শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পরিবেশ দূষণে বছরে মারা যাচ্ছে ৩২ শতাংশ মানুষ

| প্রকাশিতঃ ৩১ অক্টোবর ২০২২ | ৪:১৩ অপরাহ্ন


ঢাকা : বায়ু দূষণের কারণে বছরে প্রাক্কলিত ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯ শতাংশ এবং ৩২ শতাংশ মৃত্যু পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে বাড়ি এবং বাড়ির বাইরের বায়ু দূষণ, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিনে ঘাটতি এবং সিসা দূষণ এজন্য দায়ী।

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। আজ সোমবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া সাসটেইনেবিলিটি ডেভেলপমেন্ট রিজিওনাল ডিরেক্টর জন রুমি। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ গুরুতর জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে, জোরালো কার্যক্রম হাতে না নিলে দরিদ্র এবং দুর্বল ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, যা উন্নয়নের গতি দুর্বল করবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা গুরুতর ঝুঁকির মুখোমুখি। জরুরি কার্যক্রম গ্রহণ ছাড়া শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলা হয়েছে রিপোর্টে।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, শুধু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বছরে গড় ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার (মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ)। এসব প্রভাব আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হলে এর চেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারে। গুরুতর বন্যার মুখে বাংলাদেশের জিডিপি ভিত্তিরেখার তুলনায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলে মূলত জলবায়ুর ঝুঁকি প্রকট।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বৃষ্টিপাত ৪ শতাংশ বাড়লে ২০৫০ সাল নাগাদ বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৭ সেন্টিমিটার অথবা তারও বেশি বাড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এভাবে বাড়লে সম্পদহানির ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হবে, বর্তমানে যা বছরে আনুমানিক ৩০০ মিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন হাজার ৩৯ কোটি ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া কৃষি উৎপাদন, পানি সরবরাহ এবং উপকূলীয় ইকোসিস্টেমের বৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়বে।

কোনো কার্যক্রম হাতে না নিলে ২০৪০ সাল নাগাদ কৃষি জমি জাতীয়ভাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি এবং দক্ষিণাঞ্চলে ১৮ শতাংশ কমতে পারে। জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা এবং গুরুতর দুর্যোগের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ মোট কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ১৩ মিলিয়নের বেশি মানুষের জলবায়ুজনিত স্থানীয় অভিবাসন ঘটতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে জানানো হয়।

রিপোর্টটিতে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকার কার্যক্রম এবং অর্থায়ন চাহিদা চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টটি স্থানীয় সমাধানের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশের সফল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য জলবায়ু সহিষ্ণুতা জোরদার করতে অবকাঠামো এবং সেবায় বিনিয়োগের সুপারিশ করেছে। উন্নত কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং জ্বালানি ও পরিবহন দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে কার্যক্রম হাতে নিলে, বায়ু, মাটি এবং পানির গুনগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে। মধ্য মেয়াদে জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বাড়তি অর্থায়ন যোগাড় করতে পারবে বলে জানানো হয়।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইসার বলেন, ‘অভিযোজন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। গত ৫০ বছরে দেশটি ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ভাগ কমিয়েছে, অন্যান্য দেশ যা থেকে শিখতে পারে। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি বাড়তে থাকার অভিযোজন প্রচেষ্টা জোরদার করা অত্যাশ্যক এবং নিম্ন কার্বন উন্নয়ন গতিশয় বাংলাদেশের অভিঘাত-সহিষ্ণু ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস (ডিএইচডি) নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগন্য এবং মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ । তবে বিপুল জনসংখ্যা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দেশটির উন্নয়ন পথ পরিক্রম যদি গতানুগতিকভাবে চলতে থাকে তাহলে জিএইচজি নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বাংলাদেশ উচ্চ মাত্রার বায়ু দূষণের মুখেও রয়েছে, যার ফলে বছরে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ। বিভিন্ন খাতে উন্নত বায়ুমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং জলবায়ু সহিষ্ণুতা বাড়াবে। দেশের ২০২১ সালে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানসমূহ কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সাল নাগাদ ২১ দশমিক ৮ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শক্তিশালী বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গ্রহণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এসব প্রতিশ্রুতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আইএফসির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট জন এফ. গ্যানডলকো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের নানা গুরুতর ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জরুরিভিত্তিতে বেসরকারি খাতের অধিকতর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন যা শুধু জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য দরকারি বিলিয়ন ডলার যোগানের জন্যই নয়, বরং উদ্ভাবন ও দক্ষতাকে এগিয়ে নিয়ে জনসাধারণকে উপকৃত করবে ও সুরক্ষা দেবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সঞ্চালন, আবাসন, পরিবহন এবং জলবায়ু-বান্ধব কৃষিতে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি এবং তা সম্ভব। যার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করতে হবে এবং সবুজ প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন সহজলব্য করতে আর্থিক খাত সবুজায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের জলবায়ু-বান্ধব প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য এই রিপোর্ট তিনটি অগ্রাধিকার এলাকা চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের কিছু এলাকা জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে। এজন্য অধিকটির জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এলাকাসমূহ যেমন, বরেন্দ্র এলাকা, উপকূলীয় এলাকা, হাওর অঞ্চল, পাবর্ত্য অঞ্চল এবং যেসকল এলাকায় দরিদ্রহার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি যেমন ময়মনসিংহের পশ্চিম ও রংপুরের পূর্বের উপজেলাগুলো এবং খুলনা বিভাগের দক্ষিণ অংশে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে কিছু উদ্যোগ চিহ্নিত করেছে যেগুলো ফলপ্রসূ হবে ও বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ডেল্টা প্যান-২১০০ এর অধীন অতি জরুরি প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও অর্থায়ন বরাদ্দ, খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং সার্কুলার ইকোনমি সমাধান বাস্তবায়ন এবং কর সংস্কারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্ষতি কমানো। বাংলাদেশ ডেল্টা প্যান-২১০০ এবং মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান এও এসব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা আছে।

মিগার এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিরোশি মাতানো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে বাংলাদেশ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশল অব্যাহত রাখতে সিসিডিআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছে, যা জলবায়ু ইস্যুর প্রতি সংবেদনশীল।

রিপোর্টটির প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক আইডিয়াবাজ চ্যাম্পিয়নশিপের বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেছে। এটি জলবায়ু-বান্ধব সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তরুণদের জন্য একটি প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে, যেখানে চার শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে যথাক্রমে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।