শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

কোভিডে হারিয়ে যাওয়া বরেণ্যদের ছবি-সনেটে নান্দনিক স্মরণ

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৫, ২০২১, ৩:২৯ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্জন-গৌরবগাথা, সফলতা-ব্যর্থতা তুলে ধরতে যুগে যুগে চিত্রকর্মের প্রচুর ব্যবহার হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু ‘চিত্রকর্মের মাধ্যমে প্রয়াতদের স্মৃতিচারণ’ কখনো চিন্তা করেছেন কিংবা এমন কিছুও কি সম্ভব?

কোভিড-১৯ এ আমরা দেশবরেণ্য অনেক গুণীজনকে হারিয়েছি। এমন গুণী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও পেশাজীবীদের স্মৃতিচারণে অনন্য এক পথে হেঁটেছেন চিত্রশিল্পী আহমেদ শামীম। নিজের আঁকা ছবির মাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণের পাশাপাশি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন চতুর্দশপদী কবিতা/সনেট রচনা করে।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা মোট ১৯ জনের ছবির সাথে লিখেছেন ১৯টি সনেট। ব্যতিক্রম এই কাজের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন এ শিল্পী। ছবি আর কবিতার সংমিশ্রণ যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। ছবিগুলো যেমন আলাদা, ব্যতিক্রম তার চিত্রকর্ম তৈরির প্রক্রিয়াও। অন্য দশজন শিল্পীর মতো নয়। একটি অ্যাপের মাধ্যমে আঁকা এসব চিত্রকর্মে আছে নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্যতা।

চিকিৎসক, অভিনেত্রী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, শিল্পপতি, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, সংগীতশিল্পী, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, অ্যাথলেটসহ বেশ ক’জন ব্যক্তির ছবিতে তিনি সনেট সংযুক্ত করেছেন ঠিকই, কিন্তু এসব সনেটের প্রেক্ষাপট ছবি থেকে আলাদা। যাকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন তাদের নিয়ে সনেট রচনা করেননি। প্রত্যেকটি কবিতার বিষয়বস্তু যেমন আলাদা তেমনি মার্জিত, গভীর ও গম্ভীর। কবিতাগুলো নিসন্দেহে পাঠকদের নাড়া দেবে, বাধ্য করবে ভাবতে।

রোগমুক্তির প্রার্থনা, ধুলিকণা সম্রাট, ইতিহাসে মহামারি, আদুরে আব্বু হত্যা, হতবাক কোভিড, পরিস্থিতি, কোভিড রোগী, সম্পর্কের কোভিড, মহামারি স্যাটায়ার, শংকিত মুমিন, এই হল ডাক্তার, ট্রলবাজ সাবধান, অবদান যাদের, টেস্ট নাকি ট্রিটমেন্ট, ফিরে আসে বিভীষিকা, জনসাধারণের প্রচেষ্টা, লোক দেখানো, ওর মেসেঞ্জার, বিশ্ববিজ্ঞান যখন এক’- এসব শিরোনামের প্রতিটি কবিতায় রয়েছে ভিন্ন স্বাদ।

চতুর্দশপদী কবিতা/সনেট তৈরি হয় ১৪টি চরণে। যার প্রতিটি চরণে থাকে ১৪টি করে অক্ষর। দুই স্তবকে বিভক্ত এই কবিতায় যথাক্রমে ৮টি ও ৬টি চরণ (চরণ বিন্যাসে ব্যতিক্রম থাকতে পারে) থাকে। প্রথম আট চরণের স্তবককে অষ্টক এবং পরবর্তী ছয় চরণের স্তবককে ষষ্টক বলে।

অষ্টকে মূলত ভাবের প্রবর্তনা এবং ষষ্টকে থাকে ভাবের পরিণতি। অষ্টকে ভাব ঘণীভূত হয়ে প্রকাশ পেলেও ষষ্টকে এই ভাবের ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। এসব কবিতার ভাব প্রকাশের মধ্য দিয়েই তিনি হৃদয়ের গভীর আনন্দ-বেদনা বা বিশেষ অনুভূতি ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছেন। স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল শব্দের কবিতাগুলোতে নেই দুর্বোধ্যতার ছিটেফোঁটা।
চিত্রশিল্পী আহমেদ শামীম এঁকেছেন- সিলেট এমএ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন, জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ নায়িকা সারাহ বেগম কবরী (মীনা পাল), প্রয়াত অ্যামিরেটার্স অধ্যাপক বরেণ্য শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান, কোলকাতার কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জি, প্রয়াত এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, এস আলম গ্রুপের পরিচালক শিল্পপতি মোর্শেদুল আলমের ছবি।

শিল্পীর এই চিত্রকর্মে স্থান পেয়েছে দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী ও ভাষাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র পুত্র কিংবদন্তি শিল্পী মুর্তজা বশীর, দেশবরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিশিন অ্যান্ড রেফারাল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফ হাসানও।

আছেন মঞ্চ অভিনেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও এশিয়াটিক মার্কেটিং কমিউনিকেশন লিমিটেডের কর্ণধার আলী জাকের, একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক রিফাত সুলতানা, একুশে পদকপ্রাপ্ত পল্লীগীতির শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, আকরাম আহমেদ বীর উত্তম, সাবেক স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বাবুল, মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক এহসানুল করিম, অ্যাথলেট ও ফুটবলার ‘দ্রুততম মানব’ মইনুল হুদা কিং।

আহমেদ শামীমের মতে কোভিড-এর এই সময়টা কঠিন, কিন্তু মানুষ যেন কঠিন না হয়, শিল্প যেন কঠিন না হয়ে যায় সেই প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি। নিজের চিত্রকর্ম আর কবিতার এই যুগলবন্দী নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি একুশে পত্রিকাকে।

ছবির সাথে সনেটের সংমিশ্রণের কথা হঠাৎ কেন মাথায় আসলো? জবাবে আহমেদ শামীম বলেন, ২০২০ সালে আমি নিজেই কোভিড আক্রান্ত হই। ওই বছর আমার মামাও ইন্তেকাল করেন। উনি যেদিন মারা যান সেদিন আমি আক্রান্ত হই। ওই বিভীষিকাময় সময়ে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। তখন আমার মনে চিন্তা আসে কিছু একটা লেখা উচিত, কিছু যদি লিখতে পারতাম। কোভিড-এ স্বজন হারিয়ে চারিদিকে শুধু কান্না-আহাজারি শুনতে পেতাম। বিষয়গুলো আমাকে খুব নাড়া দিচ্ছিলো। মনে হলো এসব বিষয় তো আমি সনেটের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি। সেই থেকে কাজ শুরু। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক বিষয় আমি আমার কবিতায় নিয়ে এসেছি। আর সনেট-কবিতার প্রতি আমার বরাবরই একটা ইমোশন ছিলো। যদিও কবিতা পড়ার মতো মানুষ এখন খুবই কম। ছবি দেখার মতো মানুষ আছে। তাই চিন্তা করলাম, ছবি একে যদি সনেটগুলো দেই তাহলে মানুষ পড়বে।

কোভিডে তো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেছেন, আপনি উল্লিখিতদের কেন শিল্পীর তুলিতে বেঁছে নিলেন? যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে তো বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ আছে- শামীম বলেন, চিন্তা করলাম যেহেতু করোনায় চিকিৎসার বিষয়টি বেশি আলোচিত হচ্ছিলো। চিকিৎসা সম্পর্কিত কিছু দিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করি। প্রথমে অ্যাম্বুলেন্সের ছবি আঁকলাম সাথে সনেট দিলাম, দেখলাম মানুষ ছবিগুলো সেভাবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু যখন ব্যক্তির ছবির সাথে তথ্যাবলী দেওয়া শুরু করলাম তখন মানুষের ভালো লাগতে শুরু করলো। সেই থেকে যাদের প্রতি মানুষের জানার ইচ্ছা, কৌতূহল তাদের নিয়ে এই কাজে এগুতে থাকি।

কেমন সাড়া পেয়েছেন? এগুলো যখন আমি শুরু করি তখন নিজের ওয়ালে পোস্ট করতাম। একদিন একটা গ্রুপে এমনিতেই পোস্ট করি। তখন তেমন একটা রেসপন্স না পেলেও ধীরে ধীরে মানুষের সাড়া পেতে থাকি। মানুষের ভালোবাসা দেখতে পাই আমার কাজের প্রতি। এমনও হয়েছে কিছু মানুষ আমাকে ইনবক্সে একের পর এক মেসেজ দিয়ে বলতে থাকেন আমার কাজ তাদের খুবই ভালো লাগে, অনুরোধ করেছেন তাদের ছবি এঁকে দিতে। আমি মনে করি এটাই আমার প্রাপ্তি যে মানুষ চাচ্ছে আমার কাজের মাধ্যমে তাদেরকে দেখতে। আমার কাজ মানুষের এতো ভালো লাগবে আমি চিন্তাই করিনি।- যোগ করেন আহমেদ শামীম।

ছবিগুলো আঁকতে আপনার কতো সময় লেগেছে? আসলে আঁকতে বসলে সময়টা আমার খেয়াল থাকে না। এমনও হয়েছে একটা ছবি নিয়ে কয়েকদিন কাজ করেছি, আবার একদিনেই কয়েকটা ছবির কাজ শেষ করেছি- বলেন এ শিল্পী।

চিত্রশিল্পী আহমেদ শামীম বলেন, ‘আসলে কাজগুলো আমি নাও করতে পারতাম। এই কোভিডে আমার পরিবার আক্রান্ত হওয়ার পর আমার মা তারপর খালা আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমার মামাকে হারিয়েছি, খালাকে হারিয়েছি। আমার পরিবারে মানুষজন যখন এক এক এক করে চলে যাচ্ছে তার মধ্যে ছবি আঁকা, কিছু লেখা কেমন যেন অপরাধবোধ হচ্ছিলো, যে আমার পরিবারের লোকজন মারা যাচ্ছে আর আমি বসে বসে ছবি আঁকছি, কবিতা লিখছি। পরে চিন্তা করলাম আমাকে করতে হবে, করে যেতে হবে। আমি তো সাধারণ মানুষ, ২/১টা কাজ হয়তো আমি করতে পারি। আর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে, তাদেরকে কিছু দিতে এটা ছাড়া আমার আর কিছু নেই। এই প্রতিভাটা যেহেতু আমার মধ্যে আছে তাই একে কাজে লাগিয়েই তো আমাকে কাজ করতে হবে। এই চিন্তা থেকে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছিলাম।’