
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউক্রেন যুদ্ধ এক বছর পূর্ণ করে আজ দ্বিতীয় বছরে গড়াল। গত বছরের এইদিনে (২৪ ফেব্রুয়ারি) প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। এই অভিযানকে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় ভূমি সংঘাত। যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউক্রেনীয় শহর এবং গ্রামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়লেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজ নিজ পক্ষে শক্তি বাড়াচ্ছেন। ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে : রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে খাদ্যপণ্যের দাম। ২০২২ এর ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ- মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বিশ্বে ভোজ্যতেল, খাদ্যশস্য, চিনি, মাংসসহ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গড় হার ছিল ১৩ শতাংশ। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এ সময় এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৈশ্বিক খাদ্যপণ্য মূল্যসূচকের যাত্রা শুরুর ৬০ বছরের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে খাদ্যপণ্যের দামের এতটা তারতম্য আগে দেখা যায়নি।
বৈশ্বিক বাজারে ভোজ্যতেল, বিশেষ করে সূর্যমুখী তেল ও খাদ্যশস্যের সবচেয়ে বড় জোগান আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এ দুটি দেশ থেকে জোগান আসা একেবারেই কমে গেছে। ফলে এই দুই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিনি, মাংস ও দুধের দামও।
সংকটের মুখে গ্যাসের ব্যবহার কমাচ্ছে ইইউ : ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের সমাধান খুঁজতে গ্যাসের ব্যবহার কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইইউ। আগামী মার্চ থেকে নভেম্বরের মধ্যেই এটি কার্যকরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
রাশিয়া থেকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রধান দুটি পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম-১ এবং নর্ড স্ট্রিম-২। বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইনে নাশকতার অভিযোগ তুলে গত বছর তা বন্ধ করে দেন পুতিন। শুধু বিদ্যুৎ কিংবা বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য নয়, জার্মানিতে ঘরবাড়ি গরম রাখার যে প্রক্রিয়া, তাও অনেকটা গ্যাসনির্ভর। এছাড়া এমন কিছু শিল্পে গ্যাস ব্যবহার করা হয়, যা বেশির ভাগ মানুষ সামনে থেকে দেখতে পান না। যেমন, গাড়ির জন্য ইস্পাত ও কাচের বোতল তৈরি, দুধ ও পনির পাস্তুরিত করা ইত্যাদি।
রাশিয়া থেকে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়ে জার্মানিসহ পুরো ইউরোপ। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের ইইউ পার্লামেন্ট ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে দফায় দফায় বৈঠকে বসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জার্মানিসহ ইইউর বেশ কয়েকটি দেশ এলএনজি স্টেশন নির্মাণসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে।
সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনছে ভারত : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর রাশিয়া বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ভারত ও চীনের কাছে তেল বিক্রি করেছে। সেই ব্যবসার রাশ টানতে গত ডিসেম্বরের শুরুতে সমুদ্রপথে রাশিয়ার তেল সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একই সঙ্গে তারা এবং জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র) রুশ তেল কেনার দর ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার নির্ধারণ করে। কিন্তু তাতেও রাশিয়াকে আটকানো যায়নি। এখন তারা সেই দরের চেয়েও কম দরে ভারতের
কাছে ওরাল ক্রুড তেল বিক্রি করছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তারা উৎপাদন খরচ থেকে ১২-১৫ ডলার কমে ভারতের কাছে তেল বিক্রি করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার বন্ধ হওয়ায় রাশিয়ার তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে তেল বিক্রির বিকল্প নেই তাদের। তাই এশিয়ার মতো বিকল্প বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে অন্যান্য সরবরাহকারীর চেয়ে বেশি ছাড় দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের বিকল্প নেই তাদের, যার সুবিধা পাচ্ছে ভারতের মতো বৃহৎ তেল আমদানিকারী দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি উড়িয়ে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে গেলেও ভারতের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাইডেন প্রশাসন। দেশটির ইউরোপ এবং এশিয়াবিষয়ক সহপররাষ্ট্র সচিব কারেন ডনফ্রেন্ড জানান, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চাঙ্গা তিন দেশের অর্থনীতি : রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের একটি ছোট ককেশাস জাতি জর্জিয়া। আয়তন ৬৯ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যাও মাত্র ৩৭ লাখের মতো। ছোট্ট দেশটির ভাগ্য বদলে দিচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। কারণ, রাশিয়ার প্রচুর মানুষ যুদ্ধের কারণে অভিবাসী হয়ে জর্জিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন। যাওয়ার সময় দেশ থেকে তারা নিজেদের সমুদয় অর্থকড়ি তথা অস্থাবর সম্পদ নিয়ে যাচ্ছেন।
জর্জিয়ার জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের (এনএসও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জর্জিয়ায় ১২ হাজার ৯৩টি নতুন রুশ কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে, যা ২০২১ সালে নিবন্ধিত মোট প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ১৩ গুণের বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জর্জিয়ার পাশাপাশি আর্মেনিয়া, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি ককেশাস অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করছে।
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও তুরস্কের মোট দেশজ উৎপাদনকে (জিডিপি) চাঙ্গা করে তুলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছিল ২০২২ সালের শেষে জর্জিয়ার জিডিপি বেড়ে ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি জর্জিয়ায় জিডিপিতে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়।
আইএমএফ বলছে, ‘অভিবাসন ও যুদ্ধের ফলে আর্থিক প্রবাহের ঢেউ’ তুরস্কেও পৌঁছে গেছে। বদৌলতে সেই দেশে জিডিপি বেড়ে হবে ৫ শতাংশ। একইভাবে ‘বাহ্যিক আয়, মূলধন ও শ্রমের বৃহৎ প্রবাহের’ ফলে আর্মেনিয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ১১ শতাংশ।
জর্জিয়ায় বৈদেশিক মূলধনপ্রবাহে নাটকীয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে বিদেশি এই মূলধনপ্রবাহের ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশই গেছে রাশিয়া থেকে। জর্জিয়ার ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে রুশরা জর্জিয়ায় ১৪১ কোটি মার্কিন ডলার স্থানান্তর করেছেন, যা ২০২১ সালের ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের চেয়ে সাড়ে ৪ গুণ বেশি। আর ফেব্রুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে রাশিয়া থেকে যাওয়া অভিবাসীরা জর্জিয়ার ব্যাংকগুলোতে ৪৫ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খুলেছেন।
রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত জর্জিয়াও একসময় ইউক্রেনসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রেরই অংশ ছিল। ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এসব দেশ স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সহায়তা পাচ্ছে ইউক্রেন : ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘাত বিশ্ব বাজার ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ক্ষতি হয়েছে ট্রিলিয়ন ডলারের। সেই ক্ষতির মাত্রা আরো বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ইউক্রেনের অর্থ ও সামরিক ক্ষেত্রের একটা উল্লেখযোগ্য জোগান আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। চলতি সপ্তাহের ঝটিকা সফরেও ইউক্রেনকে আরো ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে রুখতে কিয়েভকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগেও দেশটিকে আরো প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রæতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সহায়তার মধ্যে ৪৬.৬ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা, যা অন্য যে কোনো দেশের দেয়া সাহায্যের চেয়ে বেশি। সামরিক সহায়তার অঙ্কে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য (৫.১ বিলিয়ন ডলার) এবং এরপর ইউরোপীয় দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (১০.২ বিলিয়ন ডলার)।
চীন-রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য : ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধের কারণে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরো উন্নত হয়েছে। এ সময়ে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পৌঁছেছে নতুন উচ্চতায়। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস জানায়, ২০২১ সালে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে মোট ১৪ হাজার ৬৮৮ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। সংখ্যাটা আগের বছরের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
২০২৪ সালের মধ্যে দুদেশের বাণিজ্য ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রাশিয়া ও চীন। অবশ্য সেই লক্ষ্য অর্জন যে খুব একটা কঠিন হবে না সা¤প্রতিক অর্থনৈতিক গতিধারা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
শক্তি বাড়াচ্ছেন বাইডেন ও পুতিন : এ অবস্থায় মিত্র চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শাক্তিশালী করতে দেখা যাচ্ছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে। আর পশ্চিমের সামরিক জোট ন্যাটোর সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়াচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
পোল্যান্ডের ওয়ারশ এবং রাশিয়ার মস্কোতে বুধবার বৈশ্বিক উত্তেজনা নিয়ে কথা বলেন বাইডেন ও পুতিন। ওয়ারশতে ন্যাটোর উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, ন্যাটোর প্রতিটি স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব নিয়ে দেখবে। এ সম্মিলিত প্রতিরক্ষা গোষ্ঠীটি রাশিয়ার সীমান্তের কাছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে অবস্থান করছে।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রাশিয়া সফর করবেন জানিয়ে পুতিন বলেন, সম্পর্ক নতুন সীমানায় পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন এখন চিন্তায় আছে। তারা ভয় পাচ্ছে, হয়তো ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে সহায়তা দিতে পারে বেইজিং।
ডিফেন্ডার অফ দ্য ফাদারল্যান্ডের (পিতৃভূমির রক্ষক) সাধারণ ছুটির দিন উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার পুতিন বলেন, ‘রাশিয়া পারমাণবিক বাহিনী বাড়ানোর জন্য বাড়তি মনোযোগ দেবে। সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক বিতরণ শুরু হবে। আগামীকাল শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকায় চীনের সঙ্গে সামরিক মহড়া শুরু করবে রাশিয়া। এজন্য হাইপারসনিক মিসাইলে সজ্জিত একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছে।
এদিকে গত বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক বৈঠকে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করে এর নিন্দা জানিয়েছেন।