রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

সীতাকুণ্ড উপকূলে হরিণ শিকার চলছেই, অসহায় বন বিভাগ

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, জুলাই ২০, ২০২১, ৩:১৯ অপরাহ্ণ


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় বন্য হরিণ শিকারে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। নানা রকম ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার ও চড়া দামে হরিণের মাংস বিক্রিতে রীতিমত বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে এ চক্রটি। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্র উপকূলে অবৈধভাবে হরিণ শিকার হলেও এখনো কাউকে আইনের আওতায় আনা যায়নি।

অভিযোগ উঠেছে, হরিণের মাংস ও টাকার ভাগ পাওয়ায় শিকারিদের সমর্থন দিয়ে আসছে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। আর হরিণ শিকারে জড়িত চক্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় বন বিভাগ। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনে-রাতে চলছে মায়াবী হরিণ শিকার ও মাংস বিক্রি। এভাবে হরিণ শিকার তথা হত্যার ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। হরিণ শূন্য হচ্ছে সমুদ্র উপকূল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের মহানগর, বগাচতর, শেখেরহাট, বাকখালী, মুরাদপুর ইউনিয়নের গোপ্তাখালী, গুলিয়াখালী ও বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলীয় কেওড়া বনে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র হরিণ শিকার ও মাংস বিক্রি করে আসছে। সিএনজি অটোরিকশার ব্রেকের ধারালো তার গাছের সাথে আড়াআড়িভাবে বেঁধে ও সবজির সাথে কীটনাশক মিশিয়ে তা বনের বিভিন্ন জায়গায় ছিটিয়ে রাখে হরিণ শিকারিরা।

পরে খালের পাড়ে হরিণেরা পানি খেতে আসলে ধারালো তার গলায় বিঁধে বা বিষযুক্ত সবজি খেয়ে হরিণ মারা যায়। নির্দিষ্ট সময় পর হরিণ শিকারিরা এসে মাংস ছাটাই করে খালের পানিতে হাঁড় ও উচ্ছিষ্ট ফেলে চলে যায় এবং প্রতি কেজি মাংস ৮’শ টাকা দরে বিক্রি করে পূর্বেই অর্ডারকারী ব্যক্তির কাছে। এভাবেই প্রতিনিয়ত হরিণ শিকার করছে ওই সিন্ডিকেট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীতাকুণ্ড সৈয়দপুর ইউনিয়নের মহানগর এলাকার একজন কৃষক একুশে পত্রিকাকে বলেন, বনের গহীনে গাছের ভিতর তার আটকে হরিণ শিকার করা হয়। শিকারিদের পাতানো এসব বিপজ্জনক ফাঁদে অনেক সময় আমাদের গরু মহিষ আহত হয়। ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। এসব তার এতো ধারালো যে সাথে সাথে গরু কিংবা মহিষের গলা কেটে রক্ত বের হয়। গত সপ্তাহে আমার একটি গরুর গলা কেটে যায়। যেটিকে এখনো সুস্থ করে তোলতে পারিনি। ফলে এই কোরবানির পশুর হাটে গরুটি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

বগাচতর এলাকার এক কৃষাণী বলেন, আমারসহ মফিজুর রহমান, মোস্তাক ও সেলিমের বেশ কয়েকটি গরু-মহিষ ওই সব তারে আক্রান্ত হয়। গরুগুলোকে এখনো চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হরিণ শিকারের এসব ফাঁদে গরু-মহিষের মৃত্যুও হতে পারে বলে জানান তিনি।

তবে সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে পালা করে হরিণ শিকার হলেও এখনো কাউকে আইনের আওতায় আনা যায়নি। কেবল শোনা কথায় থেকে গেছে এসব ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের গাফিলতির কারণে হরিণ শিকার অব্যাহত আছে, এখানে তারা আসে না। শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় দিনদিন বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে এ সিন্ডিকেট। হরিণ শিকারিদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ কৃষক ও খামারীরা। সবুজ ঘাসের আবরণ থাকায় গবাদিপশু চড়ানোর উত্তম স্থান বেড়িবাঁধ ও সমুদ্র এলাকা। কিন্তু শিকারিদের পাতানো ফাঁদে গবাদিপশু আহত হওয়ায় সমুদ্র উপকূলে গৃহপালিত প্রাণির বিচরণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কারা সমুদ্র উপকূলে হরিণ শিকার ও মাংস বিক্রি করছে সে বিষয়ে জানাতে পারেনি সীতাকুণ্ড উপকূলীয় বন বিভাগও। সীতাকুণ্ড উপকূলীয় বন বিভাগের তথ্যমতে, সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলের বগাচতর থেকে বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার হরিণ রয়েছে।

উপকূলীয় বন কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, কয়েক বছর আগে অল্প সংখ্যক হরিণ এখানে ছাড়া হয়। জরিপ করা না হলেও আমাদের ধারণা প্রায় ৫ হাজার হরিণ এ বনে আছে। মীরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় সেখানের হরিণ দলও আমাদের সীতাকুণ্ডে চলে এসেছে। বংশবিস্তারের সুবাধে এখন এ বনে হরিণের সংখ্যা অনেক।

তবে হরিণ শিকারের খবর আমরা পেয়ে থাকলেও কে বা কারা হরিণ শিকার করছে তা জানা যায়নি। সাধারণ মানুষও আমাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে না। গত বছরের ডিসেম্বরে বগাচতর এলাকা থেকে একটি মরা হরিণ আমরা উদ্ধার করি। সর্বশেষ গত মাসে গুলিয়াখালীর খালে মরা হরিণ পানিতে ভাসার সংবাদ পেলে আমরা সেখানে ছুটে যাই। কিন্তু পরে সেটি দেখতে পাওয়া যায়নি।

তিনি আরো বলেন, আমাদের লোকবল খুবই কম। এতো বিশাল এলাকায় পাহারা বসানো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কখনো আমরা টহলে গেলেও তারা জেনে যায়৷ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ হওয়ায় তারা আমাদের আগমন সহজেই টের পায়। ফলে সরে পড়ে। আমরা কখন কোথায় যাচ্ছি তারা জানতে পারে। তারা এক বিশাল বাহিনী। আমরা আসলে তাদের সাথে পেরে ওঠতে পারছি না। লোকবল কম হওয়ায় সবদিকে নজর দেওয়াও মুশকিল। তবুও আমরা সাধারণ মানুষকে সবসময় বলি যাতে আমাদের খবর দেয়। তাহলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে পারব।

এদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা হরিণ শিকারিদের বের করতে ব্যর্থ হলেও একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে বেশ কয়েকজন হরিণ শিকারির নাম। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ বগাচতর এলাকায় আবুল কাশেম, আলাউদ্দিন মিন্টু, রহুল আমিন ও ৩ নং ওয়ার্ড মহানগর এলাকার সেলিম, তারেক ও সোহেলসহ আরো অনেকে হরিণ শিকার চক্রের সদস্য। এসব ব্যক্তিরাই উপকূল থেকে হরিণ শিকার করে ও ৮০০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযুক্ত ব্যক্তির মুঠোফোন নাম্বার না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড এর ইউপি সদস্য মো. মোমিনুল ইসলাম মামুন ভূঁইয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, হরিণ শিকার হচ্ছে এটা এখন ওপেন সিক্রেট। আমরা কখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। উপকূলে হরিণ শিকারে একটি সিন্ডিকেট আছে বলে শুনেছি৷ কে করছে বা কারা করছে সেটা জানি না। তবে হরিণ যে মারা হচ্ছে সেটা শতভাগ নিশ্চিত। তাদের পাতা ফাঁদে কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ এম তাজুল ইসলাম নিজামী একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার নিকট হরিণ শিকারের কোন ঘটনা জানা নেই। তবে এটা জানি যে হরিণ পানি খেতে আসলে অনেকে হরিণকে ঘেরাও করে শিকার করে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহাদাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে তার দপ্তরে বলেন, হরিণ শিকার মারাত্মক অপরাধ। অপরাধী যে-ই হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতে হবে। শিকারী ও মাংসের ক্রেতা উভয়ই প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আসবে। এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও বন বিভাগের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

উল্লেখ্য, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী চিতা বাঘ, লাম চিতা, উল্লুক, হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, তিমি বা ডলফিন হত্যা করলে দায়ী ব্যক্তির তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে দায়ী ব্যক্তির পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে বাঘ ও হাতি হত্যায় দণ্ডিত হলে সর্বনিম্ন দুই ও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের সঙ্গে সর্বনিম্ন এক লাখ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।