রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

ইভ্যালি : ব্যবসা নাকি পনজি স্কিম?

প্রকাশিতঃ রবিবার, জুলাই ১১, ২০২১, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : পনজি স্কিম- অর্থনীতির এক বহুল পরিচিত শব্দ। এটি হচ্ছে এক ধরনের অপকৌশল, যেখানে নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের কিছু পরিমাণ পুরনো বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া হয়। ১৯২০ সালের দিকে বোস্টনে চার্লস পনজি নামের এক ব্যক্তির নাম থেকে এটা চালু হয়েছিল। এ ধরনের ব্যবস্থায় যখন অর্থপ্রবাহ কমে যায়, তখনই প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। বর্তমানে অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির কার্যক্রমের সঙ্গে পনজি স্কিমের মিল পাওয়া যাচ্ছে।

অবিশ্বাস্য মূল্যছাড় ও কিনলেই অর্থ ফেরতের অস্বাভাবিক ‘ক্যাশব্যাক’ অফার দিয়ে ব্যবসা করে আসা ইভ্যালির মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন অল্প কেউ। কিন্তু বেশিরভাগই পড়েছেন বিপাকে। পণ্য বিক্রির কথা বলে ইভ্যালি মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেয়, কিন্তু তাদের মধ্যে অনেককেই সময়মতো পণ্য দিচ্ছে না। পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তা দীর্ঘ সময় নিজের কাছে রেখে দিচ্ছে। আর ফেরত দিলেও নগদ টাকা দেয়া হয় না, ওই অর্থ দিয়ে অন্য কিছু কিনে নিতে হয়। ব্যবসার নামে এমন এক অদ্ভুত কারবারে নেমেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর বিকল্প সমাধান হিসেবে গ্রাহকদের টাকা রিফান্ড করতে ইভ্যালি আট মাস পর্যন্ত দেরি করছে- এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। একজন গ্রাহক গত ফেব্রুয়ারিতে ইভ্যালিতে অর্ডার দিয়েছিলেন, আর তাকে একটি রিফান্ড চেক ইস্যু করা হয়েছে আগস্টের ১১ তারিখ দিয়ে। আইন অনুযায়ী, চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ইভ্যালি এক মাস সময় পাবে টাকা পরিশোধের জন্য। অর্থাৎ যে ক্রেতা ফেব্রুয়ারিতে অর্ডার দিয়েছিলেন, তিনি সেপ্টেম্বরের আগে রিফান্ড পাবেন না। রিফান্ডের নামে এই অপকৌশলে ইভ্যালি গ্রাহকের টাকা আট মাস আটকে রেখে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে পারছে। এর বদলে প্রতিষ্ঠানটিকে যদি ব্যাংক লোন নিয়ে কার্যক্রম চালাত হতো, তাহলে তাদেরকে ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হতো।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৪০ শতাংশ ছাড়ে একটি ১৬০সিসি মোটরসাইকেল অর্ডার করেছিলেন মাসুদ। ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে মোটরসাইকেলটির ডেলিভারি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পরে, স্টক সমস্যার কথা বলে ইভ্যালি রিফান্ডের জন্য একটি চেক ইস্যু করে। কিন্তু চেকটি ভাঙাতে হবে এ বছরের আগস্টে। এভাবেই গ্রাহকের টাকা ব্যবসায় নেমে বর্তমান ইভ্যালির সম্পদের তুলনায় দেনা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশাল ছাড়ের লোভে ইতোমধ্যে পণ্যের জন্য টাকা পরিশোধ করে দেওয়া অনেক গ্রাহক ভিড় জমাচ্ছেন ইভ্যালীর অফিসে। তারা এখন পুঁজি ফিরে পেলেই খুশি।

ইভ্যালির গ্রাহক সৌমিক চৌধুরী বলেন, ‘আমার অর্ডার নাম্বার ৮৭৯৪৬৬৫৭৯। রিফান্ডের টাকা দুইমাস ধরে ঝুলছে। গণমাধ্যমে দেখছি, ইভ্যালি টাকা আত্মসাত করেছে, মানি লন্ডারিং করেছে। তবে কী এসব কথা সত্যি? ইভ্যালি আমার টাকা আত্মসাৎ করে নিয়েছে?’

সোহেল মির্জা নামের ইভ্যালির একজন গ্রাহক বলেন, ‘গত ৯ এপ্রিল আমি চারটি স্যামসাং ফ্রিজ, একটি স্যামসাং এসি অর্ডার করেছি। এই অর্ডারগুলো এক মাসের ভেতর গ্যারান্টেড ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি পণ্যও পেলাম না। আমাদের ভোক্তাদের টাকাগুলো কই গেল। দ্রুত ডেলিভারি দিতে পারলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে ইভ্যালি। নয়তো ছোট ই-কমার্স সাইটগুলোরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে ইভ্যালি। অনলাইন কেনাকাটায় মানুষের আস্থা থাকবে না।’

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার অর্ডার নাম্বার ৯৮৪৬১৬৫২৫। গত ১১ জুন দিয়েছিলাম। পণ্য আমাকে না দিয়েই ডেলিভারি সম্পন্ন দেখাচ্ছে। ইভ্যালিতে রিপোর্ট ইস্যু করার পর আশিকুর নামে একজন লিখলেন, ‘প্রোডাক্ট স্ট্যাটাস ডেলিভারড। আশা করি আপনি আপনার পণ্য পেয়েছেন, না পেয়ে থাকলে আমাদের জানান। ইস্যু রিজলভড।’ এসবের কোন মানে হয়? প্রোডাক্ট না পেয়েই তো ইস্যু ক্রিয়েট করলাম। আমার কাছে কেউ জানতেও চাইলো না পেয়েছি কি না। আমি কি শুধু ইস্যু ক্রিয়েট করতে থাকবো?’

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদুল আযহাকে উপলক্ষ করে পরিবারের জন্য গত ১৬ এপ্রিল সাাইক্লোন হতে একটি যমুনা ফ্রিজ অর্ডার করি। অর্ডার নাম্বার ২৪২৭৩১৫৮২। প্রায় তিন মাস হাতে রেখে ফ্রিজটি অর্ডার করেছি, আশা করেছিলাম কোরবানির আগেই পণ্যটি পেয়ে যাবো। কিন্তু এখনো পাচ্ছি না। আরও অনেকগুলো অর্ডার পিকড ও শিপড অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।

ওসমান গণি নামের একজন গ্রাহক বলেন, ‘আমার অর্ডার নাম্বার ৮৮৮৬৬১৪৩৪ ও ২৩৮৬০৯৩৯৭- একমাস আগে পিকড হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পণ্য হাতে পাইনি।’ আশিক আহমেদ নামের একজন বলেন, ‘০৮৭৭১৬৩৪৬- এই নাম্বারের অর্ডারটির পণ্য এক মাসে গ্যারান্টেড ডেলিভারি দেওয়া হবে শর্তে সাইক্লোনে ছিল। এক মাস কবেই শেষ। ফোন দিলে বলে, ওয়েট করেন। রিপোর্ট ইস্যু করলে বলে, ওয়েট করেন। মানুষের সাথে ভালোই বাটপারি করে ইভ্যালি।’

দুর্নীতি দূর করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার পরে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হওয়া অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর সম্প্রতি ই-ভ্যালি নিয়ে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ইভ্যালির স্পেশাল অফারের ৬ নং শর্তে বলা হয়েছে, পণ্যের স্টক থাকা পর্যন্ত অফার চলবে। এখানেই সবাই ধরা খেয়ে যাচ্ছেন। কেউ জানেন না পণ্যের সংখ্যা আসলে কয়টি। সাইক্লোন অফারে সবাই ছুটছেন সাইক্লোনের মত। পণ্য আছে ৫টি, যেহেতু কেউ জানে না, তাই টাকা জমা দিলেন হয়তো ১০০ জন। পণ্য পাবেন ৫ জন। বাকি ৯৫ জনের টাকা ঝুলে থাকবে দিনের পর দিন। আর সবার বোঝা উচিত যে বিক্রেতা বা কোম্পানি আপনাকে পণ্যের সঙ্গে ১০০ শতাংশ, ১৫০ শতাংশ টাকা ফেরত দিচ্ছে। নিশ্চয়ই তিনি পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে বা পকেট থেকে দেবেন না। দেবেন নিশ্চয়ই অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘টিকে যাক তারা, তা মনে প্রাণে চাচ্ছি। কিন্তু মানুষের আটকানো টাকা যদি পুঁজির মেইন সোর্স হয়, তবে আতংক বা আশংকা কখনোই যাবে না। আমাকে দেয়া ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট যদি অন্যের ঘামেঝরা টাকা হয়, চোখের পানি লেগে থাকে, তবে ঐ পণ্য আমার জন্য কখোনই হালাল হবে না। এখানে কাস্টমার হিসেবে আমি কখনোই তৃপ্তি পাব না। এ কারণেই আমি কখনো কোনো অর্ডার করিনি ইভ্যালিতে। যতদিন না আমি ক্লিয়ার হব তা। যদিও আমি জানি অর্ডারের পর দিনই ডেলিভারি পাব।’

অর্ধেক বা তার চেয়েও কম দামে কীভাবে ইভ্যালি গ্রাহকদের হাতে পণ্য তুলে দেয়- এই প্রশ্ন করা হয়েছিল ইভ্যালিতে কর্মরত একজন কর্মকর্তার কাছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ধরা যাক, ২৫ হাজার টাকা দামের একটি টিভি ১০ হাজার টাকায় নিতে দুই হাজার অর্ডার পড়েছে। তাতে ইভ্যালির কাছে জমা হবে দুই কোটি টাকা। কিন্তু তিন মাসেও তাদেরকে টিভি দেওয়া হয়নি। ওই সময়ে উক্ত দুই কোটি টাকা অন্য কোন খাতে বিনিয়োগ করে আয় করে ইভ্যালি। এখন বিভিন্ন ব্যাংক তিন মাসের এফডিআরের জন্য সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দেয়। সে হিসেবে দুই কোটি টাকায় মাসে আয় হবে লাখ টাকা। তিন মাসে তিন লাখ টাকা আসে। এরপর ২৫ হাজার টাকায় ১০০টি টিভি কিনে গ্রাহকদের হাতে তুলে দিলে বাকি থাকে আরও এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এখন যে ১০০ টিভি ডেলিভারি দেয়া হলো, তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বসেন। এটা দেখে যারা পাননি তারা আরও কিছুদিন অপেক্ষায় থাকেন। এভাবে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রেখে একপর্যায়ে রিফান্ড দেয়া হয়। এই রিফান্ড পেতেও মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকতে হয়।

ইভ্যালির ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পণ্য অর্ডারের পর ৪৫ দিন পার হলে সেটি পিকড দেখায়। অর্থ্যাৎ পণ্যের অর্ডার বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে বুঝানো হয়। পিকড লেখা আসা মানে ইভ্যালির কাজ শেষ। ইভ্যালি অর্ডারটা বিক্রেতাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। আসলে কিন্তু অর্ডার বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। পিকড দেখিয়ে সান্ত্বনা দেয়া হয়। কারণ ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিলেও বিক্রেতাকে টাকা দেয়া যাচ্ছে না। তাই বিক্রয় অর্ডার দেয়া হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, বিক্রেতার লাখ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। এই টাকা পরিশোধ না করলে তো তিনি নতুন করে পণ্য ডেলিভারি দেবেন না। অন্যদিকে পিকড লেখা দেখে, গ্রাহক ভেবে বসেন, ইভ্যালির দোষ নেই। বিক্রেতা বা সেলার দিতে দেরি করছে। ইভ্যালির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও বলে, সেলারের কাছে বিক্রয় অর্ডার পাঠানো হয়েছে। তারা যত দ্রুত সম্ভব দিয়ে দেবে। বিষয়টি আমরা দেখছি। ইত্যাদি বলে সেলারের উপর দোষ দিয়ে শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়। দিনের পর দিন পার করা হয়। এই সময়ে নানা কিছু বুঝিয়ে টাকা আটকে রেখে অন্য কোন জায়গায় বিনিয়োগ করা হয়। টাকা যেহেতু পণ্য পাওয়ার আগেই পরিশোধ করা হয়েছে, তাই গ্রাহকদেরও অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার থাকে না।’

এদিকে দীর্ঘ সময় পরও একজন গ্রাহক যখন পণ্য না পেয়ে অর্ডার বাতিল করেন, তখন টাকাটা ইভ্যালির হয়ে যায়। কারণ কোনো পণ্যের জন্য গ্রাহক ইভ্যালিকে যে টাকা দেন, সেই টাকা চাইলেও আর ফেরত পান না। কারণ ইভ্যালিতে গ্রাহকের ই-ওয়ালেট থাকে। সেখান থেকে চাইলেই নগদ টাকা তুলতে পারেন না গ্রাহক। ই-ওয়ালেট ব্যবহার করে অন্য পণ্য কিনতে হয়। এই প্রক্রিয়ার কারণে বাধ্য হয়ে নানা অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয় টাকা উসুল করতে। এ বিষয়ে মোজাফফর আহমেদ নামের ইভ্যালির একজন গ্রাহক বলেন, ‘অর্ডার করার পর গ্রাহক পেমেন্ট করলে সেই মূল টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না। সেই সুযোগ নেই। ইভ্যালি থেকেই অন্য পণ্য কিনে সেটা উসুল করতে হয়। এটা কোন ধরনের ই-কমার্স ব্যবসা বুঝলাম না। এক প্রকার প্রতারণা।’

এদিকে ইভ্যালি হেল্প অফার অ্যান্ড রিভিউ- নামে ফেসবুকে একটি গ্রুপ আছে; যেখানে সাড়ে ৭ লাখ সদস্য। গ্রুপটির বর্ণনায় বলা হয়েছে, এটি ইভ্যালির অফিসিয়াল গ্রুপ নয়। ইভ্যালিতে কেনাকাটা নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে এটি খোলা হয়েছে। ওই গ্রুপে গিয়ে দেখা গেছে, ইভ্যালি সম্পর্কে অসংখ্য ইতিবাচক পোস্ট, মন্তব্য। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোস্ট প্রদানকারী ও মন্তব্যকারীদের প্রায় সবাই ইভ্যালির কর্মী। তাদের চাকরিই হচ্ছে ইভ্যালি সম্পর্কে ইতিবাচক রিভিউ দেয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইভ্যালির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ফেসবুকে ইতিবাচক লেখালেখির জন্য দেড় শতাধিক কর্মী আছে ইভ্যালির। তারা বিভিন্ন ফেইক আইডি খুলে লেখালেখি করে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। কর্মীরা কীভাবে ফেসবুক ব্যবহার করবে সেটাও ইভ্যালি ঠিক করে দেয়। হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপে একটি লেখা দিয়ে বলা হয় শেয়ার করতে। শেয়ার করার পর হোয়াটসঅ্যাপে সেটা লিখতে হয়।’

এভাবে গ্রাহকের টাকা ব্যবসা করে আসা ইভ্যালির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ৪ জুলাই সরকারের চার প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠান চারটি হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ইভ্যালির ওপর করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসে যে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছ থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির নেওয়া অগ্রিম ৩৩৯ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এ টাকা আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইভ্যালির মোট দায় ৪০৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, আর মার্চেন্টদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়েছে ১৯০ কোটি টাকার। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমপক্ষে ৪০৪ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা। কিন্তু সম্পদ আছে মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, চলতি সম্পদ দিয়ে মাত্র ১৬ শতাংশ গ্রাহককে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে ইভ্যালি। গ্রাহক ও মার্চেন্টদের পাওনা পরিশোধ করা ওই কোম্পানির পক্ষে সম্ভব নয়। ইভ্যালির চলতি দায় ও লোকসান দুটিই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং কোম্পানিটি চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্ট চক্রে বাঁধা পড়েছে। ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটি শুরু থেকেই লোকসান করে আসছে এবং সময়ের সাথে সাথে লোকসানের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইভ্যালী পূর্বের দায় পরিশোধ এবং লোকসান আড়াল করার জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার (যেমন-সাইক্লোন, আর্থকোয়েক ইত্যাদি নামে মূলত ব্যাপক হ্রাসকৃত মূল্যে বা লোকসানে পণ্য সরবরাহ) এর মাধ্যমে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে তাদের নিকট হতে অর্থ সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রমাগত নতুন দায় সৃষ্টির (গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে দায় বৃদ্ধি) মাধ্যমে পুরাতন দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। এজন্য নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করতে আরও অধিক হারে ডিসকাউন্ট বা অফার করে যাচ্ছে। এতে সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিটির মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪৪,৮৫,২৩৪ জন। ক্রয়াদেশ বাতিল, ইভ্যালীর দেওয়া ক্যাশব্যাক, বিক্রিত গিফটকার্ডের সমন্বয়ে এসব গ্রাহকদের ইভ্যালি ভার্চুয়াল আইডিতে (একাউন্ট, হোল্ডিং, গিফটকার্ড, ক্যাশব্যাক) মোট ৭৩.৩৯ কোটি টাকা মূল্যমানের ই-ভ্যালু সংরক্ষিত ছিল। অথচ ওই দিন শেষে ইভ্যালি ডট কম লিমিটেডের ১০টি ব্যাংক হিসাবে মোট ২.০৪ কোটি টাকা জমা ছিল।

ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের কর্মকাণ্ডে সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, লোকসানে পণ্য বিক্রি করার কারণে ইভ্যালি গ্রাহক হতে অগ্রিম মূল্য নেওয়ার পরও মার্চেন্টদের কাছে বকেয়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ লোকসানে পণ্য বিক্রির ফলে ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে, যা অন্য কোম্পানিগুলোকেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণে উৎসাহিত করবে। ফলে ভালো ও সৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এক সময় এইখাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। গ্রাহক ও মার্চেন্ট এর বকেয়া ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এক সময় বিপুল সংখ্যক গ্রাহক ও মার্চেন্টের পাওনা অর্থ না পাওয়ার ঝূঁকি তৈরি হবে এবং এর ফলে সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১ টাকা আয় করতে ইভ্যালির ব্যয় হয়েছে ৩.৫৭ টাকা। ২০২০ সালের জুলাই থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির মোট আয় (রেভিনিউ) ২৮.৫৪ কোটি টাকা। এই সময়ে কোম্পানিটির সেলস ব্যয় ২০৭ কোটি টাকা। কোম্পানিটি প্রতি এক টাকা আয়ের জন্য তিন টাকা ৫৭ পয়সা বিক্রয় ব্যয় করেছে বলে স্টেটমেন্টে প্রদর্শন করেছে এবং এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছর ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর বছর থেকেই ইভ্যালি লোকসানে রয়েছে এবং দিন দিন এর লোকসান বাড়ছে। প্রথম বছর কোম্পানিটির নিট লোকসান ছিল ১.৬৮ লাখ টাকা। গত ১৪ মার্চে কোম্পানিটির পুঞ্জিভুত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬.৪৯ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন কোম্পানি কার্যক্রম শুরুর পর প্রাথমিক অবস্থায় কিছু লোকসান দিতে পারে কিন্তু অল্প মূলধন নিয়ে ক্রমাগতভাবে লোবসান দিয়ে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন করে দায় সৃষ্টির মাধ্যমে পুরনো দায় পরিশোধ করা কোম্পানিটির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম ঘাটতি নির্দেশ করে। অদূর ভবিষ্যতে এই পরিমাণ দায়দেনা কাটিয়ে উঠার কোন গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা পরিদর্শনকালে পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্যমূল্যের অগ্রিম হিসেবে নেওয়া অর্থ কোনরূপ লাভ-ক্ষতি বা কমিশন হিসাবায়ন ছাড়াই ইভ্যালি উচ্চ হারে পরিচালন ও বিপণণে ব্যয় করছে। অগ্রিম টাকা পেতে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা এবং কোম্পানির আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন ব্যয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসানের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে গত ১৪ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ইভ্যালি ডট কম লিমিটেডের কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শেষে পরিদর্শন কাজ শুরু করে। পরিদর্শক দলের পক্ষ থেকে ইভ্যালির আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করা এবং পরবর্তী চার দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করে মোহাম্মদ রাসেলের সহায়তা চান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা। কিন্তু বার বার সময় নিয়েও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পরিদর্শক দলকে সরবরাহ করতে সমর্থ হয়নি ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় গ্রাহকের সংখ্যা, ক্রয়াদেশের পরিমাণ, ক্রয়াদেশ বাবদ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ, সরবরাহ করা পণ্যের মূল্য, বাতিল ক্রয়াদেশের পরিমাণ, বাতিল ক্রয়াদেশের বিপরীতে রিফান্ডের পরিমাণ, মার্চেন্টকে পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ, মার্চেন্ট এর নিকট বকেয়া, ইভ্যালির প্রাতিষ্ঠানিক খাতওয়ারী আয়-ব্যয়, পরিশোধিত কর, মুনাফা, ক্রয়-বিক্রয়, মূল্যছাড় ও লাভক্ষতি সম্পর্কিত মাসভিত্তিক তথ্য পরিদর্শন দলকে সরবরাহ করেনি ইভ্যালি।

পণ্যমূল্য বাবদ প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ও পণ্য সরবরাহকারীর নিকট বকেয়া এবং তার বিপরীতে পণ্য সরবরাহকারীকে পরিশোধিত অর্থ, কোম্পানির পরিচালন ব্যয়, গ্রাহককে ফেরত দেওয়া অর্থ, কোম্পানির ব্যাংক ও নগদ অর্থের স্থিতি সংক্রান্ত সকল তথ্যাদি মাসিক ভিত্তিতে পাওয়া গেলে ইভ্যালীর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সঠিক চিত্র পাওয়া যেত।’ বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ এবং ইভ্যালির সরবরাহ করা তথ্যাদির সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য রেপ্লিকা ডাটাবেইজে অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য ইভ্যালিকে অনুরোধ করা হয়। ওই অনুরোধের প্রেক্ষিতে কিছু সময়ের জন্য রেপ্লিকা ডাটাবেইজে অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ দিলে গ্রাহক ও গ্রাহকদের ই-ভ্যালি ভার্চুয়াল আইডি সম্পর্কিত কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপরে পরিদর্শন দলকে রেপ্লিকা ডাটাবেইজে কোন প্রকার অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।

‘রেপ্লিকা ডাটাবেইজে তথ্যানুসন্ধানের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির আইসিটি সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা, মাসভিত্তিক ও পুরাতন ডাটা না থাকা, নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং এর ফলে আইসিটি সিস্টেমে সংরক্ষিত ডাটার সঙ্গে পরিদর্শন দলকে সরবরাহ করা ডাটায় বিস্তর পার্থক্য থাকার বিষয়টি পরিদর্শন দলকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ। তবে সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা বা অতীতের একটি নির্দিষ্ট তারিখের তথ্য না থাকা বা সময়ে সময়ে হালনাগাদ করা তথ্য সংরক্ষিত না থাকার বিষয়ে ইভ্যালী পরিদর্শন দলকে কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়নি। সার্বিকভাবে পরিদর্শন কার্যক্রমে যাচিত তথ্য সরবরাহ এবং আইসিটি সিস্টেমের তথ্য ভান্ডারে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোয় ইভ্যালির দেওয়া সহায়তা সন্তোষজনক নয়।’ যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কেউ যখন একটা দোকানে কিছু কিনতে যায়- তখন দোকানদার যদি বলে, এখান থেকে পণ্য কিনতে হলে আগে টাকা জমা রাখতে হবে। সেই জমা টাকা থেকে আপনি অমুক তারিখে এত দিন পরে আমার মাধ্যমে পণ্য এই এই সুবিধাসহ ভোগ করবেন। এমন কারবার সাধারণভাবে কেউ মেনে নিবে না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ইভ্যালি এই কাজটিই দেশে প্রকাশ্যে দিনের পর দিন করে যাচ্ছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কীভাবে ইভ্যালি কোটি কোটি টাকা জমা করেছে? তারপরও সরকারকে ধন্যবাদ, লাগাম টেনে ধরেছে। নয়তো আরও বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী মোহাম্মদ রাসেল হচ্ছেন ই-ভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা ব্যাংক দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে ছেড়ে দিয়ে ‘কিডস’ ব্র্যান্ডের ডায়াপার আমদানি শুরু করেন। পরে ২০১৮ সালে চালু করেন ইভ্যালি। ওই বছরের ১৪ মে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নেয় ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেড। এর অনুমোদিত মূলধন ৫ লাখ টাকা। বর্তমান তাদের নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৫০ লাখ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে ২৫ হাজার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং তারা ৪ হাজার ধরনের পণ্য বিক্রি করে কমিশন পাচ্ছে। মাসে লেনদেন হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি পণ্য। মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে শুরু করা এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন এখনো ৫০ হাজার টাকাই।

যাত্রা শুরুর দিকে ১০ টাকায় একটি পেনড্রাইভ এবং ১৬ টাকায় টি-শার্ট বিক্রি করে ইভ্যালি। সে সময় চালু করা হয় ‘ভাউচার’ নামক একটি পদ্ধতি, এতে দেওয়া হতো ৩০০ শতাংশ ও ২০০ শতাংশ ক্যাশব্যাক। পরে ১৫০ শতাংশ, ১০০ শতাংশ এবং পরে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাকের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু গত জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইভ্যালির সম্পদের তুলনায় দেনার পরিমাণ ছয় গুণ বেশি। এছাড়া ইভ্যালির ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় মডেল নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর গত ৩০ জুন সাইক্লোন অফারের নামে অস্বাভাবিক ‘ক্যাশব্যাক’ দেয়ার কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

একইদিন ইভ্যালি জানায়, টি১০ নামে নতুন এক ক্যাম্পেইন চালু করছে তারা। এই ক্যাম্পেইন চলবে প্রতি শুক্রবার ঠিক রাত ১০টা ১০ মিনিটে। যে কোনো পণ্য বা সেবার মূদ্রিত মূল্যের শুধু ১০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে বাকি মূল্য ক্যাশ অন ডেলিভারিতে (সিওডি) অর্থ্যাৎ পণ্য হাতে পেয়ে পরিশোধ করতে পারবেন গ্রাহকরা। আর পণ্যের ডেলিভারি পাওয়া যাবে মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই।

এই টি১০-এ পণ্য ডেলিভারি কেমন তা নিয়ে এখনো অভিযোগ না উঠলেও এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজে পণ্য অর্ডার করতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তৌহিদুল ইসলাম নামের একজন গ্রাহক বলেন, ‘টি১০-এ আগের মতো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এরপরও সেখানে সহজে পণ্য অর্ডার করা যায় না। ইভ্যালির ওয়েবসাইটে সহজে প্রবেশ করা গেলেও দেড় ঘন্টার ক্যাম্পেইন চলাকালে টি১০-এর সাব ডোমেইনে সহজে প্রবেশ করা যায় না। শুধু লোডিং হচ্ছে দেখায়। পুরো দেড় ঘন্টা চেষ্টা করে একটা-দুইটার বেশি অর্ডার করা সম্ভব হয় না।’

গত ৯ জুলাই (শুক্রবার) রাতে ইভ্যালির ওয়েবসাইটে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। রাত ১০টা ১০ মিনিটে টি১০ ক্যাম্পেইন চালু হবে বলা হলেও শুরু হয় ২৫ মিনিটের দিকে। এরপর প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টা করে একটি মোবাইল অর্ডার দিতে সক্ষম হন এ প্রতিবেদক। এরপর আর কিছু অর্ডার করতে চাইলেও সম্ভব হয়নি। টি১০-এর সাব ডোমেইনে প্রবেশ করতে গেলে শুধু লোডিং হচ্ছে দেখায়।

ইভ্যালির মাধ্যমে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ফটোকপি মেশিন বিক্রি করে আসা চকবাজারের একজন বিক্রেতা বলেন, ‘ইভ্যালি তার গ্রাহককে ই-কমার্সের প্রতি অভ্যস্ত করছে বলে দাবি করে। এই অভ্যস্ত করাটাই ইভ্যালির বিনিয়োগ বলে তারা জানায়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ই-কমার্স নয়, বিশাল মূল্য ছাড়ে অভ্যস্ত হচ্ছে গ্রাহকরা। এভাবে বড় ছাড় ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক নয়। মূল্য ছাড় দিয়ে ইভ্যালি গ্রাহক তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু নিয়মিত বিজনেস গ্রাহক তৈরি করতে পারেনি, এসব গ্রাহকরা শুধু প্রতি শুক্রবার রাতে দেয়া অফারের অপেক্ষায় থাকে। তারপরও আমি আশা করবো, ইভ্যালির দশা যেন পনজি স্কিমের মতো না হয়।’

জানতে চাইলে ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘অতীতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কোন নিয়মনীতি ছিল না, তাই সরকারকে আমরা প্রায় দু’বছর আগে থেকেই পরামর্শ দিয়েছিলাম ই-কমার্স খাতের জন্য একটি পরিচালনা নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য, যেখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। ই-কমার্সভিত্তিক কোন বড় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তা একদিকে যেমন ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তেমনি একই সাথে লক্ষ লক্ষ উদ্যোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আমরা চাইনি কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বন্ধ হোক, যদি না তারা কোন আইন বহির্ভূত কার্যক্রম করে।’

তিনি বলেন, ‘ই-ক্যাবের পরামর্শে সরকার লক্ষ লক্ষ উদ্যোক্তা ও ক্রেতার কথা চিন্তা করে দ্রুত যুগোপযোগী একটি ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে। এখন প্রতিটি ই-কমার্স কোম্পানি এই নির্দেশিকা মেনে ব্যবসা পরিচালনা করবে যেখানে প্রত্যেকেরই স্বার্থ সুরক্ষা পাবে। সময়মতো ডেলিভারি না পাওয়া, অধিক ডিসকাউন্টের লোভে এডভান্স টাকা দিয়ে দিনের-পর-দিন প্রোডাক্টটা না পেয়ে বসে থাকা, এরকম আরো বহু সমস্যার সমাধান হবে এবার।’

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। যদিও ইভ্যালির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে তাকে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয় একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে। তা দেখে ইভ্যালির এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নয়, পরে দেয়া হবে। আপাতত গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে আমি ভিডিও বক্তব্য দিয়েছি, ইভ্যালির আইডির মাধ্যমে। এর বাইরে আমি এখন আর কিছু বলতে চাই না।’

ইভ্যালির এমডিকে করা একুশে পত্রিকার প্রশ্নগুলো হচ্ছে: ১। ই-ভ্যালি লোকসানে পণ্য বিক্রি করছে। যে কারণে দেশের ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, এতে অনেক ই-কমার্স ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং ভবিষ্যতে এই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন, দয়া করে জানাবেন।

২। অগ্রিম পণ্যমূল্য নিয়ে ও উচ্চ হারে ছাড় দিয়ে ই-ভ্যালির গ্রাহকদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে অভিযোগ আছে। গ্রাহকের কাছে এবং পণ্য উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারীদের কাছে বকেয়া বাড়ছে ই-ভ্যালির। বলা হচ্ছে, চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্ট চক্রে বাধা পড়েছে ই-ভ্যালি। ক্রমাগতভাবে এমন দায় তৈরি হওয়ায় ই-ভ্যালির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে কি না?

৩। ই-ভ্যালির লোকসান দিন দিন বাড়ছে। প্রথম বছর কোম্পানিটির নিট লোকসান হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। গত ১৪ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৩১৬ কোটি টাকা। আগের দায় পরিশোধ ও লোকসান আড়াল করার জন্য কোম্পানিটি সাইক্লোন, আর্থকোয়েক নামের বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

৪। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ই-ভ্যালির দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৩ কোটি টাকা, আর চলতি সম্পদ ছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকার। এই সম্পদ দিয়ে কোম্পানিটি দায় পরিশোধ করতে পারবে না বলে আশংকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পণ্যমূল্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৪ কোটি টাকা নিয়েও পণ্য সরবরাহ করেনি ই-ভ্যালি। আবার যেসব কোম্পানির কাছ থেকে ই-ভ্যালির পণ্য কিনেছে, তাদের কাছেও এর বকেয়া পড়েছে ১৯০ কোটি টাকা। চলতি সম্পদ দিয়ে বকেয়া অর্থের মাত্র ১৬ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব। অদূর ভবিষ্যতে দায়দেনা কাটিয়ে ওঠার কোনো গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা ই-ভ্যালির থাকলে জানাবেন।

৫। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, “ই-ভ্যালির অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ই-ভ্যালির আর্থিক ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দিতে বললেও বারবার সময় চায় ই-ভ্যালি কর্তৃপক্ষ। অতীতের একটি নির্দিষ্ট তারিখের তথ্য নেই কোম্পানিতে। এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি।” এসব অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানাবেন।

৬। ইভ্যালির ব্যাংক বিবরণী সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “প্রায়ই নগদ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকে থাকা একটি হিসাবের এক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নগদ টাকা তুলেছেন হিসাব রক্ষক। এভাবে নগদ অর্থ তোলা ঝুঁকিপূর্ণ। আবার একই পরিমাণ অর্থ বারবার ডেবিট করা হয়েছে।” এভাবে নগদ অর্থ তোলা ও একই পরিমাণ অর্থ বারবার ডেবিট করার কারণ কী?

৭। অভিযোগ আছে, ই-ভ্যালির কার্যক্রমের ধরন অনেকটা এমএলএম কোম্পানির মতো। এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতারণার চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে ই-ভ্যালিও তাই করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এখানে মানি লন্ডারিং হচ্ছে।- এ অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী।

৮। ই-কমার্সের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিক পণ্য সময়মতো পৌঁছানো। কিন্তু ইভ্যালি অনেক ক্ষেত্রেই কাজটি করতে পারছে না বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া ইভ্যালির কাস্টমার সাপোর্ট অপশনটি ব্যবহার করে গ্রাহকরা সন্তুষ্ট হতে পারেন না বলে প্রায়ই ফেসবুকে অভিযোগ দেখা যায়। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

৯। ই-ভ্যালি যে ওয়ালেট পদ্ধতিতে টাকা রাখছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সবিহীন বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানাবেন।

১০। সাধারণত দেখা যায় বিনিয়োগকারীদের টাকায় ব্যবসা করা হয়। কিন্তু ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, গ্রাহকের অগ্রিম টাকা দিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। এই মডেলে বিজনেস করা নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে এ প্রেক্ষিতে ই-ভ্যালির বক্তব্য কী?

১১। ই-ভ্যালি ক্যাপিটাল মার্কেটে যাচ্ছে না কেন? দয়া করে জানানোর অনুরোধ।

এদিকে গত ৮ জুলাই ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং তার স্বামী ও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে দুদকের ৩৩৮ কোটি টাকা জালিয়াতি বা আত্মসাতের তদন্ত চলমান থাকায় এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বিষয়টি ৯ জুলাই জানাজানি হওয়ার পর রাতে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে মোহাম্মদ রাসেল বলেন, ‘আমি আমার বিদেশ যাওয়া নিষেধাজ্ঞা বিষয়টি পজিটিভলি দেখছি। বাংলাদেশের সব বড় কোম্পানির সাথে আমার সম্পর্ক। হয়তো আমাকে ভালোবাসার জন্য ওনাদের ভয়ের এই বিষয়টা আমাকে বলতেন না। আমরা বিজনেস করেছি সবার সাথেই। এখন ওনারা আরো বেশি কনফিডেনস পাবে। এখন আমরা অনেকটাই প্রফিট এ বিজনেস শুরু করেছি। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী গ্রাহকদের টাকা আমাদের হাতে আসার সুযোগ নাই। এছাড়া তদন্ত করলেই সবাই দেখবেন পুরাতন অর্ডার কি পরিমান ডেইলি যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এ লস হয়েছে, সেটা বিজনেস করেই প্রফিট করে ফেলব এর চেয়ে কম সময়ে। কারণ আমাদের ক্রয় মূল্য বাজার মূল্য থেকে অনেক কম। সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রম জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য। আমি শুধু একটাই রিকোয়েস্ট করব যে আমাদের তদন্ত বিষয়ে অতি উৎসাহ নিয়ে কেউ কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বলবেন না। আপনাদের রেগুলার কেনাকাটা ইভ্যালিতে করুন। এতেই ইভ্যালির লস এর যৌক্তিকতা আসবে। কখনো কোন দেশের মালটিপল ভিসা ছিল না, এখন কোন ভিসা ও নাই এবং কখনো কোন সিটিজেনশীপ এর জন্য এপ্লাই করি নাই। ঘুরতে গিয়েছিলাম কয়েকবার। দেশ আমাদের। আমরা সবাই দেশের জন্যই কাজ করতে চাই। দোয়া রাখবেন।’